দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ বিস্তার আজ এক গভীর মানবিক সংকটে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন নতুন নতুন সংক্রমণ। আর এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা। এই নির্মম বাস্তবতা কেবল পরিসংখ্যান নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একেকটি ভেঙে পড়া পরিবার, একেকটি শূন্য হয়ে যাওয়া মায়ের বুক। একটি শিশুর নিথর দেহ যখন হাসপাতালের করিডোর পেরিয়ে বেরিয়ে আসে, তখন শুধু একটি প্রাণের অবসান ঘটে না; নিভে যায় একটি পরিবারের স্বপ্ন, থেমে যায় অসংখ্য সম্ভাবনার পথচলা। বর্তমান পরিস্থিতি প্রমাণ করছে, আমরা একটি প্রতিরোধযোগ্য রোগের কাছে অপ্রস্তুত অবস্থায় আত্মসমর্পণ করছি। হাজার হাজার শিশু আক্রান্ত হচ্ছে, অনেকে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর আবার জটিল সংক্রমণে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ফিরছে। এই পুনর্সংক্রমণ কেবল রোগের প্রকৃতি নয়; বরং আমাদের চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা, অপূর্ণ চিকিৎসা এবং পরবর্তী পরিচর্যার ঘাটতির নির্মম প্রতিফলন। কোনো শিশুকে সুস্থ ঘোষণা করার আগে তার পূর্ণ আরোগ্য নিশ্চিত না করা হলে ওই অবহেলা পরিণত হচ্ছে মৃত্যুঝুঁকিতে।
এদিকে হাসপাতালগুলোর করুণ চিত্র আমাদের আরো বিচলিত করে। শয্যা সংকট, চিকিৎসা সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতা ও রোগীর চাপ- সব মিলিয়ে এক ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। অসহায় মা-বাবা অসুস্থ শিশুকে কোলে নিয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটছেন। কিন্তু কোথাও নিশ্চিত আশ্রয় পাচ্ছেন না। এই দৃশ্য কোনো মানবিক রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। এটি কেবল স্বাস্থ্য খাতের সংকট নয়, রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতারও প্রশ্ন। বিশেষজ্ঞরা স্পষ্টভাবে জানাচ্ছেন, হামের বিরুদ্ধে সবচেয়ে কার্যকর প্রতিরোধ হলো টিকাদান। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে- টিকার ঘাটতি, অব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতার অভাবে অসংখ্য শিশু এখনো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এর পাশাপাশি পুষ্টিহীনতা ও দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আক্রান্ত শিশুদের আরো বেশি ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে। ফলে একটি সাধারণ সংক্রমণ দ্রুত জটিল আকার ধারণ করছে।
এখন সময় এসেছে কঠোর ও সর্বাত্মক পদক্ষেপ নেওয়ার। প্রথমত, জাতীয় পর্যায়ে জরুরি কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করে টিকাদান কার্যক্রম সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে প্রত্যেক শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, করোনাকালের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দ্রুত বিশেষায়িত হাসপাতাল, আইসোলেশন ইউনিট ও নিবিড় পরিচর্যা শয্যা বৃদ্ধি করতে হবে। তৃতীয়ত, আক্রান্ত শিশুদের জন্য বিনামূল্যে ও মানসম্মত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে- যাতে কোনো পরিবার আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত না হয়। এর পাশাপাশি সুস্থতার পর পুষ্টি ও পরিচর্যার বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা, ওই সংকটকে আর দূর থেকে দেখার সুযোগ নেই। প্রতিটি শিশুমৃত্যু আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের সম্মিলিত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। একেকজন মা-বাবার বুক খালি হয়ে যাওয়ার এ হৃদয়বিদারক বাস্তবতা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। একটি মানবিক রাষ্ট্র কখনোই দর্শকের ভূমিকা পালন করতে পারে না। তাকে এগিয়ে আসতেই হবে রক্ষকের ভূমিকায়। হাম নিয়ন্ত্রণে এখনই দরকার সুসংগঠিত, কঠোর ও সর্বাত্মক কর্মপরিকল্পনা। সময়মতো সঠিক পদক্ষেপই পারে এই অমানবিক পরিস্থিতি থেকে দেশকে উদ্ধার করতে। অন্যথায় এই নীরব মহামারি আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গভীর অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেবে।
সানা/এসি/আপ্র/১২/৪/২০২৬