দ্বিতীয় দিন শেষে বাংলাদেশের অবস্থান যেমন হওয়ার কথা ছিল, তেমন হলো না। এর কারণ- শুরুতেই ব্যাটারদের আত্মাহুতি এবং পরে বোলারদের সুযোগ তৈরি করতে না পারা।
সবমিলিয়ে দ্বিতীয় দিনে হতাশার ছবি লুকিয়ে আছে ব্যাটিং ও বোলিং দুই বিভাগেই। একটানা ভুল, দায়িত্বহীনতা আর আত্মবিশ্বাসের অভাবে দ্বিতীয় দিনটা গেল হতাশা মোড়ানো।
প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশর করা ৪১৩ রানের জবাবে পাকিস্তান ১ উইকেট হারিয়ে সংগ্রহ করেছে ১৭৯ রান।
আগের দিন বাংলাদেশ দাপট দেখালেও ঢাকা টেস্টের দ্বিতীয় দিনের পুরো নিয়ন্ত্রণ রেখেছে সফরকারী পাকিস্তান। ২৩৪ রান পিছিয়ে থেকে রোববার তৃতীয় দিনের খেলা শুরু হবে।
ক্রিজে অপরাজিত আছেন দুই অভিষিক্ত ব্যাটার আজান আওয়াইজ ও আব্দুল্লাহ ফজল। আজান ৮৪ রান নিয়ে আছেন সেঞ্চুরির অপেক্ষায়। অন্যদিকে ফজল ৩৫ রান নিয়ে অপরাজিত আছেন।
সকালের নরম আলোয় মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে দ্বিতীয় দিনটিও নিজেদের করে নেওয়ার সুযোগ ছিল বাংলাদেশের সামনে। আগের দিন ৪ উইকেটে ৩০১ রান করা বাংলাদেশের সামনে সুযোগ ছিল ৫০০ রানের বড় সংগ্রহ গড়ে পাকিস্তানকে চাপে ফেলে দেওয়ার।
কিন্তু লিটন দাস ও মেহেদী হাসান মিরাজের কিছুটা অসচেতন ব্যাটিংয়ে সেই সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়। এরপর বোলারদের পরিকল্পনাহীন বোলিংয়ে পুরো দিনটিই হতাশায় কাটে বাংলাদেশের। নতুন দিনে মুশফিক ও লিটন ব্যাটিংয়ে নামেন। আগের দিন ৪৮ রানে অপরাজিত থাকা মুশফিক সেঞ্চুরি করে জন্মদিন রাঙাবেন; এমনটাই প্রত্যাশা ছিল ভক্তদের। সেভাবেই শুরু করেছিলেন তিনি। তবে অযাচিত শটে সেঞ্চুরি বঞ্চিত হন মুশফিক। দিনের শুরুতেই অবশ্য লিটনকে হারায় বাংলাদেশ।
মুশফিককে সঙ্গ দিয়ে ইতিবাচক ব্যাটিং করছিলেন লিটন। তবে ৯৭তম ওভারে আব্বাসের ডেলিভারিতে ভুল করেন তিনি। টাইমিং ঠিক না হওয়ায় বদলি ফিল্ডার আমাদ বাটের হাতে ধরা পড়েন।
আউট হওয়ার আগে ৬৭ বলে ৩৩ রান করেন লিটন। মুশফিকের সঙ্গে গড়েন ৬২ রানের জুটি। দারুণ সম্ভাবনাময় ইনিংসের সমাপ্তি হলেও লিটন গড়েছেন একটি কীর্তি। আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে বাংলাদেশের প্রথম ব্যাটার হিসেবে ২ হাজার রানের মাইলফলক ছুঁয়েছেন এই উইকেটকিপার ব্যাটার।
লিটনের পর তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে আছেন মুশফিকুর রহিম। পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে ৭১ রান করেছেন তিনি। টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপে তার মোট রান ১ হাজার ৮৭৬।
লিটনের বিদায়ের পর দ্রুত রান বাড়ানোর চেষ্টা করেন মেহেদী হাসান মিরাজ। ১০১তম ওভারে আব্বাসকে দারুণ এক ছক্কা মারেন তিনি। তবে পরের বলেই অফ স্টাম্পের বাইরের বলে ক্যাচ দেন মিরাজ। ১২ বলে ১০ রান করেই থামে তার ইনিংস।
মিরাজের বিদায়ের পর ব্যাট হাতে পাঠানো হয় তাইজুল ইসলামকে। পেসার এবাদত হোসেনের আগে তাকে নামানোর সিদ্ধান্তে কিছুটা চমক ছিল। তবে শুরুতে আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছিল বাঁহাতি এই স্পিনারকে। হাসান আলির এক ওভারে টানা দুই চার মেরে দ্রুত রানও তোলেন তিনি।
