পবিত্র ঈদুল ফিতর সামনে রেখে রেশনিং ব্যবস্থা তুলে নেওয়া হলেও জ্বালানি তেলের সংকট এখনো পুরোপুরি কাটেনি। চার দিন পেরিয়ে গেলেও রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন ও তেল না পাওয়ার চিত্র অব্যাহত রয়েছে।
বুধবার (১৮ মার্চ) সরেজমিনে দেখা যায়, কোথাও পাম্প বন্ধ, কোথাও সীমিত সরবরাহ-ফলে মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও বাসের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়েছে। ঈদের ছুটিতে যানবাহনের চাপ কিছুটা কমলেও যেসব পাম্পে তেল পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে ভিড় কমেনি।
কোথাও পাম্প বন্ধ, কোথাও সীমিত সরবরাহে চাপ: রাজধানীর শেওড়াপাড়া ও তালতলা এলাকায় একাধিক পাম্প বন্ধ থাকতে দেখা গেছে। আবার শেরাটন হোটেলের বিপরীত পাশের একটি পাম্প খোলা থাকলেও সেখানে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে গ্রাহকদের। হাজিপাড়া এলাকার একটি পাম্পের কর্মচারী জানান, দৈনিক প্রায় ৯ হাজার লিটার চাহিদার বিপরীতে তারা পাচ্ছেন মাত্র ৪ হাজার লিটার তেল। ফলে সরবরাহ আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই তা শেষ হয়ে যাচ্ছে এবং অনেক সময় পাম্প বন্ধ রাখতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।
রেশনিং তুলে নেওয়ার ঘোষণা বাস্তবে পুরোপুরি কার্যকর নয়: পাম্প মালিকদের অভিযোগ, কাগজে-কলমে রেশনিং তুলে নেওয়া হলেও বাস্তবে সরবরাহ এখনো সীমিত। একটি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানির বিরুদ্ধে চাহিদার তুলনায় অর্ধেকেরও কম তেল সরবরাহ করার অভিযোগ উঠেছে। পেট্রোল পাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন-এর কো-কনভেনর মিজানুর রহমান রতন বলেন, বাস্তব পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সীমিত সরবরাহের কারণে সাধারণ মানুষ ও পাম্প মালিক-উভয়ই ভোগান্তিতে পড়ছেন। ডিলারদের মতে, ডিপো পর্যায়ে সরবরাহ না বাড়ানো পর্যন্ত এই সংকট কাটবে না। এখনও অনেক ক্ষেত্রে আগের নির্দেশনা অনুযায়ী সীমিত সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে, যা মাঠপর্যায়ে বিভ্রান্তি তৈরি করছে।
দীর্ঘ লাইনে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা: রাজধানীর খিলক্ষেত, গুলশান, মহাখালী ও বিজয় সরণিসহ বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনগুলোর সামনে ভোর থেকেই দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। খিলক্ষেতের একটি ফিলিং স্টেশনে সকাল ১০টা পর্যন্ত তেল দেওয়া শুরু হয়নি। কর্তৃপক্ষ জানায়, তেলের গাড়ি পৌঁছানোর পর সরবরাহ শুরু হবে। পরে সেখানে বিক্রি শুরু হলে যাত্রীরা চাহিদামতো তেল পেলেও দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হয়েছে। একাধিক চালক জানান, ভোর থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হচ্ছে, আবার কয়েকদিন পরপর তেল নিতে আসতে হচ্ছে-যা বাড়তি ভোগান্তি তৈরি করছে।
কোথাও শুধু ডিজেল, কোথাও সম্পূর্ণ বন্ধ: মহাখালী এলাকার একটি পাম্পে শুধু ডিজেল পাওয়া গেছে, অন্য জ্বালানি তেল না থাকায় পাম্প আংশিক বন্ধ ছিল। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, নির্দিষ্ট সময়ের পর অকটেন সরবরাহ এলে বিক্রি শুরু হবে। অন্যদিকে কিছু পাম্পে রাতেই তেল শেষ হয়ে যাওয়ায় সেগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। আবার কোথাও শুধু সিএনজি দেওয়া হচ্ছে, তেল সরবরাহ বন্ধ রয়েছে।
চাহিদা পূরণে বৈষম্য, বিভ্রান্তিতে গ্রাহক: একই শহরের বিভিন্ন পাম্পে ভিন্ন ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে-কোথাও পর্যাপ্ত সরবরাহ, কোথাও তীব্র সংকট। এতে গ্রাহকদের মধ্যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।
কিছু পাম্প কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, তারা চাহিদামতো তেল সরবরাহ করতে পারছে। তবে অধিকাংশ জায়গায় বাস্তবতা ভিন্ন-দীর্ঘ লাইন ও সীমিত সরবরাহই প্রধান চিত্র।
ভারসাম্যহীন সরবরাহ ব্যবস্থাই মূল কারণ: পাম্প মালিকদের আরেক অংশের মতে, দীর্ঘদিন রেশনিং চালু থাকায় সরবরাহ ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। হঠাৎ করে তা স্বাভাবিক করা সম্ভব নয়। ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে তারা আশা করছেন।
ঈদযাত্রায় বাড়তে পারে সংকট: সব মিলিয়ে, জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর আশ্বাস থাকলেও বাস্তবে সংকট পুরোপুরি কাটেনি। সামনে ঈদযাত্রার চাপ বাড়লে এই পরিস্থিতি আরো জটিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে সড়কপথে যাত্রা ও পরিবহন ব্যবস্থা উভয়ই বড় ধরনের চাপে পড়তে পারে, যা জনভোগান্তি আরো বাড়াবে।
সানা/আপ্র/১৮/৩/২০২৬