বারবার সেমিফাইনালে থেমে যাওয়ার বৃত্ত ভেঙে এবার এশিয়া কাপের ফাইনালে খেলার লক্ষ্য নিয়েই মাঠে নামতে চায় বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। আসন্ন নারী টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপকে সামনে রেখে নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে সন্তুষ্ট অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি। তাঁর বিশ্বাস, এবারের আসরে দলীয় পারফরম্যান্সে উন্নতি এনে কাঙ্ক্ষিত ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করা সম্ভব।
আগামী ২৮ আগস্ট থেকে ১৩ সেপ্টেম্বর সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে নারী টি-টোয়েন্টি এশিয়া কাপ। বাংলাদেশের টুর্নামেন্ট মিশন শুরু হবে ৩১ আগস্ট ইন্দোনেশিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে। এরপর ৬ সেপ্টেম্বর শ্রীলঙ্কা এবং ৮ সেপ্টেম্বর স্বাগতিক সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ।
তিনটি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হবে বাংলাদেশ সময় রাত সাড়ে ৯টায়। সেমিফাইনাল হবে ১০ ও ১১ সেপ্টেম্বর, আর ফাইনাল ১৩ সেপ্টেম্বর।
টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি নিয়ে জ্যোতি বলেন, প্রস্তুতি এবার বেশ ভালো হয়েছে। দল বেশ কয়েকটি প্রস্তুতি ম্যাচ খেলেছে। শ্রীলঙ্কায় ম্যাচগুলো অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে সেখানে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচও খেলেছে দল। সব মিলিয়ে টুর্নামেন্টের আগে নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে সন্তুষ্ট বাংলাদেশ অধিনায়ক। তবে প্রস্তুতির চেয়েও বড় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন জ্যোতি—ফাইনালে খেলা। তাঁর ভাষায়, বাংলাদেশ বারবার সেমিফাইনাল খেললেও সেখান থেকে আর এগোতে পারেনি। এবার সেই বাধা ভাঙতে চান তাঁরা।
২০১৮ সালে এশিয়া কাপের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। তবে সর্বশেষ আসরটি ভালো কাটেনি। গ্রুপ পর্বে শ্রীলঙ্কার কাছে হেরে সেমিফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। সেখানেও বিদায় নেয় দল। এবার তাই গ্রুপ পর্বের প্রতিটি ম্যাচকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছেন জ্যোতি।
তাঁর মতে, গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হতে পারলে সেমিফাইনালে ভারতের মুখোমুখি হওয়ার সম্ভাবনা এড়ানো যাবে। ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালকে কঠিন চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তাঁর মতে, গ্রুপ পর্বে ভালো খেলে শীর্ষে থাকতে পারলে অন্য গ্রুপের তুলনামূলক সুবিধাজনক প্রতিপক্ষের বিপক্ষে সেমিফাইনাল খেলার সুযোগ তৈরি হবে। শ্রীলঙ্কার মতো শক্তিশালী দলকে হারাতে পারাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হবে বলে মনে করেন তিনি।
এশিয়া কাপের সাফল্যের প্রভাব এশিয়ান গেমসেও পড়বে বলে মনে করেন জ্যোতি। ২০২৬ সালের এশিয়ান গেমস ১৯ সেপ্টেম্বর থেকে ৪ অক্টোবর জাপানের আইচি ও নাগোয়া শহরে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। তবে ক্রিকেটসহ কিছু ইভেন্ট উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের আগেই ১৭ সেপ্টেম্বর শুরু হবে।
এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশের প্রথম লক্ষ্য পদক জয়। ২০১০ সালে রুপা জয়ের পর সর্বশেষ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল ব্রোঞ্জ জিতেছিল। এবার সেই সাফল্যকে আরও বড় পর্যায়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন জ্যোতি।
