গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬

মেনু

স্বাস্থ্য প্রতিদিন===

ব্যথার ওষুধ: ছোট ট্যাবলেটের বড় ঝুঁকি

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রত্যাশা ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৩৪ পিএম, ০৫ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ২১:১৬ এএম ২০২৬
ব্যথার ওষুধ: ছোট ট্যাবলেটের বড় ঝুঁকি
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ডা. বিএম আতিকুজ্জামান

মাথাব্যথা, কোমর ব্যথা, দাঁতের ব্যথা বা হাঁটুর ব্যথা হলেই আমরা প্রায়ই পরিচিত একটি ব্যথার ওষুধ খেয়ে নিই। দোকান থেকে প্রেসক্রিপশন ছাড়াই পাওয়া যায় বলে মনে করি, এটি নিশ্চয়ই নিরাপদ। কেউ একই দিনে দুই-তিন ধরনের ব্যথার ওষুধও খান। আবার অনেকে মাসের পর মাস নিয়মিত খেয়েও চিকিৎসককে জানান না। ব্যথার ওষুধ কার্যকর এবং প্রয়োজনের সময় অত্যন্ত উপকারী। কিন্তু ‘সহজে পাওয়া যায়’ আর ‘ঝুঁকিমুক্ত’- এক কথা নয়। ভুল ওষুধ, ভুল মাত্রা বা ভুল রোগীর ক্ষেত্রে এর পরিণতি হতে পারে পাকস্থলীতে রক্তক্ষরণ, কিডনির আকস্মিক ক্ষতি, রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদ্যন্ত্রের জটিলতা কিংবা লিভারের মারাত্মক ক্ষতি।

সব ব্যথার ওষুধ এক নয়: প্রচলিত ব্যথার ওষুধকে সহজভাবে দুটি প্রধান দলে বোঝা যায়। প্রথম দলটি হলো নন-স্টেরয়ডাল অ্যান্টি-ইনফ্ল্যামেটরি ড্রাগ বা এনএসএআইডি। আইবুপ্রোফেন, ন্যাপ্রোক্সেন ও ডাইক্লোফেনাক এই দলের পরিচিত উদাহরণ। এগুলো ব্যথার পাশাপাশি প্রদাহ ও ফোলা কমাতে পারে। দ্বিতীয়টি হলো অ্যাসিটামিনোফেন বা প্যারাসিটামল। এটি ব্যথা ও জ্বর কমায়, কিন্তু সাধারণ মাত্রায় এনএসএআইডির মতো উল্লেখযোগ্য প্রদাহবিরোধী কাজ করে না। প্যারাসিটামল ও এনএসএআইডির ঝুঁকিও এক নয়। তাই ‘ব্যথার ওষুধ’ বলে সব কটিকে একইভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়।

পাকস্থলীর অস্বস্তি থেকে রক্তক্ষরণ: এনএসএআইডি পাকস্থলী ও অন্ত্রের সুরক্ষাব্যবস্থা দুর্বল করতে পারে। ফলে বদহজম বা পেটে জ্বালাপোড়া থেকে শুরু করে আলসার, এমনকি গুরুতর রক্তক্ষরণও হতে পারে।

ঝুঁকি বেশি হতে পারে যদি রোগীর আগে আলসার বা পরিপাকতন্ত্রে রক্তক্ষরণের ইতিহাস থাকে; বয়স ৬৫ বছরের বেশি হয়; একাধিক এনএসএআইডি একসঙ্গে ব্যবহৃত হয়; রক্ত পাতলা করার ওষুধ, স্টেরয়েড বা কিছু অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট ব্যবহৃত হয়; দীর্ঘ সময় বা বেশি মাত্রায় ব্যথার ওষুধ খাওয়ার প্রয়োজন হয়; অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের অভ্যাস থাকে। খাবারের সঙ্গে ওষুধ খেলে সাময়িক অস্বস্তি কিছুটা কমতে পারে। কিন্তু আলসার বা রক্তক্ষরণের ঝুঁকি পুরোপুরি দূর হয় না। পেটে ব্যথা না থাকলেও রক্তক্ষরণ হতে পারে। কালো, আলকাতরার মতো পায়খানা; রক্তবমি; কফির গুঁড়ার মতো বমি; হঠাৎ দুর্বলতা বা মাথা ঘোরা- এসব দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

