নাহিদ রানা বল হাতে ছুটছেন, চারপাশ প্রকম্পিত তখন ‘নাহিদৃনাহিদ’ চিৎকারে। গ্যালারিতে দর্শক মেরেকটে হাজার দুয়েক। কিন্তু তাদের কণ্ঠের জোর গগণবিদারী। এমনিতেই তেতে থাকা নাহিদ তখণ আরো উজ্জীবিত হয়ে নিজের সবটুকু ঢেলে দিলেন প্রতিটি ডেলিভারিতে। প্রতিটি বলই যেন একটি ইভেন্ট, প্রতিটি মুহূর্তই একেকটি জীবন! টেস্টের পঞ্চম দিন বিকেলে গতি, বাউন্স আর রিভার্স সুইংয়ের মিশেলে রচনা করলেন তিনি ফাস্ট বোলিংয়ের মহাকাব্য।
নাহিদ রানার বারুদের সঙ্গে তাসকিন আহমেদ, তাইজুল ইসলামদের ছোবলে ধ্বংস হয়ে গেল পাকিস্তানের ব্যাটিং লাইন আপ। মিরপুর টেস্টের শেষ দিনে অসাধারণ বোলিংয়ের প্রদর্শনীতে ১০৪ রানের জয়ে সিরিজে এগিয়ে গেল বাংলাদেশ।
২০২৪ সালে পাকিস্তানে গিয়ে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জিতে এলেও দেশের মাঠে তাদের বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয় এটিই। প্রথম চার দিনের দুই দিন বৃষ্টিতে খেলা অনেকটা সময় বন্ধ থাকায় শেষ দিনে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ শুধু পাকিস্তানই ছিল না, সময়ও ছিল বড় বাধা। কিন্তু প্রকৃতি আর সময়কে হারিয়ে, পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে নাজমুল হোসেন শান্তর দল আদায় করে নিলো দারুণ এক জয়।
শেষ দিনে মঙ্গলবার (১২ মে) প্রথম সেশনে যখন ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ, ম্যাচের বাকি ছিল ৭৬ ওভার। আলোকস্বল্পতার কারণে নিশ্চিতভাবেই সবগুলো ওভার পাওয়া যেতই না। কিন্তু শেষ বিকেলে নাহিদ রানার বিধ্বংসী এক স্পেলে বাংলাদেশ ম্যাচ শেষ করে দেয় ২৩.১ ওভার বাকি রেখেই।
২৬৮ রানের লক্ষ্যে ছুটে পাকিস্তানের ইনিংস শেষ ১৬৩ রানে। দুই বছর আগে পাকিস্তানের মাঠে টেস্ট সিরিজেই বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের আগমনী বার্তা দিয়েছিলেন নাহিদ রানা। এবার দেখালেন, সময় তাকে করে তুলেছে কতটা ক্ষুরধার। ক্যারিয়ার-সেরা বোলিংয়ে তার প্রাপ্তি ৪০ রানে ৫ উইকেট।
অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি, টেস্ট ক্রিকেটে ২৬ বছরের পথচলায় প্রথমবার চতুর্থ ইনিংসে ৫ উইকেট নিতে পারলেন বাংলাদেশের কোনো পেসার।
নাহিদের গোলায় পাকিস্তানের শেষ ৫ উইকেটের পতন হয় ১১ রানে।
সকালে ৩ উইকেটে ১৫২ রান নিয়ে ব্যাটিংয়ে নামে বাংলাদেশ। ১৬ রানে অপরাজিত থাকা মুশফিকুর রহিম মিড অফে ক্যাচ দেন আর ৬ রান যোগ করেই। শাহিন শাহ আফ্রিদির শর্ট বলে ছক্কার চেষ্টায় সীমানায় ধরা পড়েন লিটন কুমার দাস (২৮ বলে ১১)।
৫৮ রানে দিন শুরু করা নাজমুল হোসেন শান্ত এগিয়ে যাচ্ছিলেন ম্যাচে দ্বিতীয় শতরানের দিকে। আগেও দুই দফায় এক ম্যাচে জোড়া সেঞ্চুরি করা ব্যাটসম্যান এবার শেষ পর্যন্ত পারেননি একটুর জন্য। দ্রুত রান তোলার চেষ্টায় নোমান আলিকে সুইপ, রিভার্স সুইপ খেলছিলেন তিনি। সেই চেষ্টাতেই ৮৭ রানে এলবিডব্লিউ হয়ে যান রিভার্স সুইপ খেলতে গিয়ে।
সেই সময় দ্রুত রানের দাবি কিছুটা মেটান মেহেদী হাসান মিরাজ। তিন চার ও এক ছক্কায় ২৪ রান করেন তিনি। দশে নেমে একটি ছক্কা ও চার মারেন তাসকিন আহমেদ। লাঞ্চের আগে ইনিংস ঘোষণা করে বাংলাদেশ।
