গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

মেনু

খাদ্য যখন আতঙ্কের নাম, রাষ্ট্র তখন নীরব থাকতে পারে না

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১১:৪৫ পিএম, ০৭ জুন ২০২৬ | আপডেট: ১২:৩৭ এএম ২০২৬
খাদ্য যখন আতঙ্কের নাম, রাষ্ট্র তখন নীরব থাকতে পারে না
ছবি

ফাইল ছবি

একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার নাগরিকের নিরাপত্তা। সেই নিরাপত্তা কেবল সীমান্ত, আইনশৃঙ্খলা বা অর্থনৈতিক সক্ষমতার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের প্রতিদিনের খাদ্যও এর অন্যতম মৌলিক উপাদান। যে খাদ্য জীবন রক্ষা করবে, পুষ্টি জোগাবে এবং সুস্থ ভবিষ্যতের ভিত্তি নির্মাণ করবে, সেই খাদ্যই যদি রোগ, অক্ষমতা ও মৃত্যুর কারণ হয়ে ওঠে, তবে তা শুধু জনস্বাস্থ্যের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা, সুশাসন এবং উন্নয়নের ভিত্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আজ বাংলাদেশের বাস্তবতায় নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি ঠিক এমন এক সংকটময় পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনিরাপদ খাদ্যের কারণে বিশ্বে প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ মানুষের মৃত্যু হয় এবং ৮৬ কোটিরও বেশি মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই বিপদের বড় অংশের শিকার পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা। খাদ্যে থাকা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও পরজীবীর পাশাপাশি রাসায়নিক দূষণ এখন মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আর্সেনিক, সিসা এবং অন্যান্য বিষাক্ত উপাদানের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব হৃদরোগ, ক্যানসার ও জটিল অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এই সতর্কবার্তা কেবল বৈশ্বিক বাস্তবতার প্রতিফলন নয়; এটি বাংলাদেশের জন্যও এক গভীর সতর্কসংকেত।

দেশের বিভিন্ন গবেষণা ও সরকারি তথ্য বলছে, অনিরাপদ খাদ্যের কারণে প্রতিবছর প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের মৃত্যু ঘটে। অসংখ্য মানুষ খাদ্যবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে কর্মক্ষমতা হারাচ্ছেন, চিকিৎসা ব্যয়ের ভারে বিপর্যস্ত হচ্ছেন এবং দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। শিশুদের পুষ্টিহীনতা, শারীরিক বিকাশে বাধা এবং ভবিষ্যৎ কর্মক্ষমতার ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অর্থাৎ অনিরাপদ খাদ্য কেবল ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যহানির কারণ নয়-এটি জাতীয় মানবসম্পদকে দুর্বল করে দেয়, উৎপাদনশীলতা কমিয়ে দেয় এবং উন্নয়নের ভিতকে ক্ষয় করে।

সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী যথার্থভাবেই বলেছেন, “জিলাপি খেয়ে আতঙ্কে ভোগা” কোনো স্বাভাবিক দেশের চিত্র হতে পারে না। কথাটি নিছক রসিকতা নয়; এটি আমাদের সময়ের এক নির্মম বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। আজ সাধারণ মানুষ ফল কিনতে ভয় পায়, মাছ-মাংসের মান নিয়ে সন্দিহান থাকে, মিষ্টি বা ভাজাপোড়া খাবার খেতে গেলেও রাসায়নিকের আশঙ্কা তাড়া করে। একটি রাষ্ট্রের জন্য এর চেয়ে বড় আস্থার সংকট আর কী হতে পারে? যখন নাগরিক প্রতিদিনের আহার নিয়েও নিশ্চিন্ত হতে পারে না, তখন উন্নয়নের পরিসংখ্যানের অনেক অর্জনই ম্লান হয়ে যায়।

দুঃখজনক হলেও সত্য, অনিরাপদ খাদ্যের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই এখনো অনেকাংশে মৌসুমি। উৎসব বা বিশেষ সময়ে অভিযান পরিচালনা, জরিমানা আর কিছু প্রতীকী শাস্তি দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন উৎপাদন থেকে বিপণন পর্যন্ত সমগ্র খাদ্যশৃঙ্খলকে কঠোর নজরদারির আওতায় আনা। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, বিএসটিআই, স্বাস্থ্য বিভাগ, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক পরীক্ষাগারের সংখ্যা বাড়ানো, জনবল সংকট দূর করা, ডিজিটাল অনুসরণব্যবস্থা চালু করা এবং ভেজালকারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।

নিরাপদ খাদ্য কোনো বিলাসিতা নয়-এটি সাংবিধানিক অধিকার এবং মানবিক মর্যাদার অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে রাষ্ট্র তার নাগরিককে বিশুদ্ধ খাদ্যের নিশ্চয়তা দিতে পারে না, সে রাষ্ট্রের উন্নয়ন কখনোই পূর্ণতা পায় না। তাই অনিরাপদ খাদ্যের বিরুদ্ধে লড়াইকে আর বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রম হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এটিকে জাতীয় অগ্রাধিকার, জনস্বাস্থ্য আন্দোলন এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ খাদ্য যখন আতঙ্কের নাম হয়ে ওঠে, তখন রাষ্ট্রের নীরবতা শুধু ব্যর্থতাই নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি এক গুরুতর অবিচার। 
সানা/আপ্র/৭/৬/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনীতির সতর্কবার্তা
০৬ জুন ২০২৬

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি ও অর্থনীতির সতর্কবার্তা

বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি শুধু একটি সেবার মূল্য সমন্বয়ের ঘটনা নয়; এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতি, জনজীবন এব...

স্বাধীন সাংবাদিকতার পথেই গণতন্ত্র ও কল্যাণ রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা
০৪ জুন ২০২৬

স্বাধীন সাংবাদিকতার পথেই গণতন্ত্র ও কল্যাণ রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা

একটি রাষ্ট্র কতটা গণতান্ত্রিক, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং কতটা জনকল্যাণমুখী-তার অন্যতম নির্ভরযোগ্য মানদণ্...

প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য এক রাজনৈতিক পাঠশালার নাম তোফায়েল আহমেদ
০৩ জুন ২০২৬

প্রজন্মের পর প্রজন্মের জন্য এক রাজনৈতিক পাঠশালার নাম তোফায়েল আহমেদ

তোফায়েল আহমেদের প্রস্থান শুধু একজন প্রবীণ রাজনীতিকের মৃত্যু নয়; এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক...

মবের পুনরুত্থান: কোথায় রাষ্ট্রের শূন্য সহনশীলতা?
০২ জুন ২০২৬

মবের পুনরুত্থান: কোথায় রাষ্ট্রের শূন্য সহনশীলতা?

আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রে বিচার হয় আদালতে, শাস্তি দেয় রাষ্ট্র, আর নাগরিকের নিরাপত্তার দায়িত্ব ব...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

ঢাকা আর বাসযোগ্য নেই, সব রোগের মূল বুড়িগঙ্গা

রাজধানী ঢাকার বর্তমান পরিবেশ ও নাগরিক দুরবস্থা নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তিনি বলেছেন, ‘এটা (ঢাকা) আর বাসযোগ্য মনে হয় না। ঘর থেকে বেরোলেই নিঃশ্বাস নেওয়া যায় না, চারদিকে দূষিত বাতাস। আমার তো মনে হয়, ঢাকার সব রোগের মূলেই বুড়িগঙ্গা। আপনি কি মন্ত্রীর এই বক্তব্যে একমত?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 21 ঘন্টা আগে