গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ১৫ জুন ২০২৬

মেনু

বিরহী মেঘের ডানায় ভেসে এলো কাব্য আর ছন্দময় আষাঢ়

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ০৩:২০ পিএম, ১৫ জুন ২০২৬ | আপডেট: ০৫:২২ এএম ২০২৬
বিরহী মেঘের ডানায় ভেসে এলো কাব্য আর ছন্দময় আষাঢ়
ছবি

কদমফুলের সৌরভ, সজল আকাশ, ব্যাঙের ডাক, বৃষ্টিভেজা বিকেল কিংবা জানালার ধারে বসে দূরের বৃষ্টির রেখা দেখা—এসব মিলিয়েই গড়ে ওঠে বাঙালির বর্ষাবোধ

”আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং...”

আষাঢ়ের প্রথম দিনের কথা উঠলেই বাংলা সাহিত্যপ্রেমীর মনে ভেসে ওঠে মহাকবি কালিদাসের সেই অমর পঙ্ক্তি। বহু শতাব্দী আগে প্রিয়ার বিরহে কাতর এক যক্ষ রামগিরি পর্বতের গায়ে জড়িয়ে থাকা মেঘকে দেখে থমকে দাঁড়িয়েছিলেন। সেই মেঘকেই করেছিলেন দূত, পাঠিয়েছিলেন ভালোবাসার বার্তা নিয়ে দূর কৈলাসে। কালিদাসের *মেঘদূত* কাব্যের সেই মেঘ আজও যেন প্রতি আষাঢ়ে ফিরে আসে—প্রেমের দূত হয়ে, বিরহের সাথি হয়ে, আবার নবজীবনের বার্তা নিয়েও।

আজ সোমবার, আষাঢ়ের প্রথম দিন। শুরু হলো বর্ষা ঋতু।

দীর্ঘ তাপদাহে ক্লান্ত প্রকৃতির কপালে যেন স্নিগ্ধ জলের পরশ বুলিয়ে দিতে ফিরে এসেছে বর্ষা। আকাশজুড়ে জমেছে মেঘের মেলা, দূরে কোথাও বাজছে মেঘের মৃদঙ্গ। বাতাসে ভাসছে ভেজা মাটির মাদক গন্ধ। গাছের পাতায়, নদীর ঢেউয়ে, জানালার কাচে, শহরের ব্যস্ত রাস্তায় কিংবা গ্রামবাংলার সবুজ প্রান্তরে ঝরে পড়বে বৃষ্টির অফুরান সুর।

কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের ভাষা ধার করে বলা যায়, এই ‘মনোরম মনোটনাস’ শহরে আবারও ফিরে এসেছে সুন্দর বৃষ্টির দিন।

বাংলার ছয় ঋতুর ভুবনে বর্ষা যেন সবচেয়ে বেশি কাব্যময়। গ্রীষ্মের দহন শেষে এই ঋতুই পৃথিবীকে নতুন প্রাণ দেয়। মেঘে ঢেকে যাওয়া আকাশ, হঠাৎ নেমে আসা বৃষ্টির পর্দা, কদমের স্নিগ্ধ হাসি, নদীর উচ্ছ্বাস আর সবুজের নবজাগরণ—সব মিলিয়ে বর্ষা কেবল একটি ঋতু নয়; এটি এক গভীর অনুভূতির নাম।

বর্ষা মানেই বাঙালির সাহিত্য, সংগীত ও শিল্পকলার এক অফুরন্ত উৎস।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃষ্টিজুড়ে বর্ষা কখনও প্রেম, কখনও বিরহ, কখনও আত্মসমর্পণের ভাষা হয়ে ধরা দিয়েছে। বৃষ্টিভেজা দিনের আবেশে তিনি লিখেছিলেন—

”আজ ঝরঝর মুখর বাদরদিনে
জানি নে, জানি নে কিছুতেই কেন যে মন লাগে না।”

আবার বর্ষার আগমনী আবহে তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে—

”এসো শ্যামল সুন্দর, আনো তব তাপহরা
তৃষাহরা সঙ্গসুধা...”

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের বর্ষাও সমান উচ্ছ্বাসময়। তাঁর কবিতায় মেঘ কখনও ঝঞ্ঝার, কখনও প্রেমের, কখনও অপেক্ষার প্রতীক হয়ে ওঠে—

”গগনে গরজে মেঘ, ঘন বরষা,
কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা।”

আবার তাঁর গানে ধ্বনিত হয় বর্ষার ছন্দ—

”রিমঝিম রিমঝিম বরষা নামে...”

তাই বর্ষা এলে কেবল প্রকৃতিই সজীব হয় না, জেগে ওঠে বাংলা সাহিত্যের বিস্তৃত ভুবনও।

আষাঢ়-শ্রাবণের বৃষ্টিতে প্রাণ ফিরে পায় মাঠ-ঘাট। শুকিয়ে যাওয়া মাটি ফিরে পায় উর্বরতা। নদী, খাল ও বিল ভরে ওঠে পানিতে। কৃষকের চোখে জেগে ওঠে নতুন ফসলের স্বপ্ন। কৃষিনির্ভর বাংলাদেশের অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে বর্ষার সম্পর্ক তাই গভীর ও অবিচ্ছেদ্য।

