একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন কেবল সেতু, সড়ক বা উঁচু ভবন নির্মাণে পরিমাপ করা যায় না; নাগরিকের ঘরে চুলা জ্বলে কি না, শিল্পকারখানার চাকা সচল থাকে কি না, বিদ্যুৎকেন্দ্রে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি পৌঁছায় কি না-এসবই উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি এমন তিনটি মৌলিক সেবা, যার যেকোনো একটির ঘাটতিই নাগরিক জীবনকে অসহনীয় করে তোলে। সাম্প্রতিক এলএনজি টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটিজনিত গ্যাস সংকট আবারো প্রমাণ করেছে, জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে আমাদের প্রস্তুতি এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, একটি টার্মিনালের সমস্যা মুহূর্তেই রাজধানী থেকে শিল্পাঞ্চল পর্যন্ত বিস্তীর্ণ জনপদের স্বাভাবিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে দিয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে জাতীয় গ্রিডে প্রতিদিন প্রায় পঞ্চাশ কোটি ঘনফুট গ্যাস কম সরবরাহ হচ্ছে। এর ফলে বাসাবাড়িতে রান্না বন্ধ হওয়ার উপক্রম, সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ সারি, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। সরকার বলছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লাগবে। কিন্তু জনগণের প্রশ্ন আরো গভীর-এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় ত্রুটি দেখা দিলে পুরো দেশের জ্বালানি ব্যবস্থা কেন এতটা অরক্ষিত হয়ে পড়ে? বিকল্প ব্যবস্থা কোথায়? ঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা কতটা কার্যকর?
বাস্তবতা হলো, দেশের গ্যাস খাতে সংকট বহু বছরের। দৈনিক চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে উৎপাদন কমেছে, অথচ আমদানিনির্ভরতা বেড়েছে। এই অবস্থায় এলএনজি টার্মিনাল জাতীয় জ্বালানি ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান ভরসায় পরিণত হয়েছে। তাই এমন স্থাপনায় নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, আন্তর্জাতিক মানের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিকল্প সরবরাহ সক্ষমতা এবং জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলার পরিকল্পনা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার পাওয়ার কথা। যদি একটি কারিগরি ত্রুটিতেই কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবন অচল হয়ে যায়, তবে সেটি কেবল প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং ঝুঁকি ব্যবস্থাপনারও দুর্বলতার ইঙ্গিত বহন করে।
এ কথা সত্য, যান্ত্রিক ত্রুটি পৃথিবীর যেকোনো দেশেই ঘটতে পারে। কিন্তু উন্নত ব্যবস্থাপনার পরিচয় সংকটের অনুপস্থিতিতে নয়, বরং সংকটের প্রভাব কত দ্রুত ও কত দক্ষতার সঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তার ওপর নির্ভর করে। জনগণ বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পানির মতো মৌলিক সেবায় বারবার অনিশ্চয়তা মেনে নিতে পারে না। কারণ এর প্রভাব কেবল রান্নাঘরে সীমাবদ্ধ থাকে না; উৎপাদন ব্যাহত হয়, পরিবহন ব্যয় বাড়ে, ক্ষুদ্র ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হয় এবং সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক অভিঘাত পড়ে। প্রতিটি ঘণ্টার গ্যাস সংকট শেষ পর্যন্ত জাতীয় অর্থনীতির জন্যও ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
অতএব এখন প্রয়োজন তাৎক্ষণিক মেরামতের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা। দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধানে গতি আনতে হবে এবং আমদানিনির্ভরতার ঝুঁকি কমাতে বহুমুখী জ্বালানি উৎস গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে এলএনজি অবকাঠামোয় বিকল্প সক্ষমতা, বাধ্যতামূলক প্রতিরোধমূলক রক্ষণাবেক্ষণ, স্বাধীন কারিগরি নিরীক্ষা এবং দুর্যোগকালীন বিকল্প সরবরাহ পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। সংকটের সময়ে জনগণকে নির্ভুল, স্বচ্ছ ও নিয়মিত তথ্য দেওয়াও রাষ্ট্রের দায়িত্ব; কারণ গোপনীয়তা নয়, আস্থাই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে বড় শক্তি।
জ্বালানি নিরাপত্তা কোনো বিলাসী উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং নাগরিক আস্থার ভিত্তি। গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির মতো মৌলিক সেবায় অব্যবস্থাপনা কিংবা প্রস্তুতির ঘাটতির দায় কখনোই সাধারণ মানুষের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। জনগণ অজুহাত নয়, কার্যকর সমাধান চায়। তাই সরকারের প্রতিটি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানের এখনই উপলব্ধি করা উচিত-জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে আর কোনো গাফিলতির সুযোগ নেই।
সানা/আপ্র/২৫/৭/২০২৬