একেএম ফজলুল হক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে বেড়েছে জলদস্যুদের তৎপরতা। গত এক মাসে বিদেশি জাহাজে অন্তত তিনটি দস্যুতার ঘটনা ঘটেছে। সুযোগ বুঝে হামলা চালিয়ে জাহাজের মূল্যবান সরঞ্জাম ও মালামাল লুট করে নিয়ে যাচ্ছে সশস্ত্র দস্যুরা। এতে শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, বিদেশি জাহাজের নিরাপত্তা এবং নাবিকদের জীবনও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বহির্নোঙরে একের পর এক দস্যুতার ঘটনায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা। জলদস্যুতা প্রতিরোধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে সম্প্রতি নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের কাছে চিঠি দিয়েছে চট্টগ্রাম চেম্বার।
জানা গেছে, চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে দেশের প্রায় ৯২ শতাংশ আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম পরিচালিত হয়। নাব্য সংকটের কারণে বড় জাহাজগুলো সরাসরি জেটিতে ভিড়তে না পারায় বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থান করে পণ্য খালাস করতে হয়। সেখান থেকে ছোট আকারের লাইটার জাহাজে করে পণ্য পরিবহন করা হয়।
বন্দর সূত্র জানায়, প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৫০টি বড় পণ্যবাহী জাহাজ বহির্নোঙরে অবস্থান করে। এসব জাহাজ থেকে প্রতিদিন প্রায় দেড় লাখ টন পণ্য লাইটার জাহাজে খালাস করা হয়।
চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে জাতীয় অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে বিদেশি শিপিং অপারেটরদের মধ্যে ঝুঁকির ধারণা বাড়বে, বিমা ব্যয় ও বৈদেশিক বাণিজ্যের খরচও বৃদ্ধি পেতে পারে। এ কারণে জরুরি পদক্ষেপ নিতে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
এক মাসে তিন হামলা: ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, সর্বশেষ গত ১৬ জুলাই ভোরে চট্টগ্রাম বন্দরের চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা বিদেশি পতাকাবাহী ট্যাঙ্কার ‘তাই শুয়েন’-এ হামলা চালায় জলদস্যুরা।
সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে কাটার জন্য হংকং থেকে আনা ওই জাহাজে প্রায় ২০ জন সশস্ত্র দস্যু পাঁচটি কাঠের নৌকায় করে এসে হামলা চালায় বলে অভিযোগ রয়েছে। শিপিং এজেন্ট বেন লাইনের মালিক মোশাররফ হোসেন জানান, দস্যুরা জাহাজের নাবিকদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে রাখে। পরে ডেক থেকে নোঙরের দড়ি, ব্যাটারি ও অন্যান্য মূল্যবান সরঞ্জাম লুট করে নিয়ে যায়।
জাহাজের ক্যাপ্টেন বন্দর নিয়ন্ত্রণ কক্ষে রেডিও বার্তা পাঠালেও কোস্টগার্ড ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই দস্যুরা পালিয়ে যায় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এর আগে গত ৩০ জুন স্ক্র্যাপিংয়ের জন্য আমদানি করা ‘এমটি আইআরোএস’ নামের আরেকটি জাহাজে লুটপাট চালায় জলদস্যুরা। ওই জাহাজ থেকে কয়েক কোটি টাকার সরঞ্জাম লুট করা হয়। পরে নৌ পুলিশ রাজধানীর বাংলাবাজার এলাকা থেকে প্রায় দুই কোটি টাকার চোরাই মালামাল উদ্ধার করে।
এরও আগে ২৯ জুন চার্লি অ্যাঙ্করেজে নোঙর করা ‘এমভি হাই জু’ নামের জাহাজে হামলা চালায় অস্ত্রধারী দস্যুরা। ২০ জনের বেশি দস্যু জাহাজে উঠে নাবিকদের জিম্মি করে মূল্যবান যন্ত্রাংশ লুট করে নিয়ে যায়। আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের দাবি, ওই জাহাজ থেকে প্রায় এক কোটি টাকার সরঞ্জাম খোয়া গেছে।
সহায়তা না পাওয়ার অভিযোগ: ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক এসব হামলার ঘটনায় কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষকে জানানো হলেও তাৎক্ষণিক সহায়তা পাওয়া যায়নি। চট্টগ্রাম চেম্বারের চিঠিতেও উল্লেখ করা হয়েছে, লুট হওয়া অধিকাংশ মালামাল এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
আন্তর্জাতিক সমুদ্র নিরাপত্তা সংস্থা রিজিওনাল কো-অপারেশন অ্যাগ্রিমেন্ট অন কমবেটিং পাইরেসি অ্যান্ড আর্মড রোবেরি অ্যাগেইনস্ট শিপস ইন এশিয়ার (রিক্যাপ) প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চট্টগ্রাম বন্দরে দস্যুতা বা চুরির কোনো ঘটনা ঘটেনি। তবে পরবর্তী সময়ে একের পর এক ঘটনার কারণে শিপিং এজেন্ট, জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
নিরাপত্তা জোরদারের উদ্যোগ: বহির্নোঙরে জাহাজে চুরির অভিযোগের পর কোস্টগার্ড ও বন্দর কর্তৃপক্ষ নজরদারি বাড়িয়েছে। এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে যৌথ সভায় ঝুঁকি পর্যালোচনা করে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে-কোস্টগার্ডের সঙ্গে সমন্বয় বৃদ্ধি, বহির্নোঙরে টহল ও নজরদারি জোরদার, অনুমোদিত ওয়াচম্যান নিয়োগ নিশ্চিত করা, জাহাজ আগমনের তথ্য বাধ্যতামূলকভাবে সরবরাহ এবং প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা উন্নত করা।
চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সচিব রেফায়েত হামীম বলেন, বহির্নোঙরে জাহাজে অপরাধ প্রতিরোধে নিরাপত্তা ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। কোস্টগার্ড নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছে এবং এ ঘটনায় জড়িত কয়েকজনকে ইতোমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/২/৮/২০২৬