মহাকাশ বাণিজ্যে নতুন মাইলফলক স্পর্শ করেছে ভারত। দেশটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের তৈরি রকেট সফলভাবে উৎক্ষেপণের পর কক্ষপথে পৌঁছেছে। এর মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পর বেসরকারি উদ্যোগে কক্ষপথে রকেট পাঠানোর সক্ষমতা অর্জনকারী তৃতীয় দেশে পরিণত হয়েছে ভারত।
শনিবার (১৮ জুলাই) স্থানীয় সময় দুপুর ১২টা ৫ মিনিটে অন্ধ্রপ্রদেশের শ্রীহরিকোটার সতীশ ধাওয়ান মহাকাশ কেন্দ্র থেকে মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্কাইরুট অ্যারোস্পেসের তৈরি রকেট ‘বিক্রম-১’ উৎক্ষেপণ করা হয়। ‘মিশন আগমন’ নামের এই প্রথম কক্ষপথভিত্তিক অভিযানে উৎক্ষেপণের প্রায় ১৬ মিনিট পর রকেটটি ভূপৃষ্ঠ থেকে ৪৫০ কিলোমিটার ওপরে নিম্ন পৃথিবী কক্ষপথে ছয়টি দেশি-বিদেশি উপগ্রহ ও প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম স্থাপন করে।
নেভিগেশন-সংক্রান্ত সতর্কতার কারণে পূর্বনির্ধারিত সময়ের চেয়ে ৩৫ মিনিট দেরিতে রকেটটির উৎক্ষেপণ করা হয়। সফল উৎক্ষেপণের পর স্কাইরুট এক বিবৃতিতে জানায়, এটি ছিল পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন। নিয়মিত বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ শুরু করার আগে আরো কয়েকটি পরীক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করা হবে।
প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এই অভিযানের মূল লক্ষ্য ছিল রকেটটির জ্বালানি ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, তথ্য আদান-প্রদান, দিকনির্দেশনা, নেভিগেশন ও নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তির কার্যকারিতা যাচাই করা এবং ভবিষ্যতের বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণের জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ করা।
হায়দরাবাদভিত্তিক স্কাইরুট অ্যারোস্পেস প্রতিষ্ঠিত হয় ২০১৮ সালে। ২০২০ সালে ভারত সরকার মহাকাশ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগের সুযোগ উন্মুক্ত করার পর প্রতিষ্ঠানটি দ্রুত বিকশিত হয়। চলতি বছর কোম্পানিটির বাজারমূল্য এক বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
স্কাইরুটের সহপ্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পবন কুমার চন্দনা বলেন, তারা এমন একটি সক্ষমতা তৈরি করতে চান, যাতে মহাকাশে উপগ্রহ পাঠানো ট্যাক্সি সেবার মতো সহজ হয়ে যায়। বর্তমানে অনেক সময় বড় রকেটের উৎক্ষেপণ সূচির জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু ছোট উপগ্রহ উৎক্ষেপণের ক্ষেত্রে স্কাইরুটের সেবা গ্রাহকদের প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট কক্ষপথে উপগ্রহ স্থাপনের সুযোগ তৈরি করবে।
‘বিক্রম-১’ রকেটটির নামকরণ করা হয়েছে ভারতের মহাকাশ কর্মসূচির জনক বিক্রম সারাভাইয়ের নামে। প্রায় ২২ মিটার উচ্চতার এই রকেটের উপগ্রহ বহনের সক্ষমতা ৩৫০ কেজি। সম্পূর্ণ কার্বন যৌগিক কাঠামোয় তৈরি রকেটটিতে ব্যবহার করা হয়েছে ত্রিমাত্রিক মুদ্রণ প্রযুক্তিতে তৈরি তরল ইঞ্জিন। প্রচলিত রকেট-গ্রেড ইস্পাতের তুলনায় এটি হালকা ও শক্তিশালী বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
এই অভিযানে মহাকাশের বর্জ্য অপসারণে ব্যবহারের সম্ভাব্য যান্ত্রিক হাত, পৃথিবী পর্যবেক্ষণ ক্যামেরা এবং জার্মানির একটি উপগ্রহসহ মোট ছয়টি প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম বহন করা হয়। পাশাপাশি প্রতীকী কিছু উপাদানও পাঠানো হয়েছে মহাকাশে। এর মধ্যে ছিল গবেষণাগারে তৈরি হীরার পদ্মফুল ‘কসমিক ব্লুম’ এবং একটি ক্ষুদ্র সোনার রকেটের ভেতরে ভারতের তিন বিশিষ্ট বিজ্ঞানী চন্দ্রশেখর ভেঙ্কট রমন, এ পি জে আবদুল কালাম ও বিক্রম সারাভাইয়ের চালের দানার চেয়েও ছোট ভাস্কর্য। রকেটটিতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির ‘বন্দে মাতরম’ লেখা একটি বার্তাও ছিল।
এর আগে ২০২২ সালে স্কাইরুট ‘বিক্রম-এস’ নামের একটি উপকক্ষপথীয় রকেটের সফল পরীক্ষা চালিয়েছিল।
দীর্ঘদিন ভারতের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা এককভাবে দেশটির মহাকাশ কার্যক্রম পরিচালনা করলেও ২০২০ সালের পর বেসরকারি খাতের জন্য এই খাত উন্মুক্ত করা হয়। এরপর দেশটিতে চার শতাধিক মহাকাশভিত্তিক নতুন প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।
ভারত সরকারের লক্ষ্য, ২০৩৩ সালের মধ্যে বৈশ্বিক মহাকাশ অর্থনীতিতে ভারতের অংশীদারত্ব বর্তমানের ৮ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৪৪ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।
স্কাইরুটের এই সাফল্যকে ভারতের মহাকাশ আকাঙ্ক্ষার নতুন দিগন্ত হিসেবে উল্লেখ করে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, আগামী বছর থেকে নিয়মিত বাণিজ্যিক উৎক্ষেপণ শুরু করার আগে চলতি বছর আরো একটি পরীক্ষামূলক অভিযান পরিচালনা করা হবে। হায়দরাবাদের কারখানায় প্রতি মাসে একটি করে রকেট তৈরির সক্ষমতা রয়েছে বলেও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি, এনডিটিভি
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৮/৭/২০২৬