ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে কোরবানির বর্জ্য দ্রুত অপসারণ, সড়ক-নালা পরিষ্কার এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা সচল রাখার নির্দেশনাও দেওয়া হয়। নির্ধারিত সময় শেষ হলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে দৃশ্যমান অগ্রগতি কতটা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর ঢাকা দক্ষিণ ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত পরিচ্ছন্নতাকর্মী নিয়োগের মাধ্যমে কোরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম জোরদার করে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অধিকাংশ এলাকায় বর্জ্য অপসারণ সম্পন্ন হয়েছে বলে দাবি করা হলেও ডেঙ্গু প্রতিরোধে নতুন বা বিশেষ কোনো দৃশ্যমান কর্মসূচি বাস্তবায়নের বিষয়টি স্পষ্ট নয়।
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দাদের অভিযোগ, পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও গত ৪৮ ঘণ্টায় মশক নিধনে ফগার মেশিন ব্যবহার বা বিশেষ অভিযান চোখে পড়েনি। এমনকি শনিবারকে বিশেষ পরিচ্ছন্নতা দিবস ঘোষণা করা হলেও সেদিন মশা নিধনের কোনো উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম পরিচালিত হয়নি। তবে সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, কোরবানির বর্জ্য অপসারণ ছিল তাৎক্ষণিক অগ্রাধিকার। ডেঙ্গু প্রতিরোধে ইতোমধ্যে বিভিন্ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং সেগুলো বাস্তবায়নে কাজ চলছে।
ঈদের দ্বিতীয় দিন বিকেলে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কোরবানির বর্জ্য অপসারণ কার্যক্রম সরেজমিনে পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি গুলশান, হাতিরঝিল, রামপুরা, মালিবাগ, বাসাবো, কমলাপুর, সায়েদাবাদ, যাত্রাবাড়ী, ধোলাইখাল, নারিন্দা, রায়সাহেব বাজার, গুলিস্তান, শাহবাগ, নিউমার্কেট, কলাবাগান, জিগাতলা, মানিক মিয়া এভিনিউ ও মহাখালীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখেন।
এদিকে রাজধানীর কয়েকটি এলাকায় কোরবানির বর্জ্য ও জমে থাকা ময়লা অপসারণে গাফিলতির অভিযোগে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের দুই আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাঁদের জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বরখাস্ত কর্মকর্তারা হলেন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের জোন-৫-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা মো. সাদেকুর রহমান এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জোন-১-এর আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা কাজী সালেহ মুস্তানজির।
সিটি করপোরেশনের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এ ঘটনায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে দায়িত্ব পালনে নতুন উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়েছে। অনেকেই এখন দিনরাত মাঠে কাজ করছেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার মূল লক্ষ্য ছিল রাজধানীতে কোরবানির বর্জ্য ও ময়লা-আবর্জনা দ্রুত অপসারণ নিশ্চিত করা। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই সেই কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে। পাশাপাশি ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনাও রয়েছে। তিনি জানান, প্রতি সপ্তাহে শনিবার বিশেষ পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ ছাড়া এডিস ও কিউলেক্স মশার উপদ্রব বেশি এমন এলাকাগুলোকে হটস্পট হিসেবে চিহ্নিত করে বিশেষ অভিযান চালানো হচ্ছে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা ও ডেঙ্গু ঝুঁকি মোকাবিলায় এলাকাভিত্তিক টিমও গঠন করা হয়েছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর ডেঙ্গু প্রতিরোধে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের নির্দিষ্ট কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে সংস্থাটির জনসংযোগ বিভাগ জানিয়েছে, উত্তর সিটি করপোরেশনকে পরিচ্ছন্ন ও সবুজ রাখতে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। ৭২ ঘণ্টার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার আওতায় কোরবানির পশুর বর্জ্যের অধিকাংশই অপসারণ করা হয়েছে এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা বাস্তবায়নে তারা বদ্ধপরিকর।
ডেঙ্গুর মৌসুম সামনে রেখে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের কার্যক্রম কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়, এখন সেদিকেই নজর নগরবাসীর।
ডেঙ্গু মোকাবিলায় প্রস্তুত সরকার: স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, যেহেতু দু-একজন করে ডেঙ্গু রোগী পাওয়া যাচ্ছে। যেহেতু এই সময়ে ডেঙ্গু হয়। এজন্য কালক্ষেপণ করতে চাই না। ডেঙ্গু মোকাবিলায় সর্বাত্মক প্রস্তুতি নিচ্ছি আমরা।
ডেঙ্গু বাড়লে করণীয় কী হতে পারে, এ নিয়ে বৈঠক করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সোমবার (১ জুন) মন্ত্রণালয়ের সভা কক্ষে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেনের সভাপতিত্বে এ বৈঠক হয়। এতে প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, অতিরিক্ত সচিব এটিএম সাইফুল ইসলাম, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস, অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. জাহিদ রায়হান, পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) হালিমুর রশীদ, পরিচালক (হাসপাতাল) এএইচএম মইনুল আহসান ও সোসাইটি অব মেডিসিনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, চিকিৎসা পরিকল্পনাসহ বিস্তারিত ট্রেনিং দেবে সোসাইটি অব মেডিসিন। আগামীকাল থেকেই কাজ শুরু হচ্ছে। সারাদেশে ট্রেনিং দেওয়া হবে। রিএজেন্ট এবং স্যালাইন কিছু সংগ্রহে আছে। আরো প্রয়োজনীয় কিছু আমরা সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। অর্থাৎ আমরা প্রাথমিক প্রস্তুতি নিয়েছি। ডেঙ্গুর মূল উৎপত্তি নিয়ে পদক্ষেপ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমরা এ নিয়ে সিটি করপোরেশনের সঙ্গে বসবো। তারা এ নিয়ে কাজ করবে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১/৬/২০২৬