কিন্তু ১০৭তম ওভারে আবারও সাফল্য পান আব্বাস। এবার বল জমা পড়ে উইকেটকিপার মোহাম্মদ রিজওয়ানের গ্লাভসে। ২৩ বলে ১৭ রান করে ফেরেন তাইজুল। তার বিদায়ে ৭ উইকেট হারায় বাংলাদেশ। এদিকে ১১৪ বলে ফিফটি স্পর্শ করা মুশফিক ইনিংস বড় করার চেষ্টা করেন। লাঞ্চ বিরতিতে যাওয়ার সময় বাংলাদেশের সংগ্রহ ছিল ৭ উইকেটে ৩৮০ রান। ১৭৬ বলে ৭১ রানে অপরাজিত ছিলেন মুশফিক।
অন্য প্রান্তে ছিলেন এবাদত হোসেন। তখনও আশা ছিল মুশফিককে ঘিরে। কিন্তু বিরতির পর ১১০তম ওভারেই বড় ধাক্কা দেয় পাকিস্তান। শাহিন শাহ আফ্রিদির অফ স্টাম্পের বাইরের বল খেলতে গিয়ে ভুল করেন বাংলাদেশের অভিজ্ঞ ব্যাটার।
১৭৯ বল মোকাবিলা করে ৮ চারে ৭১ রানেই থামতে হয় তাকে। উইকেটকিপার ব্যাটারদের জন্মদিন ছিল এদিন। সেঞ্চুরি করতে পারলে জন্মদিনটা আরও বিশেষ হতে পারত। যদিও দিনের খেলা শেষে সতীর্থরা ড্রেসিংরুমের সামনে কেক কেটে তার ৩৯তম জন্মদিন উদযাপন করেন।
মুশফিক ফেরার পর তাসকিন আহমেদের সঙ্গে ক্রিজে আসেন ইবাদত হোসেন। তবে লাঞ্চের পর দ্বিতীয় ওভারেই আবারও আঘাত হানেন আব্বাস। উইকেটের পেছনে ইবাদতের সহজ ক্যাচ নেন মোহাম্মদ রিজওয়ান। ১০ বল খেলেও রান করতে পারেননি ইবাদত। এই উইকেটের মাধ্যমে ইনিংসে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন আব্বাস।
শেষ উইকেট জুটি বাংলাদেশকে ৪০০ রান পার করায়। তাসকিন মাঠে নেমেই ঝলক দেখাতে থাকেন। ১৯ বলে তার ব্যাট থেকে আসে ২৮ রান, যেখানে ছিল ৩টি চার ও একটি ছক্কা। যদিও শাহিনের বলে উইকেট হারিয়ে ফিরতে হয় তাকে।
বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস থামে ৪১৩ রানে। বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ভুগিয়েছেন পাকিস্তানের মিডিয়াম পেসার আব্বাস। তার বোলিং তাণ্ডবেই মূলত বাংলাদেশের ৫০০ রানের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়।
৯২ রান খরচায় ৫ উইকেট নেন তিনি। অন্যদিকে শাহিন ১১৩ রান দিয়ে নেন ৩টি উইকেট। একটি করে উইকেট নেন হাসান আলি ও নোমান আলি।
বাংলাদেশকে ৪১৩ রানে থামিয়ে ব্যাটিংয়ে নামে পাকিস্তান। দুই ওপেনার ইমাম-উল-হক ও আজান আওয়াইজ দারুণ শুরু করেন। ৩৩টি প্রথম শ্রেণির ম্যাচ খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে ঢাকা টেস্টে অভিষেক হয় আজানের।
প্রস্তুতি নিয়েই যে টেস্ট খেলতে নেমেছেন, সেটাই যেন বুঝিয়ে দেন তিনি। ইমামের সঙ্গে উদ্বোধনী জুটিতে যোগ করেন ১০৬ রান। ইমাম ৪৫ রানে আউট হলে আরেক অভিষিক্ত আব্দুল্লাহ ফজলকে সঙ্গে নিয়ে দিনের বাকি সময়টা অনায়াসেই পার করে দেয় পাকিস্তান।
দ্বিতীয় দিন শেষে ১ উইকেট হারিয়ে তাদের সংগ্রহ ১৭৯ রান। যেভাবে ব্যাটিং করেছে সফরকারীরা, তাতে তৃতীয় দিন শেষে বড় সংগ্রহ গড়ার পথেই এগোচ্ছে তারা। বাংলাদেশের নাহিদ রানা, তাসকিন আহমেদ ও ইবাদত হোসেন কেউই পাকিস্তানের ব্যাটারদের মনে ত্রাস ছড়াতে পারেননি।
মেহেদী ও তাইজুলও খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারেননি। একমাত্র উইকেটটি নিয়েছেন মিরাজ। এখন অপেক্ষা তৃতীয় দিনে বাংলাদেশের বোলাররা নিজেদের ছন্দে ফিরতে পারেন কি না।
শনিবারের এলোমেলো বোলিং শুধরে ফিরতে না পারলে পাকিস্তানকে থামানো কঠিন হবে। যে স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন পেসাররা, ঢাকা টেস্টের দ্বিতীয় দিনে সেই স্বপ্ন অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। যদিও বাংলাদেশের বোলারদের এখনও সুযোগ আছে নতুন দিনে ঘুরে দাঁড়ানোর।
ডিসি/আপ্র/০৯/০৫/২০২৬