আজ ১২ আগস্ট বিশ্ব হাতি দিবস। বিশ্বজুড়ে হাতি সংরক্ষণ, তাদের আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষ ও হাতির নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছরের প্রতিপাদ্য, ‘হাতি রক্ষায় বিশ্বকে একসঙ্গে এগিয়ে আসতে হবে’।
তবে বাংলাদেশে বিশেষ করে শেরপুরের গারো পাহাড়ে মানুষ ও বন্য হাতির সংঘাত দিন দিন ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। বন উজাড়, মানুষের বসতি বৃদ্ধি এবং খাবার ও পানির সংকটে বন্য হাতির পাল প্রায়ই লোকালয়ে নেমে আসছে। এতে একদিকে ফসল ও ঘরবাড়ির ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষ ও হাতি।
১১ বছরে প্রাণ গেছে ৩৯ হাতি ও ৩৬ মানুষের
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সাল থেকে এখন পর্যন্ত শেরপুরে মানুষ ও হাতির সংঘাতে অন্তত ৪৭টি হাতি ও ৬৭ জন মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ২০১৪ সাল থেকে গত ১১ বছরে মারা গেছে ৩৯টি হাতি ও ৩৬ জন মানুষ।
শেরপুরের নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার প্রায় ৬০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় গারো পাহাড়ে বন্য হাতির বিচরণ রয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, গভীর রাতে প্রায়ই হাতির পাল লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। ধান, ভুট্টা, কলা, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট করার পাশাপাশি কখনো কখনো বসতবাড়িতেও হানা দেয় হাতি। হাতি তাড়াতে গিয়ে প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
নালিতাবাড়ীর কালাপানি এলাকার কৃষক বিজয় কুবি বলেন, প্রায় ২০ বছর ধরে হাতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছেন তিনি। প্রতিবছর কষ্ট করে ফলানো ফসল হাতির দল নষ্ট করে দেয়। অনেক সময় বাড়িঘরেও তাণ্ডব চালায়।
সংকুচিত হয়েছে হাতির আবাসস্থল
বন বিভাগ সূত্র জানায়, ১৯৯৫ সালে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পিক পাহাড় থেকে ২০ থেকে ২৫টি দলছুট বন্য হাতি এ অঞ্চলে চলে আসে। পরে সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও বিভিন্ন বাধার কারণে হাতিগুলো আর সহজে ফিরে যেতে পারেনি।
এরপর বন উজাড় ও মানুষের বসতি বাড়তে থাকায় হাতির বিচরণক্ষেত্র আরও সংকুচিত হয়েছে। খাবার ও পানির সন্ধানে হাতিগুলোকে প্রায়ই লোকালয়ের দিকে আসতে হচ্ছে।
নানা উদ্যোগেও স্থায়ী সমাধান নেই
মানুষ ও হাতির সংঘাত কমাতে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। ২০১৪ সালে সীমান্ত এলাকায় পরীক্ষামূলকভাবে সৌরবিদ্যুৎচালিত প্রায় ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বৈদ্যুতিক বেড়া নির্মাণ করা হয়।
এ ছাড়া ঝিনাইগাতীর তাওয়াকুচি ও কর্নঝুড়া এলাকায় হাতির খাবারের জন্য ১০০ হেক্টর বনভূমিতে বিশেষ বাগান করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় লেবু ও বেতকাঁটার বাগানও গড়ে তোলা হয়েছে।
হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণের জন্য সীমান্ত এলাকায় ১৬টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়েছে। পাহাড়ি গ্রামগুলোতে হাতি তাড়ানোর জন্য আলো, টর্চ ও বিদ্যুৎ উৎপাদনের যন্ত্রও বিতরণ করা হয়েছে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, এসব উদ্যোগেও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। পাহাড়ে খাবার ও পানির সংকট থাকায় হাতির পাল বারবার লোকালয়ে চলে আসছে।
হাতি শনাক্তে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যন্ত্র
মানুষ ও বন্য হাতির সংঘাত কমাতে নতুন উদ্যোগের কথাও জানিয়েছে সরকার। হাতির চলাচল শনাক্ত করে স্থানীয়দের আগাম সতর্ক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর শনাক্তকরণ যন্ত্র বসানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শেরপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরী জানিয়েছেন, প্রথম ধাপে নালিতাবাড়ীর হাতি উপদ্রুত এলাকায় ১৫টি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর আগাম শনাক্তকরণ যন্ত্র বসানো হবে। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে হাতির গতিবিধি শনাক্ত করে দ্রুত স্থানীয়দের সতর্ক করা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
একই সঙ্গে হাতিকে লোকালয় থেকে দূরে রাখতে বনের ভেতরে খাবার ও পানির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। হাতির বিচরণক্ষেত্রে জলাধার তৈরি এবং শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মোকাবিলায় গভীর পাম্প বসানোর পরিকল্পনাও রয়েছে।
ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, গারো পাহাড়ের প্রায় ৫৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় শতাধিক হাতির বিচরণ রয়েছে। হাতির পাশাপাশি মানুষকেও রক্ষা করতে হবে। এ জন্য বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, হাতিকে কোনো অবস্থাতেই বিরক্ত করা যাবে না। এ বিষয়ে বন বিভাগ ও হাতি মোকাবিলা দলের মাধ্যমে স্থানীয়দের সচেতন করা হচ্ছে।
প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা
পরিবেশবাদীদের মতে, গারো পাহাড়ে বন উজাড় ও মানুষের অবাধ চলাচলের কারণে হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে কমছে তাদের খাবারের উৎস। বেঁচে থাকার তাগিদেই হাতিগুলো লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে।
গারো পাহাড়, বন্য প্রাণী ও নদী রক্ষা পরিষদের উপদেষ্টা বিপ্লব দে কেটু বলেন, হাতি প্রকৃতির পাহারাদার। হাতি ও মানুষের মধ্যে নিরাপদ সহাবস্থান তৈরি করতে হবে।
বন্য প্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. আলী রেজা খান বলেন, মানুষ ও হাতির সংঘাত নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা জরুরি। গারো পাহাড়ে হাতির আবাসস্থলের ধারণক্ষমতা এবং বর্তমানে হাতির সংখ্যা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নেওয়া প্রয়োজন।
বিশ্বজুড়েই হুমকিতে হাতি
শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বজুড়েই এশীয় ও আফ্রিকান হাতি নানা হুমকির মুখে রয়েছে। হাতির দাঁতের জন্য চোরাশিকার, বন ও আবাসস্থল ধ্বংস এবং পর্যটন ও বিনোদনের নামে হাতির ওপর নির্যাতন তাদের অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাতির সবচেয়ে বড় হুমকিগুলোর একটি মানুষের কর্মকাণ্ড। তাই বিশ্ব হাতি দিবসে হাতি সংরক্ষণের পাশাপাশি তাদের আবাসস্থল রক্ষা এবং মানুষ ও হাতির নিরাপদ সহাবস্থান নিশ্চিত করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এসি/আপ্র/১২/০৮/২০২৬