গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
রোববার, ০৯ আগস্ট ২০২৬

মেনু

জনস্বাস্থ্যের নীরব বিপদ ‘সুপারবাগ’

প্রেসক্রিপশনে সংযম না এলে বিপদ অনিবার্য

সুখদেব কুমার সানা

সুখদেব কুমার সানা

প্রকাশিত: ১৭:১৩ পিএম, ০৬ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১০:৫৩ এএম ২০২৬
প্রেসক্রিপশনে সংযম না এলে বিপদ অনিবার্য
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ঢাকার নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রগুলোতে যে নীরব বিপদ ছড়িয়ে পড়ছে, তা কেবল একটি হাসপাতাল-সংক্রান্ত সংক্রমণের গল্প নয়; এটি আমাদের সামগ্রিক স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক গভীর সংকেত। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবি-এর সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে-‘ক্যানডিডা অরিস’ নামের ওষুধ-প্রতিরোধী ছত্রাক ঢাকার আইসিইউগুলোতে উদ্বেগজনক হারে বিস্তার লাভ করছে। গবেষণাটি পরিচালিত হয়েছে আইইডিসিআর-এর সহযোগিতা এবং যুক্তযাষ্ট্রের সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-এর কারিগরি সহায়তায়। ফলে এর ফলাফলকে হালকাভাবে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউতে ভর্তি রোগীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের শরীরে ক্যানডিডা অরিস পাওয়া গেছে এবং তাদের অনেকে হাসপাতালে থাকার সময়ই সংক্রমিত হয়েছেন। অর্থাৎ সংক্রমণ কেবল বাইরে থেকে আমদানি নয়; হাসপাতালের ভেতরেই এর বিস্তার ঘটছে। সরকারি হাসপাতালে সংক্রমণের হার বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় বেশি-যা সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ঘাটতির দিকে সরাসরি আঙুল তোলে। প্রশ্ন হলো, আমাদের হাসপাতালগুলো কতটা প্রস্তুত? নিয়মিত জীবাণুনাশ, হাত ধোয়ার কঠোর অনুশীলন, স্ক্রিনিং ও নজরদারি-এসব কি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে?

ক্যানডিডা অরিসের ভয়াবহতা এখানেই যে, এটি বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিফাঙ্গাল ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী। অর্থাৎ প্রচলিত চিকিৎসা পদ্ধতি ক্রমেই অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এই বাস্তবতা আমাদের আরো বড় এক সংকটের দিকে নিয়ে যায়-অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর। অকারণে অ্যান্টিবায়োটিক ও অ্যান্টিফাঙ্গাল ব্যবহারের ফলে জীবাণুগুলো অভিযোজিত হয়ে শক্তিশালী হয়ে উঠছে, আর আমরা হারাচ্ছি কার্যকর চিকিৎসার অস্ত্র।

আমাদের দেশে সামান্য জ্বর, সর্দি বা কাশি হলেই অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের প্রবণতা উদ্বেগজনক। ভাইরাসজনিত সাধারণ ঠান্ডা-কাশিতে অ্যান্টিবায়োটিকের কোনো কার্যকারিতা নেই-তবু তা নেওয়া হচ্ছে। ফার্মেসি থেকে সহজলভ্যতা, প্রেসক্রিপশনে অপ্রয়োজনীয় ওষুধ লেখা এবং রোগীর দ্রুত আরোগ্যের চাপ-সব মিলিয়ে একটি বিপজ্জনক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এই সংস্কৃতি অব্যাহত থাকলে ‘সুপারবাগ’ আর ব্যতিক্রম থাকবে না; বরং নিয়মে পরিণত হবে।

এখন সময় কঠিন সিদ্ধান্তের। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল স্টুয়ার্ডশিপ কর্মসূচি জোরদার করতে হবে। প্রেসক্রিপশন ছাড়া অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। চিকিৎসকদের জন্য প্রমাণভিত্তিক গাইডলাইন বাধ্যতামূলকভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে। হাসপাতালগুলোতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আলাদা মনিটরিং সেল গঠন ও নিয়মিত অডিট চালু করা জরুরি।

একইসঙ্গে প্রয়োজন জনসচেতনতা। গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও কমিউনিটি পর্যায়ে প্রচারণা চালিয়ে স্পষ্টভাবে জানাতে হবে-জ্বর বা ঠান্ডা-কাশি মানেই অ্যান্টিবায়োটিক নয়। রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসা হবে পরীক্ষাভিত্তিক, যুক্তিনির্ভর। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ গ্রহণ নয়-এই বার্তাটি সামাজিক আন্দোলনে রূপ নিতে হবে।