তাঁর মতে, দল ও দেশের মানুষের প্রত্যাশা অনেক। অন্তত একটি পদক দেশে নিয়ে আসাই লক্ষ্য; আর সেটি সোনা হলে অর্জন হবে আরও বড়। তবে আপাতত পুরো মনোযোগ এশিয়া কাপেই। জ্যোতির বিশ্বাস, এশিয়া কাপে দল ভালো করতে পারলে তার ইতিবাচক প্রভাব এশিয়ান গেমসেও পড়বে।
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পরও দীর্ঘ সংস্করণের আন্তর্জাতিক ম্যাচ নিয়মিত না খেলার বিষয়েও নিজের মত জানিয়েছেন জ্যোতি। তাঁর মতে, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘ সংস্করণের ম্যাচ খেলার আগে ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত এ ধরনের ম্যাচ আয়োজন জরুরি। বাংলাদেশ টেস্ট মর্যাদা পাওয়ার পর ঘরোয়া পর্যায়ে দুটি দীর্ঘ সংস্করণের টুর্নামেন্ট খেলেছে—একটি তিন দিনের এবং অন্যটি দুই দিনের।
তিন দিনের ম্যাচের অভিজ্ঞতা ইতিবাচক ছিল বলে জানান জ্যোতি। তাঁর মতে, যথাযথ প্রস্তুতি ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দীর্ঘ সংস্করণের ম্যাচে নামা ঠিক হবে না। ঘরোয়া ক্রিকেটে নিয়মিত দীর্ঘ সংস্করণের প্রতিযোগিতা থাকলে ক্রিকেটাররা আন্তর্জাতিক ম্যাচের জন্য আরও ভালোভাবে প্রস্তুত হতে পারবেন। দীর্ঘ সংস্করণের ক্রিকেটে ফিটনেসের পাশাপাশি মানসিক প্রস্তুতি ও নিয়মিত অনুশীলনের গুরুত্বও তুলে ধরেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। তাঁর মতে, এই সংস্করণে ভালো করতে হলে ঘরোয়া পর্যায় থেকেই ক্রিকেটারদের পর্যাপ্ত চর্চার সুযোগ দিতে হবে।
ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো প্রায়ই তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয় বলে মনে করেন জ্যোতি। তাঁর মতে, সাম্প্রতিক বিশ্বকাপেও ভারতের বিপক্ষে বাংলাদেশকে বেশ কিছু সুযোগ তৈরি করতে দেখা গেছে। বোলিং ও ফিল্ডিংয়ে কিছু ভুল না হলে ভারত আরও চাপে পড়তে পারত বলেও মনে করেন তিনি। জ্যোতির মতে, ভারতের বিপক্ষে ভালো করতে হলে ইতিবাচক মানসিকতা নিয়ে খেলতে হবে। তাঁদের দলে যেমন বিশ্বমানের ক্রিকেটার রয়েছেন, ভারতের দলেও তেমন তারকা খেলোয়াড় আছেন।
তবে দক্ষতার দিক থেকে বাংলাদেশ খুব বেশি পিছিয়ে নেই। মূল সমস্যা হলো, নিজেদের সামর্থ্য অনেক সময় পারফরম্যান্সে পুরোপুরি তুলে ধরতে না পারা। তাই ভারতের বিপক্ষে মাঠে নামার সময় প্রতিপক্ষের নাম নিয়ে অতিরিক্ত ভাবনা না করে অন্য যেকোনো দলের মতোই তাদের বিপক্ষে জয়ের লক্ষ্য নিয়ে খেলতে হবে বলে মনে করেন জ্যোতি। মাঠের বাইরের কোনো ঘটনা দলের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি তা নাকচ করে দেন। তাঁর মতে, মাঠের বাইরে কী হচ্ছে, সেটি ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলার মতো বিষয় নয়। ক্যাচ মিস খেলাটিরই অংশ এবং দলের হয়ে নিজের সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা সবসময়ই করেন বলে জানান তিনি।
অধিনায়কত্বের পাশাপাশি ব্যাটার হিসেবে নিজের দায়িত্বকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন জ্যোতি। তাঁর মতে, গত তিন মাস ধরে ব্যাটিং নিয়ে তিনি সন্তুষ্ট। ব্যাটিংয়ের সময় অধিনায়ক হিসেবে নিজেকে না দেখে দলের টপ অর্ডারের একজন ব্যাটার হিসেবেই ভাবেন তিনি। পরিস্থিতি অনুযায়ী পাওয়ার প্লে, মাঝের ওভার কিংবা ইনিংসের শেষদিকে ব্যাট করতে হয় তাঁকে। ফলে তাঁর ওপর বড় দায়িত্ব থাকে। তিনি স্বাচ্ছন্দ্যে রান করতে পারলে দলের জয়ের সম্ভাবনাও বেড়ে যায় বলে মনে করেন জ্যোতি।
এশিয়া কাপেও নিজের নির্ধারিত ভূমিকা অনুযায়ী ব্যাটিং করে যেতে চান বাংলাদেশ অধিনায়ক। সাম্প্রতিক প্রস্তুতি ম্যাচ, বিশ্বকাপ ও ত্রিদেশীয় সিরিজে ভালো রান পাওয়ার ধারাবাহিকতা এশিয়া কাপেও ধরে রাখাই তাঁর লক্ষ্য। আর ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সের সঙ্গে দলীয় সাফল্য মিলিয়ে এবার সেমিফাইনালের বাধা পেরিয়ে ফাইনালে ওঠাই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য।
ডিসি/আপ্র/২৪/০৮/২০২৬