মহাবিশ্বে ভিনগ্রহে প্রাণের সন্ধানের গবেষণায় নতুন মাইলফলক তৈরি করেছেন বিজ্ঞানীরা। প্রথমবারের মতো সৌরজগতের বাইরে একটি পাথুরে ও সম্ভাব্য বাসযোগ্য গ্রহে বায়ুমণ্ডলের অস্তিত্বের প্রমাণ পেয়েছেন তারা।
বিজ্ঞানীদের মতে, ‘এলএইচএস ১১৪০ বি’ নামের এই গ্রহটি এর নক্ষত্রের এমন একটি অঞ্চলে অবস্থান করছে, যাকে ‘বাসযোগ্য অঞ্চল’ বলা হয়। অর্থাৎ অঞ্চলটি খুব বেশি গরম নয়, আবার অতিরিক্ত ঠান্ডাও নয়। ফলে সেখানে তরল পানি এবং প্রাণের বিকাশের উপযোগী পরিবেশ থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রায় এক দশক আগে আবিষ্কৃত এই গ্রহটির গঠন পৃথিবীর সঙ্গে অনেকটা মিল রয়েছে বলে আগেই জানা গিয়েছিল। আকারে পৃথিবীর চেয়ে বড় হলেও এর বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য পাথুরে গ্রহের মতো। তবে এতদিন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল, গ্রহটির নিজস্ব কোনো বায়ুমণ্ডল রয়েছে কি না।
নতুন গবেষণায় সেই প্রশ্নের গুরুত্বপূর্ণ উত্তর মিলেছে। গবেষকরা জানিয়েছেন, গ্রহটির বায়ুমণ্ডল থেকে হিলিয়াম গ্যাস মহাকাশে বেরিয়ে আসছে, যা প্রমাণ করে সেখানে বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতি রয়েছে।
গবেষণাটির নেতৃত্ব দেওয়া হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী কলিন চেরুবিন বলেন, “আমরা যেভাবে জীবনকে চিনি, কোনো গ্রহে প্রাণের বিকাশের জন্য বায়ুমণ্ডল থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্য কোনো নক্ষত্রের বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা পাথুরে গ্রহে বায়ুমণ্ডল খুঁজে পাওয়ার ঘটনা এটাই প্রথম।”
গবেষকরা প্রথমে একটি তাত্ত্বিক মডেলের মাধ্যমে ধারণা করেন, ‘এলএইচএস ১১৪০ বি’ গ্রহের বায়ুমণ্ডলের উপরের স্তরে হিলিয়াম থাকতে পারে। ওই হিলিয়াম ধীরে ধীরে মহাকাশে ছড়িয়ে পড়ছে, যা অনুসন্ধানের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র তৈরি করে।
এই ধারণা যাচাই করতে গবেষকরা চিলির ম্যাজেলান মানমন্দিরে স্থাপিত একটি বিশেষ বর্ণালিবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করে গ্রহটি পর্যবেক্ষণ করেন। পর্যবেক্ষণে তারা গ্রহটি থেকে হিলিয়াম গ্যাস নির্গমনের স্পষ্ট প্রমাণ পান।
গবেষণার অন্যতম সদস্য হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেয়াস ভিসাপ্রাগাদা বলেন, বাসযোগ্য অঞ্চলে থাকা কোনো বহির্গ্রহে বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতির এটাই সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ। গ্রহটির আলোর বর্ণালী বিশ্লেষণ করতে গিয়ে গবেষকরা এর গুরুত্ব উপলব্ধি করেন।
দীর্ঘদিন ধরে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর মতো ছোট ও পাথুরে গ্রহে বায়ুমণ্ডলের সন্ধান করে আসছিলেন। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা সফল হয়নি। এবার গবেষকরা প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে ভিন্ন কৌশল ব্যবহার করেছেন।
সাধারণত কোনো গ্রহ তার নক্ষত্রের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় আলোর পরিবর্তন বিশ্লেষণ করে বায়ুমণ্ডলের উপস্থিতি শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু এবার বিজ্ঞানীরা গ্রহটির ওপরের স্তরের বায়ুমণ্ডল থেকে মহাকাশে বেরিয়ে যাওয়া হিলিয়াম গ্যাস শনাক্ত করেছেন।
তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, গ্রহটির বায়ুমণ্ডল স্থায়ী কি না এবং এতে কী কী উপাদান রয়েছে, তা জানতে আরো গবেষণা প্রয়োজন। এ কাজে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ সংস্থার জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্র ব্যবহার করা হবে।
এই গ্রহের আবিষ্কারক দলের সদস্য জেসন ডিটম্যান বলেন, হিলিয়াম গ্যাসের উপস্থিতি নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। এটি কি কেবল একটি শুষ্ক পাথুরে গ্রহ, যেখান থেকে গ্যাস দ্রুত মহাকাশে হারিয়ে যাচ্ছে, নাকি পৃথিবীর মতো একটি স্থায়ী বায়ুমণ্ডল রয়েছে-তা এখন খুঁজে দেখা হবে। তিনি জানান, আগামী চার থেকে পাঁচ বছরে জেমস ওয়েব মহাকাশ দূরবীক্ষণ যন্ত্রের তথ্যের মাধ্যমে গ্রহটির বায়ুমণ্ডলে পানির উপস্থিতি অনুসন্ধান করা হবে। সেখানে পানি পাওয়া গেলে ধারণা করা যাবে, গ্রহটির বায়ুমণ্ডল দীর্ঘস্থায়ী।
‘হিলিয়াম এস্কেপিং ফ্রম দ্য অ্যাটমোসফিয়ার অফ এ নিয়ারবাই রকি এক্সোপ্ল্যানেট অরবিটিং ইন এ হ্যাবিটেবল জোন’ শিরোনামে গবেষণাটি বিজ্ঞান সাময়িকী ‘সায়েন্স’-এ প্রকাশিত হয়েছে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/১৮/৭/২০২৬