কিডনির জন্য অদৃশ্য বিপদ: এনএসএআইডি কিডনিতে রক্তপ্রবাহ কমিয়ে দিতে পারে। সুস্থ মানুষের স্বল্পমেয়াদি ব্যবহারে সব সময় সমস্যা না হলেও পানিশূন্যতা, কিডনি রোগ, ডায়াবেটিস, হৃদ্রোগ বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে ঝুঁকি বেড়ে যায়; বিশেষ করে বমি, ডায়রিয়া, জ্বর বা পর্যাপ্ত পানি পান করতে না পারার সময় এনএসএআইডি গ্রহণ করলে আকস্মিক কিডনি ক্ষতি হতে পারে। এসিই ইনহিবিটর বা এআরবি ধরনের রক্তচাপের ওষুধ এবং ডাইইউরেটিক বা ‘পানির ওষুধ’ ব্যবহারকারীদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। প্রস্রাব কমে যাওয়া, পা ফুলে যাওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বলতা বা শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন। তবে কোনো নিয়মিত ওষুধ নিজে থেকে বন্ধ করা উচিত নয়।

হৃদ্যযন্ত্র ও রক্তচাপেও প্রভাব পড়ে: কিছু এনএসএআইডি শরীরে লবণ ও পানি ধরে রাখতে পারে, রক্তচাপ বাড়াতে পারে এবং হার্ট ফেইলিউর খারাপ করতে পারে। হৃদ্রোগ, আগের হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোক, অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ অথবা হার্ট ফেইলিউর থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ গ্রহণ বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। এনএসএআইডির ঝুঁকি ও উপকার রোগীভেদে আলাদা। তাই একটি ওষুধ অন্য কারও জন্য নিরাপদ হলেই আপনার জন্যও নিরাপদ হবে- এমন ধারণা ঠিক নয়।

প্যারাসিটামল নিরাপদ হলেও সীমাহীন নয়: প্যারাসিটামল সাধারণত পাকস্থলীতে এনএসএআইডির মতো আলসার সৃষ্টি করে না এবং অনেক রোগীর ক্ষেত্রে তুলনামূলক নিরাপদ বিকল্প হতে পারে। কিন্তু অতিরিক্ত মাত্রায় এটি মারাত্মক লিভার ক্ষতি করতে পারে। সমস্যাটি প্রায়ই ঘটে অজান্তে। জ্বরের ওষুধ, সর্দি-কাশির মিশ্র ওষুধ, মাথাব্যথার ট্যাবলেট এবং কিছু প্রেসক্রিপশন ব্যথার ওষুধ- একাধিক পণ্যে প্যারাসিটামল থাকতে পারে। রোগী ভিন্ন নাম দেখে কয়েকটি ওষুধ একসঙ্গে খান। অথচ সক্রিয় উপাদানটি একই।

যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন সব ওষুধ মিলিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ৪ হাজার মিলিগ্রামের বেশি অ্যাসিটামিনোফেন না নেওয়ার কথা বলে। তবে লিভার রোগ, নিয়মিত অ্যালকোহল গ্রহণ, অপুষ্টি, কম ওজন, বয়স্ক বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারকারীদের জন্য নিরাপদ সীমা আরও কম হতে পারে। তাই প্যাকেটের নির্দেশনা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ। অতিরিক্ত প্যারাসিটামল গ্রহণের পর শুরুতে কোনো লক্ষণ নাও থাকতে পারে। পরে বমি, পেটব্যথা, বিভ্রান্তি বা চোখ-ত্বক হলুদ হয়ে যেতে পারে। ভুল করে বেশি খেলে উপসর্গের জন্য অপেক্ষা না করে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা বা বিষ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্রের সাহায্য নিতে হবে।

একই ওষুধ দুই নামে খাচ্ছেন না তো: ওষুধ কেনার সময় শুধু ব্র্যান্ডের নাম নয়, ‘জেনেরিক’ বা ‘অ্যাকটিভ ইনগ্রেডিয়েন্ট’ দেখুন। দুটি ভিন্ন ব্র্যান্ডে একই এনএসএআইডি বা প্যারাসিটামল থাকতে পারে। আবার একটি সর্দির ওষুধের ভেতরেই ব্যথার উপাদান মেশানো থাকতে পারে। চিকিৎসকের কাছে গেলে প্রেসক্রিপশনের ওষুধের পাশাপাশি নিজের কেনা ব্যথার ওষুধ, ভিটামিন ও হারবাল পণ্যের তালিকাও জানান। সম্ভব হলে সব ওষুধের ছবি বা প্যাকেট সঙ্গে নিন। চিকিৎসকরাও ওষুধের ইতিহাস নেওয়ার সময় সরাসরি জিজ্ঞাসা করতে পারেন- ফার্মেসি থেকে নিজে কিনে কী কী খান?

