প্রায় দুই শত বছর আগে পিরোজপুর জেলার কাউখালীর সোনাকুড়ে শতাধিক পরিবারের মাধ্যমে শুরু হওয়া মৃৎশিল্প এখন বিলুপ্তির পথে। এক সময় এ শিল্প জেলার সদর, মঠবাড়িয়া ও নাজিরপুর এলাকায় ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করলেও বর্তমানে তা সীমিত হয়ে পড়েছে কাউখালীর সোনাকুড়, সদর উপজেলার পালপাড়া, মূলগ্রাম ও রানীপুর এলাকায়।
এক সময় বাঙালির ঐতিহ্য পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে মৃৎশিল্পীরা বছরের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় পার করতেন। মাটির খেলনা, পুতুল, হাঁড়ি-পাতিলসহ বিভিন্ন সামগ্রী তৈরি ও বিক্রিতে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। তবে বর্তমানে সেই চিত্র সম্পূর্ণ বদলে গেছে। পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে খেলনা ও শৌখিন সামগ্রী তৈরি প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এখন শুধুমাত্র দইয়ের হাঁড়ি, সরা এবং কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় তৈজসপত্র তৈরি করা হচ্ছে।
স্থানীয় মৃৎশিল্পীরা জানান, মাটির তৈরি খেলনার চাহিদা কমে যাওয়া এবং প্লাস্টিক পণ্যের ব্যাপক ব্যবহার এই শিল্পকে সংকটে ফেলেছে। পাশাপাশি উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি, শ্রমমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, আধুনিক প্রযুক্তির অভাব এবং সহজ শর্তে ঋণ না পাওয়ায় অনেক পরিবার এই পেশা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছে।
পিরোজপুরের মূলগ্রাম এলাকার বীরেন পাল জানান, এক সময় কয়েকশত পাল পরিবার এই পেশায় যুক্ত ছিল। এখন অধিকাংশই অন্য পেশায় চলে গেছে। পহেলা বৈশাখের সময় যে ব্যস্ততা থাকত, তা এখন আর নেই। প্লাস্টিক পণ্যের কারণে মাটির পণ্যের চাহিদা কমে গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
একই এলাকার অরুণ পাল জানান, আগে বৈশাখী মেলায় বিভিন্ন মাটির পণ্য তৈরি করে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করতে হতো। এখন শুধুমাত্র দইয়ের হাঁড়ি ও কিছু বাসন তৈরি করা হয়। উৎপাদিত পণ্যের যথাযথ দাম না পাওয়ায় অনেকে এ পেশা ছাড়ছেন।
রাণীরপুর এলাকার তপন পাল জানান, খরচ বৃদ্ধি ও বাজার সংকটের কারণে নতুন প্রজন্ম এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। অনেকেই ঋণের বোঝায় জর্জরিত হয়ে পড়েছেন। সরকারি সহযোগিতা পেলে এই শিল্প টিকে থাকতে পারে বলে তিনি মত দেন।
অন্যদিকে, ঝর্ণা রানী নামের এক শ্রমিক জানান, সারাদিন কাজ করেও সামান্য আয় হয়, যা দিয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ঐতিহ্যবাহী এই মৃৎশিল্প রক্ষায় সরকারি প্রণোদনা ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক উদ্যোগ না নেওয়া হলে পিরোজপুরের শতাব্দীপ্রাচীন এই মৃৎশিল্প অচিরেই বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে।
সানা/আপ্র/১৭/৪/২০২৬