যে উদ্দেশ্য নিয়ে সেই ইনিংস ঘোষণা, তা পূরণ হয়েও যায়। লাঞ্চের আগেই ধরা দেয় উইকেট। প্রথম ওভারেই তাসকিন আহমেদ ফেরান ইমাম-উল-হাককে।
প্রথম ইনিংসে শতরানের জুটি গড়া দুই অভিষিক্ত আজান আওয়াইস ও আব্দুল্লাহ ফাজাল আবার প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তবে জুটি এবার ৫৪ রানে থামান মিরাজ। প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান আজান বোল্ড হয়ে যান ১৫ রান করে।
আগের ইনিংসে ফিফটি করা ফাজাল দ্বিতীয় ইনিংসে ছিলেন আরো সাবলিল। অভিষেকে দ্বিতীয় ফিফটি করে ফেলেন তিনি ১০টি চার মেরে। সালমান আলি আগার সঙ্গে তার জুটি বাংলাদেশকে হতাশায় রাখে অনেকটা সময়।
শেষ সেশনে বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল ৭ উইকেটের, পাকিস্তানের জয়ের সমীকরণ তখন ৪৫ ওভারে ১৫২। চা-বিরতির পর প্রথম ওভারেই আসে কাঙ্ক্ষিত ব্রেক থ্রু। তাইজুল ইসলামের দারুণ ফ্লাইট ও তীক্ষ্ণ টার্ন করা ধ্রুপদি ডেলিভারি ফাজালকে থামায় ৬৬ রানে। পরের ওভারে তাসকিন যখন ফেরালেন সালমানকে (৩৯ বলে ২৬), মিরপুরের বাতাসেও তখন যেন জয়ের আভা ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
পরের ব্যাটসম্যান মোহাম্মাদ রিজওয়ানকে প্রথম বলে এলবিডব্লিউ করে উল্লাসে মেতে ওঠেন তাসকিন। কিন্তু রিভিউয়ে দেখা যায়, অনেকটা ভেতরে ঢোকা ডেলিভারিতে বল চলে যাচ্ছিল স্টাম্পের বাইরে। এরপর ‘ইশ-উশ’ মুহূর্ত আসে বেশ কয়েকবার, সাউদ শাকিল একবার সামান্য একটুর জন্য বেঁচে যান ইম্প্যাক্ট আম্পায়ার্স কল হওয়ায়। তবে খুব বেশি সময় হাহুতাশ করতে হয়নি দলকে।
নাহিদ রানার অফ স্টাম্পের বাইরে পিচ করে আরো বেরিয়ে যাওয়া ডেলিভারিতে আলগা শটে উইকেট হারান শাকিল। ব্যস, শেষের দুয়ার খুলে যায় পাকিস্তানের।
নাহিদেরই ১৪৭.২ কিলোমিটার গতির অসাধারণ রিভার্স সুইঙ্গিং ডেলিভারির কিছুই বুঝতে না পেরে ছেড়ে দিয়ে বোল্ড হন মোহাম্মাদ রিজওয়ান। বাংলাদেশের তরুণ ফাস্ট বোলারের গতিতে পরাস্ত হন নোমান আলিও।
মাঝে হাসান আলিকে বিদায় করেন তাইজুল। ম্যাচের শৈষটা তো নাহিদের হাত ধরেই হতে হতো! বাউন্সারে শাহিন শাহ আফ্রিদিকে ফিরিয়ে ৫ উইকেট পূর্ণ করার পাশাপাশি জয় নিশ্চিত করে হুঙ্কার ছোড়েন নাহিদ। ধ্রুপদি এক জয়ের স্বাক্ষী হওয়ার তৃপ্তি নিয়ে মাঠ ছাড়েন দর্শকেরা।
সংক্ষিপ্ত স্কোর:
বাংলাদেশ ১ম ইনিংস: ৪১৩
পাকিস্তান ১ম ইনিংস: ৩৮৬
বাংলাদেশ ২য় ইনিংস: ৭০.৩ ওভারে ২৪০/৯ ডি. (আগের দিন ১৫২/৩) (শান্ত ৮৭, মুশফিক ২২, লিটন ১১, মিরাজ ২৪, তাইজুল ৩, তাসকিন ১১, ইবাদত ৪*; আফ্রিদি ১৬-২-৫৪-২, আব্বাস ১৪-৩-৩৫-১, হাসান ১৭.৩-২-৫২-৩, সালমান ৫-০-১৮-০, হাসান ১৮-১-৭৬-৩)।
পাকিস্তান ২য় ইনিংস: (লক্ষ্য ২৬৮ রান) ৫২.৫ ওভারে ১৬৩ (আজান ১৫, ইমাম ২, ফাজাল ৬৬, মাসুদ ২, সালমান ২৬, শাকিল ১৫, রিজওয়ান ১৫, নোমান ৪, হাসান ১, আফ্রিদি ০, আব্বাস *; তাসকিন ১০-১-৪০-২, মিরাজ ১৭-৩-৪৭-১, নাহিদ ৯.৫-২-৪০-৫, ইবাদত ২-০-৯-০, তাইজুল ১৪-৩-২২-২)
ফল: বাংলাদেশ ১০৪ রানে জয়ী।
সিরিজ: দুই ম্যাচ সিরিজে বাংলাদেশ ১-০তে এগিয়ে।
ম্যান অব দা ম্যাচ: নাজমুল হোসেন শান্ত।
সানা/এসি/আপ্র/১২/০৫/২০২৬