ভুলে গেলে চলবে না, অ্যান্টিবায়োটিক আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম বড় অর্জন। এই ওষুধের কার্যকারিতা নষ্ট হয়ে গেলে ক্যানসারের চিকিৎসা, বড় অস্ত্রোপচার, অঙ্গপ্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন-সবই ঝুঁকির মুখে পড়বে। আজ যে শিশুটি আইসিইউতে, যে প্রবীণটি ভেন্টিলেশনে-তাদের জীবন রক্ষার জন্য কার্যকর ওষুধ প্রয়োজন। সেই ওষুধ যদি আমাদেরই অসচেতনতায় অকার্যকর হয়ে পড়ে, তার দায় কে নেবে?

‘সুপারবাগ’ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে-সময় খুব বেশি নেই। প্রেসক্রিপশনে সংযম, ওষুধ বিক্রিতে নিয়ন্ত্রণ এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে বিপদ অনিবার্য। এখনই নীতি ও প্রয়োগে কঠোরতা আনতে হবে।

জনস্বাস্থ্য কোনো একক প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট ও নাগরিক-সবার সম্মিলিত অঙ্গীকার। অযাচিত অ্যান্টিবায়োটিক নয়, সচেতন চিকিৎসাই হোক আমাদের পথ। তাহলেই নীরব এই বিপদকে প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সানা/আপ্র/৬/৩/২০২৬
 

সংশ্লিষ্ট খবর

রাষ্ট্রীয় মর্যাদার মঞ্চে শৃঙ্খলা ও সংযমের অনিবার্য পাঠ
০৮ আগস্ট ২০২৬

রাষ্ট্রীয় মর্যাদার মঞ্চে শৃঙ্খলা ও সংযমের অনিবার্য পাঠ

রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলের আবেগ প্রকাশের সাধারণ মঞ্চ নয়; এটি একটি জাতির ভাবমূর্...

সড়কে নীরব মহামারি রোধে কঠোর পদক্ষেপ দরকার
০৬ আগস্ট ২০২৬

সড়কে নীরব মহামারি রোধে কঠোর পদক্ষেপ দরকার

জনের প্রাণহানির পরিসংখ্যান আমাদের জাতীয় বিবেককে নতুন করে নাড়া দিয়েছে। প্রতিদিন ঝরে যাওয়া এই তাজা প্র...

বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিস্তার এখন শুধু একটি সংক্রামক রোগের সংকট
০৬ আগস্ট ২০২৬

বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিস্তার এখন শুধু একটি সংক্রামক রোগের সংকট

বাংলাদেশে হামের সাম্প্রতিক ভয়াবহ বিস্তার এখন শুধু একটি সংক্রামক রোগের সংকট নয়; এটি রাষ্ট্রীয় জবাবদিহ...

রাজধানী যখন আতঙ্কের প্রতীক, নিরাপত্তা সংস্কারে আর বিলম্ব নয়
০৪ আগস্ট ২০২৬

রাজধানী যখন আতঙ্কের প্রতীক, নিরাপত্তা সংস্কারে আর বিলম্ব নয়

ঢাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কেন্দ্র। এই শহরের নিরাপত্তা পরিস্থিতি শুধু রাজধানীবা...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

শেখ হাসিনার বক্তব্য সমর্থন করে না ভারত, জানালেন জয়সওয়াল

বাংলাদেশের বর্তমান বৈধ ও গঠিত সরকারের বিষয়ে ভারতে অবস্থানরত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া বক্তব্য সমর্থন করে না নয়াদিল্লি। শুক্রবার (৭ আগস্ট) ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল এ কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, “এই অনুষ্ঠান সম্পর্কে আমাদের অবস্থান আগেই স্পষ্ট করা হয়েছে। আমি আবারো সেটিই বলছি। এটি একটি বেসরকারি সংবাদমাধ্যম আয়োজিত অনুষ্ঠান ছিল, যেখানে ভারত সরকারের কোনো ভূমিকা ছিল না।” প্রিয় পাঠক. আপনি কি মনে করেন ভারত সঠিক বলেছে?

মোট ভোট: ১ | শেষ আপডেট: 1 দিন আগে