একেএম ফজলুল হক: চট্টগ্রাম মহানগরের ফুটপাত দিন দিন হকার, ভ্যান ও অস্থায়ী দোকানের দখলে চলে যাচ্ছে। নতুন নতুন এলাকায় অবৈধ স্থাপনা গড়ে ওঠায় পথচারীরা বাধ্য হচ্ছেন ব্যস্ত সড়ক দিয়ে চলাচল করতে। এতে নগরজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে চরম বিশৃঙ্খলা ও দুর্ভোগ।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নিয়মিত উচ্ছেদ অভিযান চালালেও কিছুদিনের মধ্যেই হকাররা আবার একই স্থানে দখল নিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে উচ্ছেদ অভিযানেও টেকসই কোনো সমাধান মিলছে না।
নগরবাসীর অভিযোগ, ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে চসিকের প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, নিয়মিত নজরদারি এবং কঠোর ও ধারাবাহিক ব্যবস্থা। শুধু অভিযান নয়, স্থায়ী সমাধান জরুরি বলে মনে করছেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল, ছাত্র সংগঠনের কিছু নেতাকর্মী ও চাঁদাবাজ চক্র বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। চাঁদা না দিলে হকারদের বসতে দেওয়া হয় না বলেও অভিযোগ উঠেছে। তবে ভয়ে অনেক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন না।
জানা গেছে, গত ষোলো বছরে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) নগরের সড়ক উন্নয়ন ও সম্প্রসারণে বিপুল অর্থ ব্যয় করেছে। সিডিএ ২৪টি প্রকল্পে ১২ হাজার ৩৫৮ কোটি টাকা এবং চসিক ১৫টি প্রকল্পে ৪ হাজার ৯৭৪ কোটি টাকা ব্যয় করেছে, যার মোট পরিমাণ ১৭ হাজার ৩৩২ কোটি টাকা। তবুও কাঙ্ক্ষিত সুফল মিলছে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চট্টগ্রামে বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৪৪২ কিলোমিটার সড়ক ও প্রায় ৩০০ কিলোমিটার ফুটপাত রয়েছে। প্রতিদিন বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত প্রায় ২৫ হাজার হকার বিভিন্ন স্থানে দোকান বসান। এতে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ফুটপাত কার্যত দখলে থাকে বলে জানা যায়।
সিডিএর চট্টগ্রাম মহানগর মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন প্রকল্পের জরিপে দেখা গেছে, নগরের ৯৭ শতাংশ সড়কের একাংশ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ৬৪ শতাংশ সড়কে পথচারী পারাপারের উপযুক্ত ব্যবস্থা নেই। ৮৩ শতাংশ সড়কে ফুটপাত থাকলেও তার ৭১ শতাংশই আংশিক বা সম্পূর্ণ দখলে। ৬৮ শতাংশ ফুটপাত হাঁটার অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, নিউমার্কেট ও আগ্রাবাদ এলাকায় ফুটপাত দখলের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। আন্দরকিল্লা থেকে লালদীঘির পাড় পর্যন্ত রাস্তার অংশ ভ্যান ও অস্থায়ী দোকানে ভরপুর। চেরাগী পাহাড় থেকে হেমসেন লেন পর্যন্ত ফুটপাত ফুল ব্যবসায়ীদের দখলে। কর্ণফুলী নতুন ব্রিজ এলাকায় ফল ও শুঁটকির দোকান বসানো হয়। চকবাজার এলাকায় ফুটপাত দখল করে ইট-বালুর ব্যবসা চলছে। পুরোনো রেলস্টেশন, বহদ্দারহাট, চান্দগাঁও, জামালখান মোড়সহ বিভিন্ন এলাকায় একই পরিস্থিতি।
জামালখান মোড়, নবাব সিরাজউদ্দৌলা রোড, মোমিন রোড, তেলিপট্টি রোড, কেবি ফজলুল কাদের রোড ও জেএম সেন অ্যাভিনিউ এলাকায়ও ফুটপাত দখল ব্যাপকভাবে বিস্তৃত। ষোলশহর দুই নম্বর গেট এলাকায় ভ্রাম্যমাণ দোকানের কারণে সড়কের অর্ধেক অংশই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
এদিকে দেওয়ানহাট থেকে আগ্রাবাদ চৌমুহনী পর্যন্ত সড়কে গাড়ির যন্ত্রাংশের দোকানের সামনে সারি সারি যানবাহন পার্ক থাকায় যান চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
চসিকের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট চৈতী সর্ববিদ্যা বলেন, নগরের অবৈধ ফুটপাত দখলমুক্ত রাখতে নিয়মিত অভিযান চালানো হচ্ছে। প্রতি মাসে তাঁর বিভাগ থেকে ১০ থেকে ১৫টি এবং সব মিলিয়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হয়। তিনি বলেন, “আমরা চাই, পথচারীর ফুটপাত পথচারীদের জন্যই থাকুক।”
সানা/আপ্র/৫/৭/২০২৬