দুই শতাধিক আন্তর্জাতিক ম্যাচ, ১২৫টি গোল, অসংখ্য রেকর্ড আর প্রায় দুই দশকের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। তবু একটি অভিজ্ঞতা এতদিন অধরাই ছিল লিওনেল মেসির-ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মাঠে নামা। অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান হতে যাচ্ছে। বিশ্বকাপের সেমি-ফাইনালে বুধবার আটলান্টায় প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হবেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক।
কোয়ার্টার-ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে অতিরিক্ত সময়ে ৩-১ গোলে হারিয়ে টানা দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপের শেষ চারে উঠেছে আর্জেন্টিনা। সেই জয়ের মধ্য দিয়েই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে মেসির বহুল প্রতীক্ষিত প্রথম ম্যাচের মঞ্চ তৈরি হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে গোল করতে না পারায় চলতি বিশ্বকাপে টানা নয় ম্যাচে গোল করার অসাধারণ ধারার ইতি ঘটে মেসির। তবে আট গোল নিয়ে তিনি এখনো ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে যৌথভাবে আসরের সর্বোচ্চ গোলদাতা। একই সঙ্গে ২১ গোল নিয়ে বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনও ধরে রেখেছেন ৩৯ বছর বয়সী এই ফরোয়ার্ড।
মেসিকে থামানো প্রায় অসম্ভব
ইংল্যান্ডের সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষক মিকা রিচার্ডসের মতে, আর্জেন্টিনাকে হারানো সম্ভব হলেও মেসিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা সবচেয়ে কঠিন কাজ।
তিনি বলেন, “আর্জেন্টিনাকে হারানো সম্ভব, কিন্তু তাদের দলে আছে সেই ছোট্ট জাদুকর মেসি। পুরো দলই তাকে ঘিরে খেলে। তাকে মার্ক করা প্রায় অসম্ভব। কারণ তিনি কখন কোথায় চলে যাবেন, তা অনুমান করা কঠিন। ছোট ছোট জায়গা খুঁজে নেওয়া, সঠিক সময়ে নিজেকে কার্যকর করে তোলা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় তিনি অনন্য।”
রিচার্ডস আরো বলেন, মেসির মধ্যে যে অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও মানসিক দৃঢ়তা রয়েছে, তার কিছুটা প্রতিফলন দেখা যায় ইংল্যান্ডের মিডফিল্ডার জুড বেলিংহ্যামের মধ্যেও। তবে মেসির ক্যারিশমা একেবারেই অন্য মাত্রার।
ইংল্যান্ডের সুযোগও দেখছেন বিশ্লেষকরা
সাবেক ইংল্যান্ড ফরোয়ার্ড ক্রিস সাটনের মতে, বর্তমান আর্জেন্টিনা অতীতের মতো অপ্রতিরোধ্য না হলেও তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো যেকোনো পরিস্থিতিতে জয়ের পথ বের করে নেওয়া।
তিনি বলেন, “আমার মনে হয়, টমাস টুখেল ও ইংল্যান্ডের খেলোয়াড়রা এই আর্জেন্টিনার বিপক্ষে খেলতে আগ্রহী থাকবে। এটি হয়তো তাদের সেরা আর্জেন্টিনা নয়, কিন্তু ম্যাচ জয়ের অভ্যাস তাদের বড় শক্তি।”
ইংল্যান্ডের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার ওয়েইন রুনির মতে, মেসি রক্ষণে খুব বেশি অবদান না রাখলেও গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে একাই ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন।
রুনি বলেন, “মেসির সবচেয়ে বড় শক্তি তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। খেলার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সে জীবন্ত হয়ে ওঠে এবং ঠিক সিদ্ধান্তটাই নেয়। তাকে সামলাতে হলে পুরো রক্ষণভাগকে একাগ্র ও সমন্বিত থাকতে হবে।”
দুই দেশের ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা
দক্ষিণ আমেরিকান ফুটবল বিশ্লেষক টিম ভিকেরির মতে, এই সেমি-ফাইনাল আর্জেন্টিনার জন্য বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
তার ভাষায়, “আর্জেন্টিনার সমর্থকদের সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী ইংল্যান্ড। তাই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে না খেলেই মেসির আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার শেষ হওয়া ঠিক হতো না।”
বিশ্বকাপে ইংল্যান্ড ও আর্জেন্টিনার লড়াই মানেই ইতিহাসের নানা নাটকীয় মুহূর্ত। ১৯৮৬ সালের কোয়ার্টার-ফাইনালে দিয়েগো মারাদোনার বিতর্কিত ‘ঈশ্বরের হাত’ গোল এবং একই ম্যাচে তার অবিশ্বাস্য একক নৈপুণ্যের গোল ফুটবল ইতিহাসের অংশ হয়ে আছে। ১৯৯৮ সালের বিশ্বকাপে ডেভিড বেকহ্যামের লাল কার্ডও দুই দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে আরো উসকে দেয়।
সব ধরনের প্রতিযোগিতা মিলিয়ে প্রায় ২১ বছর পর আবার মুখোমুখি হচ্ছে দুই দল।
সব দলের বিপক্ষেই গোল, ব্যতিক্রম শুধু একটি
আর্জেন্টিনার সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা মেসির আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানও ঈর্ষণীয়। বলিভিয়ার বিপক্ষে ১২ ম্যাচে ১১ গোল তার সর্বোচ্চ সাফল্য। ভেনেজুয়েলা ও একুয়েডরের বিপক্ষে করেছেন সাতটি করে গোল। ব্রাজিলের বিপক্ষে পাঁচটি এবং উরুগুয়ের বিপক্ষে ছয়টি গোল রয়েছে তার।
ইউরোপীয় প্রতিপক্ষদের মধ্যে ফ্রান্স, ক্রোয়েশিয়া ও সুইজারল্যান্ডের বিপক্ষে করেছেন তিনটি করে গোল। ফ্রান্সের বিপক্ষে তিন ম্যাচে তিন গোলের মধ্যে দুটি ছিল ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে।
আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে একাধিকবার মুখোমুখি হওয়া দলগুলোর মধ্যে কেবল কাতারের বিপক্ষেই এখনো গোলের দেখা পাননি মেসি।
এবার ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করতে যাচ্ছেন বিশ্ব ফুটবলের এই মহাতারকা। তাঁর সামনে সুযোগ, দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের আরেকটি অপূর্ণতা পূরণ করার।
সানা/আপ্র/১৪/৭/২০২৬