একেএম ফজলুল হক: চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়নাধীন মেগা প্রকল্পের প্রায় ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এরপর মার্চ থেকে প্রকল্প হস্তান্তরের প্রক্রিয়া শুরু করে এপ্রিল থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে এর দায়িত্ব তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। শুরুতে প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। পরবর্তী সংশোধনে ব্যয় বেড়ে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা হয়েছে। প্রকল্পের পূর্তকাজ বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড।
প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য ২০১৮ সালের ৯ এপ্রিল চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সমঝোতা চুক্তি হয়। এরপর ২৮ এপ্রিল প্রকল্পের কাজ শুরু করা হয়। প্রকল্পের আওতায় নগরীর ৩৬টি খালসহ পানি নিষ্কাশন অবকাঠামোর পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন করা হচ্ছে।
প্রকল্প পরিচালক বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী বলেন, গত ২৩ সেপ্টেম্বর চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কার্যালয়ে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে করণীয় নির্ধারণে সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মতবিনিময় সভায় তিনি একটি রোডম্যাপ উপস্থাপন করেন। ইতিমধ্যে প্রকল্পের ৯৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। বাকি কাজ শেষ করতে ঠিকাদাররা সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকেই প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছেন। আগামী ১৫ অক্টোবর থেকে তারা নির্মাণকাজ শুরু করবেন।
তিনি বলেন, পরিকল্পনা অনুযায়ী আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারির মধ্যে বাকি কাজ শেষ করা হবে। এরপর ১ মার্চ থেকে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের সঙ্গে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের প্রকল্প হস্তান্তরের কাজ শুরু হবে।
প্রকল্প হস্তান্তরের সময় কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া হবে জানিয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, গত আট বছরে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। সংস্কার করা খালগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে কী ধরনের সমস্যা হয়েছে এবং সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করা হয়েছে, সে বিষয়ে সিটি করপোরেশনকে ধারণা দেওয়া হবে।
তিনি আরো বলেন, প্রকল্পের বিভিন্ন অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, সেগুলোর ব্যবহার, রেগুলেটর কীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত করতে হবে, কখন সেগুলো চালু করতে হবে এবং কীভাবে নিয়মিত পরিদর্শন করতে হবে-এসব বিষয়েও সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্টদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে।
মোহাম্মদ মহসিনুল হক চৌধুরী বলেন, সব প্রক্রিয়া শেষ করে এপ্রিল থেকে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন প্রকল্পটির দায়িত্ব নেবে। রক্ষণাবেক্ষণের কাজে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তা প্রয়োজন হলে এক বছর বা তার বেশি সময়ের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে এখনই বিস্তারিত প্রকল্প পরিকল্পনা প্রস্তুত করে দ্রুত মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন নেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি গ্রহণের বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন সময়ে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পটি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের আগ্রহের কথা জানিয়েছে। তবে পুরো কাজ শেষ হওয়ার পর রক্ষণাবেক্ষণের জন্য প্রকল্পটি গ্রহণ করা হবে।
মেয়র বলেন, সম্প্রতি চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে প্রকল্পের কাজ শেষে সেটি গ্রহণের জন্য সিটি করপোরেশনকে বলা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে চিন্তাভাবনা চলছে। কীভাবে প্রকল্পটি বুঝে নিয়ে ভবিষ্যতে নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকরভাবে কাজ করা যায়, তা নির্ধারণ করা হবে।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের সরকারি তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির আওতায় কর্ণফুলী নদীর সঙ্গে সংযুক্ত ১৬টি খাল এবং এসব খালের সঙ্গে সংযুক্ত আরো ২০টি খালসহ মোট ৩৬টি খালের পুনঃখনন, সম্প্রসারণ ও উন্নয়ন করা হচ্ছে। খালের প্রশস্ততা রক্ষায় সড়ক নির্মাণ, সেতু ও কালভার্ট, জোয়ার নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র, পলি আটকানোর ব্যবস্থা এবং জলাধার নির্মাণও প্রকল্পের আওতায় রয়েছে।
প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর এসব অবকাঠামোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ওপর বর্তাবে। ফলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর রক্ষণাবেক্ষণও নগরবাসীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
সানা/আপ্র/২৮/৯/২০২৬