দেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই এক গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় সংসদে শীর্ষ ২০ ঋণখেলাপির তালিকা প্রকাশের মধ্য দিয়ে সেই সংকটের ভয়াবহতা আবারো নগ্নভাবে সামনে এসেছে। ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৪৪ হাজার ৮৩১ কোটি টাকা-যা শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক শৃঙ্খলার জন্য এক গভীর সতর্কসংকেত।
এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃতি ও বিস্তার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একাধিক বৃহৎ শিল্পগোষ্ঠী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়িক সত্তা দীর্ঘদিন ধরে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণ করে তা পরিশোধে ব্যর্থ বা অনিচ্ছুক। আরো উদ্বেগজনক বিষয় হলো-একই গোষ্ঠীর একাধিক প্রতিষ্ঠান তালিকায় স্থান পেয়েছে, যা ঋণ ব্যবস্থাপনায় গলদ, তদারকির দুর্বলতা এবং নীতিগত শৈথিল্যের স্পষ্ট প্রতিফলন।
প্রশ্নটি এখন মৌলিক-দেশের সীমিত ব্যাংকিং সম্পদ যদি গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের কাছে এভাবে আটকে থাকে, তবে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ কিংবা নতুন প্রজন্মের উদ্যোগীরা কোথা থেকে ঋণ পাবে? উন্নয়ন কোনো একচেটিয়া অধিকার নয়; এটি সবার জন্য সমান সুযোগের বিষয়। অথচ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, যারা অর্থনীতির প্রকৃত চালিকাশক্তি-তাদের জন্য ঋণের দ্বার ক্রমশ সংকুচিত হয়ে আসছে।
অতীতের অভিজ্ঞতা আরো হতাশাজনক। বিগত সময়গুলোতে অনেক নামমাত্র প্রতিষ্ঠান বিপুল অঙ্কের ঋণ নিয়ে তা উৎপাদন বা বিনিয়োগে ব্যবহার না করে বিদেশে পাচার করেছে-এমন অভিযোগ বহুবার উঠে এসেছে। এতে একদিকে যেমন দেশের অর্থনীতিতে রক্তক্ষরণ হয়েছে, অন্যদিকে ব্যাংকিং খাতের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
অর্থমন্ত্রী সংসদে যে পদক্ষেপগুলোর কথা উল্লেখ করেছেন-যেমন ত্রৈমাসিক পর্যালোচনা, ঋণ পুনরুদ্ধারে কর্মপরিকল্পনা, আইন সংস্কার, ইচ্ছাকৃত খেলাপি শনাক্তকরণ-এসব অবশ্যই ইতিবাচক উদ্যোগ। তবে প্রশ্ন থেকে যায়, এসব উদ্যোগ কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে? অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, নীতিমালা প্রণয়নই যথেষ্ট নয়; এর কঠোর ও নিরপেক্ষ প্রয়োগই মূল চাবিকাঠি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, খেলাপি ঋণের এই দুষ্টচক্র ভাঙতে কয়েকটি মৌলিক সংস্কার অপরিহার্য। প্রথমত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও দৃশ্যমান শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করতে হবে, যাতে ঋণ বিতরণ ও পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়া স্বচ্ছ থাকে। তৃতীয়ত, ব্যাংকগুলোর অভ্যন্তরীণ ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও জবাবদিহিতা জোরদার করতে হবে। চতুর্থত, অর্থঋণ আদালতের কার্যক্রম দ্রুততর ও দক্ষ করতে হবে, যাতে বছরের পর বছর মামলা ঝুলে না থাকে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী ঋণ শ্রেণিকরণ, জামানতের সঠিক মূল্যায়ন এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠনের মতো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হলে কিছুটা অগ্রগতি সম্ভব। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-আইনের চোখে সবাই সমান এই নীতি বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করা। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, ঋণখেলাপির ক্ষেত্রে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া যাবে না।
রাষ্ট্রের জন্য এটি এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, নৈতিকতার প্রশ্নও। সাধারণ আমানতকারীর অর্থ দিয়ে গড়ে ওঠা ব্যাংকিং খাত যদি কিছু অসাধু গোষ্ঠীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে, তবে তা একটি দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের জন্য লজ্জাজনক। তাই সময় এসেছে শক্ত হাতে হাল ধরার-অবিলম্বে, নিরপেক্ষভাবে এবং আপসহীনভাবে।
খেলাপি ঋণের লাগাম টেনে ধরা না গেলে দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়বে। বিপরীতে, কঠোর শাসন, জবাবদিহিতা ও ন্যায়ভিত্তিক ঋণব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার হবে। সরকারের কাছে এখন প্রত্যাশা-কথায় নয়, কাজে প্রমাণ দিক; এবং প্রমাণ করুক যে দেশের অর্থনীতি আর কোনোভাবেই খেলাপিদের কাছে জিম্মি থাকবে না।
সানা/আপ্র/৮/৫/২০২৬