জন্ম থেকেই দুই হাত নেই। তবে শারীরিক সীমাবদ্ধতাকে কখনোই নিজের স্বপ্নের পথে বাধা হতে দেননি সিরাজগঞ্জের নিলা খাতুন। অদম্য ইচ্ছাশক্তি, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে পা দিয়ে লিখেই তিনি অর্জন করেছেন কামিল (মাস্টার্স সমমান) ডিগ্রি। তার এই সাফল্য এখন অনেকের কাছে অনুপ্রেরণার উদাহরণ।
দিনমজুর উসমান গনি ও শাহিনুর বেগম দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে তৃতীয় নিলা জন্ম থেকেই দুই হাতবিহীন। ছোটবেলা থেকেই লেখাপড়ার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। শুরুতে মায়ের সহায়তায় বিদ্যালয়ে যাতায়াত করলেও ধীরে ধীরে নিজের সব কাজ নিজেই করতে শিখে নেন। বর্তমানে পা দিয়েই লেখালেখি, পরীক্ষা দেওয়া থেকে শুরু করে দৈনন্দিন সব কাজ স্বাভাবিকভাবে সম্পন্ন করেন।
লেখাপড়ার পাশাপাশি ঘরের নানা কাজেও দক্ষ নিলা। পা দিয়ে তরকারি ও মাছ কাটা, উঠান ঝাড়ু দেওয়া এমনকি টিউবওয়েল চাপিয়ে পানি তোলার মতো কাজও করেন তিনি।
শিক্ষাজীবনে ধারাবাহিকভাবে ভালো ফল করেছেন নিলা। ২০১৭ সালে দাখিল পরীক্ষায় জিপিএ-৩.৭০, ২০১৯ সালে আলিমে জিপিএ-৩.৮৬ এবং ২০২২ সালে ফাজিলে ২.৯২ সিজিপিএ অর্জন করেন। পরে সিরাজগঞ্জ আহমেদ কামিল মাদরাসা থেকে কামিল প্রথম বর্ষে ২.৯৮ ও দ্বিতীয় বর্ষে ২.৯২ সিজিপিএ পেয়ে মাস্টার্স সমমানের ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
নিলা খাতুন বলেন, শিক্ষকতাই তার সবচেয়ে প্রিয় পেশা। এজন্য সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষক নিবন্ধন (এনটিআরসিএ)-এর জন্য আবেদন করেছেন। একটি সরকারি চাকরি পেলে দীর্ঘদিনের সংগ্রাম সার্থক হবে বলে আশা তার।
নিলার মা শাহিনুর বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই মেয়ের পড়াশোনার প্রবল আগ্রহ ছিল। নানা কষ্টের মধ্যেও সে কখনো হাল ছাড়েনি। এখন তার একমাত্র চাওয়া, মেয়েটি যেন একটি সরকারি চাকরির সুযোগ পায়।
অসুস্থ বাবা উসমান গনি বলেন, দিনমজুরি করে অনেক কষ্টে মেয়েকে পড়িয়েছেন। এখন সরকারের কাছে তার একটাই আবেদন—নিলার যোগ্যতার মূল্যায়ন করে তাকে একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া হোক।
কামারখন্দ ফাজিল মাদরাসার বাংলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শমসের আলী বলেন, নিলা অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। দুই হাত না থাকলেও পা দিয়ে লিখে যে সাফল্য তিনি অর্জন করেছেন, তা অন্য শিক্ষার্থীদের জন্য অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত।
জীবনের প্রতিটি ধাপে প্রতিকূলতাকে জয় করে এগিয়ে চলা নিলা খাতুন এখন শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। নিজের সংগ্রামের গল্পকে সফলতার গল্পে রূপ দেওয়ার পাশাপাশি সমাজের পিছিয়ে পড়া মানুষকে আত্মবিশ্বাস ও সাহস জোগাতে চান তিনি।
এসি/আপ্র/২২/০৭/২০২৬