দেশজুড়ে হামের সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। আক্রান্ত শিশুরা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার কয়েক দিনের মধ্যেই আবারো নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট ও জটিল সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। চিকিৎসকদের মতে, অসম্পূর্ণ চিকিৎসা, পর্যাপ্ত পুষ্টির অভাব এবং পরবর্তী পরিচর্যায় ঘাটতির কারণে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে সম্ভাব্য হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ১২ হাজার ৩২০ জন। এর মধ্যে নিশ্চিত আক্রান্ত ২ হাজার ২৪১ জন। একই সময়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা ১৪৩ জন, যার মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু ২৩ জন। সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১ হাজার ১৮৭ জন আক্রান্ত এবং ৭ জনের মৃত্যু হয়েছে।
অন্যদিকে, রাজধানীর মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে দেখা গেছে তীব্র চাপ। হাসপাতালের ৩০০ শয্যার আইসোলেশন ওয়ার্ডে বর্তমানে ২৮০ জন রোগী ভর্তি রয়েছে, যার মধ্যে ৩৭ জন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে চিকিৎসাধীন। একই ধরনের চিত্র দেখা গেছে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন হাসপাতালেও, যেখানে গুরুতর অবস্থায় একাধিক শিশু চিকিৎসাধীন।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় নিউমোনিয়া ও অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক চিকিৎসক এফ এ আসমা খান বলেন, জ্বর কমলেই রোগীকে ছাড়পত্র দেওয়া উচিত নয়; সম্পূর্ণ সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হবে। তিনি হামে আক্রান্ত শিশুদের ভিটামিন এ ক্যাপসুল ও পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ তাজুল ইসলাম বারী বলেন, একবার হাম হলে সাধারণত পুনরায় হয় না, তবে শরীর দুর্বল হয়ে পড়ায় অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই সুস্থ হওয়ার পর শিশুদের পুষ্টিকর খাবার ও পর্যাপ্ত সূর্যালোক নিশ্চিত করার পরামর্শ দেন তিনি।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ জনে। শুধু গত ২৪ ঘণ্টায় সেখানে ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে নতুন করে ২৭ জন ভর্তি এবং ২৪ জন ছাড়পত্র পেয়েছে। বর্তমানে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে ১৩২ জন রোগী। চলতি প্রাদুর্ভাবে মোট ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪৭৯ জন। গত এক সপ্তাহে ধারাবাহিকভাবে প্রতিদিনই একাধিক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে, যা পরিস্থিতিকে আরো উদ্বেগজনক করেছে।
এদিকে, বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে মধ্যরাতে তীব্র চাপের চিত্র দেখা যায়। এক ঘণ্টায় গড়ে ১৩ জন শিশু শ্বাসকষ্ট ও হামের উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হতে আসে। রাতভর অ্যাম্বুলেন্স ও যানবাহনে করে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অসুস্থ শিশুদের আনা হয়। কিন্তু শয্যা সংকটের কারণে অনেক পরিবারকে হাসপাতাল থেকে ফিরে যেতে হয় বা অন্য হাসপাতালে ছুটতে হয়।
চিকিৎসকদের মতে, আক্রান্তদের বড় অংশই এক থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশু, যারা বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হামের ভাইরাস কাশি ও হাঁচির মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং টিকাদান কার্যক্রম জোরদার না করলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ হতে পারে। তারা আক্রান্তদের পৃথক রাখা, টিকাদান নিশ্চিত করা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকা গ্রহণ, পর্যাপ্ত পুষ্টি এবং দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণই এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর উপায়। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। (এ বিষয়ে আরো প্রতিবেদন ২-এর পাতায়)
সানা/আপ্র/১০/৪/২০২৬