নিরাপদ ব্যবহারের সাতটি নিয়ম: ১. ব্যথার কারণ না জেনে দিনের পর দিন ওষুধ খাবেন না। ২. সবচেয়ে কম কার্যকর মাত্রা, সবচেয়ে কম প্রয়োজনীয় সময় ব্যবহার করুন। ৩. চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দুটি এনএসএআইডি একসঙ্গে খাবেন না। ৪. প্যারাসিটামলযুক্ত একাধিক পণ্য একই দিনে ব্যবহারের আগে লেবেল পরীক্ষা করুন। ৫. কিডনি, লিভার, আলসার, হৃদ্রোগ বা উচ্চ রক্তচাপ থাকলে আগে চিকিৎসক বা ফার্মাসিস্টকে জিজ্ঞাসা করুন। ৬. রক্ত পাতলা করার ওষুধ, স্টেরয়েড, ডাইইউরেটিক বা কিছু রক্তচাপের ওষুধ ব্যবহার করলে তা জানিয়ে দিন। ৭. শিশুদের মাত্রা অনুমান করে দেবেন না; বয়স ও ওজন অনুযায়ী সঠিক নির্দেশনা নিন।

শেষ কথা: ব্যথার ওষুধের উদ্দেশ্য কষ্ট কমানো, নতুন বিপদ তৈরি করা নয়। কিন্তু ব্যথাকে মাসের পর মাস ওষুধ দিয়ে ঢেকে রাখলে মূল রোগটি ধরা পড়তে দেরি হতে পারে। প্রতিটি ব্যথার ট্যাবলেট খাওয়ার আগে তিনটি প্রশ্ন করুন: ওষুধটি আসলে কী, আমি আর কোন ওষুধ খাচ্ছি, এবং আমার কোনো রোগের কারণে এটি ঝুঁকিপূর্ণ কি না? ছোট এ বিরতিটুকুই কখনো পাকস্থলীর রক্তক্ষরণ, কিডনি ক্ষতি বা লিভারের বিপদ থেকে একজন মানুষকে রক্ষা করতে পারে।

লেখক: কনসালট্যান্ট গ্যাস্ট্রোএন্টেরোলজিস্ট, অরল্যান্ডো হেলথ, ফ্লোরিডা এবং শিক্ষক, গবেষক ও স্বাস্থ্যসেবা প্রশাসক

কেএমএএ/আপ্র/০৪.১০.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ৩ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৩৫৬
০৫ অক্টোবর ২০২৬

২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে ৩ জনের মৃত্যু, আক্রান্ত ১৩৫৬

গত ২৪ ঘণ্টায় সারাদেশে হামের উপসর্গ নিয়ে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তবে এ সময়ে নিশ্চিত হামে কারও মৃত...

এবার একদিনে ৯ জনের প্রাণ কেড়ে নিলো ডেঙ্গু
০৫ অক্টোবর ২০২৬

এবার একদিনে ৯ জনের প্রাণ কেড়ে নিলো ডেঙ্গু

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ তিন জন মারা গেছেন...

পরীক্ষার আগেই কুকুরের ঘ্রাণে ক্যানসার শনাক্তের আশা
০৫ অক্টোবর ২০২৬

পরীক্ষার আগেই কুকুরের ঘ্রাণে ক্যানসার শনাক্তের আশা

রক্ত পরীক্ষা, বায়োপসি কিংবা স্ক্যানের আগেই মানুষের নিঃশ্বাসের গন্ধ থেকে ক্যানসার শনাক্ত করার সম্ভাবন...

ডেঙ্গুতে ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২০৮৯
০৪ অক্টোবর ২০২৬

ডেঙ্গুতে ৬ জনের মৃত্যু, হাসপাতালে ভর্তি ২০৮৯

দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরো ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

আদালতে হেলমেট ছুড়ে আখতারুজ্জামান বললেন, কেন পরব

রিমান্ড শুনানির জন্য আদালতে নেওয়ার সময় মাথা থেকে হেলমেট খুলে ছুড়ে ফেলেছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য মেজর (অব.) মোহাম্মদ আখতারুজ্জামান রঞ্জন। শনিবার (৩ অক্টোবর) ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে প্রিজন ভ্যান থেকে নামানোর সময় এ ঘটনা ঘটে। প্রিয় পাঠক আপনি কি মনে করেন তিনি সঠিক প্রশ্ন করেছেন?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে