ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার তদন্ত, ভারতে গ্রেফতার আসামিদের প্রত্যর্পণ এবং পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বহুল আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড। একই সঙ্গে বিচার, খুনিদের দেশে ফিরিয়ে আনা এবং ঘটনার নেপথ্যের দেশি-বিদেশি চক্রান্ত উদ্ঘাটনের দাবিতে নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে ইনকিলাব মঞ্চ।
বুধবার (৩ জুন) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধুর ক্যানটিনের সামনে আয়োজিত জরুরি সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটির সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের জানান, আজ বৃহস্পতিবার (৪ জুন) সন্ধ্যায় শাহবাগে মশালমিছিল এবং আগামীকাল শুক্রবার (৫ জুন) জুমার নামাজের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদ প্রাঙ্গণ থেকে বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হবে। একই দাবিতে দেশের বিভিন্ন স্থানেও কর্মসূচি পালিত হবে।
সংবাদ সম্মেলনে আবদুল্লাহ আল জাবের অভিযোগ করেন, হাদি হত্যার তদন্তে ধারাবাহিকভাবে সময়ক্ষেপণ করা হচ্ছে। একাধিকবার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ পিছিয়েছে, অথচ খুনিদের বিচারের আওতায় আনতে কার্যকর অগ্রগতি দৃশ্যমান নয়। তাঁর দাবি, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের আড়াল করতে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের পরিচয় ও ব্যাখ্যা সামনে আনা হয়েছে।
তিনি বলেন, শুধু রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে শরিফ ওসমান বিন হাদিকে হত্যা করা হয়েছে—এমন ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরো গভীর দেশি-বিদেশি সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে উদ্ঘাটন করা প্রয়োজন।
সংবাদ সম্মেলনে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ইনকিলাব মঞ্চের নেতারা দাবি করেন, ওই বক্তব্য থেকে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। জাবের বলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ঘটনার পেছনে বাংলাদেশের কোনো ব্যক্তি বা সংস্থার সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে, যার পরিচয় প্রকাশ পেলে দেশে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হতে পারে।
তিনি আরো প্রশ্ন তোলেন, হত্যাকাণ্ডের পরপরই সীমান্ত সিল করার কথা থাকলেও কেন তা করা হয়নি। তাঁর ভাষ্য, এ কারণে মূল অভিযুক্তরা দেশত্যাগের সুযোগ পেয়েছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলে তিনি বলেন, একটি বেসরকারি অনুসন্ধানী সংস্থা অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভাব্য খুনিদের পরিচয় প্রকাশ করতে পারলেও রাষ্ট্রীয় সংস্থাগুলো কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেনি।
হত্যাকাণ্ডের নিরপেক্ষ তদন্তের স্বার্থে জাতিসংঘের অধীনে আন্তর্জাতিক তদন্তের দাবিও পুনর্ব্যক্ত করে ইনকিলাব মঞ্চ। পাশাপাশি ভারতে গ্রেফতার আসামিদের দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দিষ্ট সময়সীমা ঘোষণার আহ্বান জানানো হয়।
এদিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে হাদি হত্যা মামলা। কলকাতার ধর্মতলায় মঙ্গলবার এক জনসভায় তিনি দাবি করেন, বাংলাদেশের একটি বহুল আলোচিত হত্যা মামলার আসামিকে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স গ্রেফতার করেছিল এবং বিষয়টি নিয়ে তিনি অনেক তথ্য জানেন। তাঁর বক্তব্যে সরাসরি শরিফ ওসমান বিন হাদির নাম উল্লেখ না থাকলেও বাংলাদেশে আলোচিত এই হত্যাকাণ্ডের প্রসঙ্গই উঠে এসেছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়।
মমতার বক্তব্যের পর তদন্তকারী সংস্থা অপরাধ তদন্ত বিভাগ জানিয়েছে, বক্তব্যটি মামলার তদন্তে কতটা প্রাসঙ্গিক, তা খতিয়ে দেখা হবে। সিআইডির কর্মকর্তারা বলেছেন, তদন্ত এখনো চলমান এবং নতুন কোনো তথ্য সামনে এলে তা গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।
সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, হত্যাকাণ্ডের পর মূল অভিযুক্তরা সীমান্ত পাড়ি দিয়ে মেঘালয় হয়ে কলকাতায় আশ্রয় নেয়। পরে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিশেষ টাস্কফোর্স তাদের গ্রেফতার করে। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, ওই আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যের অনেক অজানা তথ্য উদ্ঘাটন সম্ভব হবে।
তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় অভিযুক্তদের ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় আইনি ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। প্রয়োজনে ভারতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পুনরায় যোগাযোগ করা হবে।
গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-৮ আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন শরিফ ওসমান বিন হাদি। এর অংশ হিসেবে তিনি দীর্ঘদিন ধরে প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন। গত বছরের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট সড়কে মোটরসাইকেল আরোহী দুর্বৃত্তদের গুলিতে আহত হন তিনি। পরে সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার পর পল্টন থানায় দায়ের করা মামলাটি পরে হত্যা মামলায় রূপান্তরিত হয়। চলতি বছরের ৬ জানুয়ারি গোয়েন্দা পুলিশ ১৭ জনকে অভিযুক্ত করে অভিযোগপত্র দাখিল করে। অভিযোগপত্রে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে হত্যাকাণ্ডের কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে মামলার বাদীর আবেদনের পর আদালত অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়ে মামলাটি সিআইডির কাছে হস্তান্তর করেন।
ডিবির অভিযোগপত্রভুক্ত ১৭ আসামির মধ্যে ১১ জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন। বাকি ৬ জন পলাতক। তদন্তে বলা হয়েছে, মূল শ্যুটার ফয়সাল করিম মাসুদ ও তাঁর সহযোগী আলমগীর হোসেন সরাসরি হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন এবং পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ব্যক্তি তাদের পলায়ন ও সীমান্ত অতিক্রমে সহায়তা করেন।
মামলার অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের তারিখ ইতোমধ্যে ১৪ বার পিছিয়েছে। সর্বশেষ নির্ধারিত তারিখ ছিল ১৭ মে। সেদিনও প্রতিবেদন জমা না হওয়ায় আদালত আগামী ৭ জুন নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।
সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন খান জানিয়েছেন, অধিকতর তদন্তে নতুন তথ্যের ভিত্তিতে আরো দুজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ ছাড়া হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলের মালিককেও শনাক্ত করা হয়েছে। তদন্ত প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে দাবি করে তিনি বলেন, মূল আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করা গেলে তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বক্তব্য প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, হাদি হত্যার বিচার নিশ্চিত করতে সরকার আন্তরিকভাবে কাজ করছে। ভারতে গ্রেফতার আসামিদের ফিরিয়ে আনার বিষয়ে স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করছে এবং প্রয়োজনীয় কূটনৈতিক উদ্যোগ অব্যাহত রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ইনকিলাব মঞ্চের প্রকাশনা সম্পাদক ফাহিম মীর, সদস্য হাবিবুল্লাহ মিসবাহসহ সংগঠনের অন্যান্য নেতা-কর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
সানা/আপ্র/৪/৬/২০২৬