কদমফুলের সৌরভ, সজল আকাশ, ব্যাঙের ডাক, বৃষ্টিভেজা বিকেল কিংবা জানালার ধারে বসে দূরের বৃষ্টির রেখা দেখা—এসব মিলিয়েই গড়ে ওঠে বাঙালির বর্ষাবোধ। প্রেমিকের কাছে বর্ষা যেমন অপেক্ষার, তেমনি কবির কাছে সৃষ্টির; কৃষকের কাছে আশার, আবার প্রকৃতিপ্রেমীর কাছে মুগ্ধতার ঋতু।

তবে বর্ষার রয়েছে অন্য এক মুখও। নগরজীবনে ভারী বর্ষণ ডেকে আনে জলাবদ্ধতা, যানজট ও দুর্ভোগ। অতিবৃষ্টি কখনও রূপ নেয় বন্যা, নদীভাঙন ও বিপর্যয়ে। তবু সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে বর্ষা বাঙালির অন্যতম প্রিয় ঋতু। কারণ এই ঋতু মানুষকে নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শেখায়, নতুন করে জীবনকে অনুভব করতে শেখায়।

আষাঢ়ের প্রথম দিনকে ঘিরে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আয়োজন করা হয়েছে নানা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। গান, কবিতা, আবৃত্তি ও নৃত্যের মধ্য দিয়ে বরণ করা হবে বর্ষার আগমন।

বর্ষা উৎসব উদ্যাপন পরিষদের উদ্যোগে গত ১৮ বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও অনুষ্ঠিত হচ্ছে ‘বর্ষা উৎসব-১৪৩৩’। আজ সকাল ৭টা ২০ মিনিটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের দক্ষিণ পাশের চত্বরে শিল্পী মো. মিনহাজুল হাসান ইমনের রাগসংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে উৎসবের শুভ সূচনা হবে।

‘বর্ষা কথন’ পর্বে সভাপতিত্ব করবেন লেখক, গবেষক ও নৃত্যশিল্পী অধ্যাপক ড. নিগার চৌধুরী। সম্মানিত অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বরেণ্য আবৃত্তিশিল্পী ও স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কণ্ঠযোদ্ধা আশরাফুল আলম এবং বাংলাদেশ গণসংগীত সমন্বয় পরিষদের সভাপতি কাজী মিজানুর রহমান। শুভেচ্ছা বক্তব্য দেবেন বর্ষা উৎসব উদ্যাপন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মানজার চৌধুরী সুইট।

অন্যদিকে আজ সকাল ৭টা ৩০ মিনিটে বাংলা একাডেমির নজরুল মঞ্চে বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর আয়োজনে অনুষ্ঠিত হবে ‘বর্ষা উৎসব-১৪৩৩’। ওস্তাদ জাবীর ইমাম খানের পরিবেশনায় রাগ ‘মিয়া কি মল্লার’-এর সুরে শুরু হবে দিনব্যাপী আয়োজন। এরপর পরিবেশিত হবে বর্ষার গান, কবিতা, আবৃত্তি ও নৃত্যের নানা পর্ব। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে উদীচীর কেন্দ্রীয় সংগীত বিভাগের পাশাপাশি সমবেত সংগীত পরিবেশন করবে উদীচীর উত্তরা ও ডেমরা শাখা।

আজ আষাঢ়ের প্রথম দিন। কোথাও হয়তো ইতোমধ্যে নেমেছে বৃষ্টির প্রথম ধারা, কোথাও মেঘ এখনো জমছে ধীরে ধীরে। কোনো জানালার ধারে বসে কেউ শুনছে বৃষ্টির শব্দ, কেউবা স্মৃতির ভেতর খুঁজছে হারিয়ে যাওয়া কোনো মুখ। আর বাংলার প্রকৃতি যেন তার অনন্ত স্নিগ্ধতায় বলে উঠছে—এসো, ধুলো ঝেড়ে ফেলি, ক্লান্তি ধুয়ে ফেলি, নতুন করে জীবনকে স্পর্শ করি।

ওই যে— বিরহী মেঘের ডানায় ভেসে এলো কাব্য আর ছন্দময় আষাঢ়।
সানা/আপ্র/১৫/৬/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

চার্লি চ্যাপলিন সেজে জড়ো হলেন ৪২৯ জন
১০ জুন ২০২৬

চার্লি চ্যাপলিন সেজে জড়ো হলেন ৪২৯ জন

কালো ডার্বি হ্যাট, টুথব্রাশ আকৃতির গোঁফ আর হাতে পরিচিত লম্বা ছড়ি-এমন সাজে রোববার সুইজারল্যান্ডে এক...

হুমকিতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য
০৫ জুন ২০২৬

হুমকিতে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য

প্লাস্টিক দূষণে বিপর্যস্ত পরিবেশ

অভিমান, অভাব আর সুরের ভেতর বেঁচে থাকা লাইলী বেগম
২৮ মে ২০২৬

অভিমান, অভাব আর সুরের ভেতর বেঁচে থাকা লাইলী বেগম

শহরের ভিড়ভাট্টা অলিগলি, ধুলোমাখা পথ আর রাতের নিঃশব্দ আকাশের নিচে এক নারী ঘুরে বেড়ান কাঁধে একটি থলে ন...

গোলাপি মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ ঘিরে কৌতূহল
১২ মে ২০২৬

গোলাপি মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ ঘিরে কৌতূহল

আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নারায়ণগঞ্জের একটি খামারে গোলাপি রঙের একটি মহিষ ব্যাপক আগ্রহের কে...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই