মেহেরপুরে বাড়ছে পুঁইশাকের বীজ উৎপাদন। জেলার তিনটি উপজেলার কৃষকরা এখন সবজি চাষের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে পুঁইশাকের বীজ উৎপাদনে ঝুঁকছেন। এতে একদিকে কৃষকের আয় বাড়ছে, অন্যদিকে স্থানীয় চাহিদা পূরণ করে দেশের বিভিন্ন জেলায়ও বীজ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে। এ ছাড়া, এই আবাদকে ঘিরে নারীদের কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। পুঁইশাকের গাছ কর্তনের পর জমিতে তা শুকানো, ঝড়ে যাওয়া বীজ ঝাড়ু দিয়ে গোছানো এবং পরিষ্কার করার মতো কাজে নারীরা সক্রিয়ভাবে যুক্ত রয়েছেন।
কৃষকরা জানান, সাধারণত আশ্বিন-কার্তিক মাসে পুঁইশাকের বীজ বপন করা হয় এবং চৈত্র মাস থেকে বীজ সংগ্রহ শুরু হয়। এটি প্রায় ছয় মাসের একটি আবাদ। এক বিঘা জমিতে বীজ উৎপাদনে খরচ হয় প্রায় ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা। তবে বাজার ভালো থাকলে বিক্রি হয় ১ লাখ থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত। প্রতি বিঘায় গড়ে ৮ থেকে ১০ মন পর্যন্ত বীজ পাওয়া যায়। এক মণ বীজের দাম ১৩ থেকে ১৪ হাজার টাকা হলেও চাহিদা বেশি থাকলে দাম আরও বৃদ্ধি পায়।
জেলার কৃষকরা উচ্চফলনশীল দুই ধরনের জাতের পুইশাক বীজের চাষ করছেন, একটা লালা ও আরেকটি সাদা। মাটির গুণাগুণ ও আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় মেহেরপুরে এই বীজের উৎপাদন ভালো হচ্ছে বলে জানান কৃষক ও কৃষি কর্মকর্তারা। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও সহযোগিতায় অনেক কৃষক এখন বাণিজ্যিকভাবে পুঁইশাক বীজ উৎপাদনের দিকে আগ্রহী হচ্ছেন।
পুঁইশাকের বীজ চাষি আব্দুর রহমান বলেন, আগে আমরা শুধু সবজি হিসেবে পুঁইশাক চাষ করতাম। এখন বীজ উৎপাদন করে বেশি লাভ পাওয়া যাচ্ছে। গত বছর এক বিঘা জমিতে পুঁইশাকের বীজ চাষ করেছিলাম। এতে সব খরচ বাদ দিয়ে প্রায় ৬০ হাজার টাকা লাভ হয়েছিল। এক বিঘা জমিতে সাড়ে ৬ মণ ফলন পেয়েছিলাম। প্রতি মণ ১৩ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছি। তবে প্রথমবার বীজের চাষ করায় ফলন কিছুটা কম হয়েছিল। আশা করছি, এবার এক বিঘা জমিতে ফলন আরও ভালো হবে। আর দাম আগের মতো থাকলে লাভও বেশি হবে। তিনি জানান, অন্যান্য ফসলের তুলনায় পুঁইশাকের বীজ চাষে শ্রম ও ঝুঁকি কম।
আরেক চাষি রাজু আহম্মেদ বলেন, মাঠে অন্যদের পুঁইশাকের বীজের আবাদ দেখে এবং তাদের লাভবান হতে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়ে আমিও এবার ১০ কাঠা জমিতে বীজ উৎপাদনের লক্ষ্যে চাষ করছি। এ পর্যন্ত আমার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা। ফলন ভালো হয়েছে। আগের মতো দাম থাকলে ভালো লাভের আশা করছি। সিদ্ধান্ত নিয়েছি, প্রতি বছর অন্য ফসলের আবাদ কমিয়ে পুঁইশাকের বীজ চাষ বাড়াব। কারণ চাষি হিসেবে লাভের বিষয়টাই আগে ভাবতে হয়। পুঁইশাকের বীজ এখন আমাদের জন্য একটি লাভজনক ফসল হিসেবে দাঁড়িয়েছে।
চাষি ফয়জা বলেন, এবার আমি এক বিঘা জমিতে পুঁইশাকের বীজ চাষ করেছি। পাশাপাশি আরেক বিঘা জমিতে সবজি হিসেবে খাওয়া ও বিক্রির জন্য পুঁইশাক চাষ করেছি। মনে হচ্ছে, শাক হিসেবে বিক্রির চেয়ে বীজ থেকে বেশি লাভ হবে। কারণ পুঁইশাকের বীজের দাম তুলনামূলক বেশি। এজন্য চাষিরা এখন শাকের চাষ কমিয়ে বীজ উৎপাদনের দিকে ঝুঁকছেন। তিনি আরো জানান, গত বছরের তুলনায় এবার মাঠে পুঁইশাকের বীজ চাষ বেড়েছে।
আরেক চাষি আলফাজ হোসেন বলেন, এবার প্রথমবারের মতো এক বিঘা জমিতে পুঁইশাকের বীজ চাষ করেছি। ফলন ভালো হয়েছে। তবে প্রথমবার হওয়ায় সঠিক পরামর্শের অভাবে খরচ কিছুটা বেশি হয়েছে। তবুও মোটামুটি ভালো ফলন পেয়েছি। আশা করছি, ৮ থেকে ৯ মণ ফলন পাব। ইতোমধ্যে হারভেস্ট শুরু করেছি। গাছ কাটার পর রোদে শুকিয়ে এক জায়গায় গুছিয়ে রেখে ঢেকে দিয়েছি। দু-এক দিনের মধ্যে ঝাড়া-বাছাই করে বীজ পরিষ্কার করে সংরক্ষণের পর তা বিক্রি করব।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সঞ্জীব মৃধা বলেন, চলতি রবি মৌসুমে জেলায় মোট ৩৯০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসলের বীজ উৎপাদন করা হয়েছে, যেখান থেকে প্রায় ৪০০ মেট্রিক টন বীজ পাওয়া যাবে। এর মধ্যে ৪০ হেক্টর জমিতে পুঁইশাকের বীজ উৎপাদন হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, পরিকল্পিতভাবে কৃষকদের প্রশিক্ষণ প্রদান এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো গেলে পুঁইশাকের বীজ চাষ জেলায় একটি সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হতে পারে। ভবিষ্যতে এই বীজ স্থানীয় চাহিদা পূরণের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য জেলাতেও সরবরাহ করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এতে কৃষকরাও আরো বেশি লাভবান হবেন।
এসি/আপ্র/১৭/০৪/২০২৬