আজ পবিত্র ঈদুল ফিতর।
সংযমের মাস শেষে আনন্দের দিন।
তবে এ আনন্দ নির্ভার নয়।
এবারের ঈদ এসেছে এক অস্থির পৃথিবীতে।
যুদ্ধের ধোঁয়া মেখে।
উদ্বেগের ছায়া নিয়ে।
তবু মানুষের বুকের ভেতর আলো নিভে যায়নি।
বাংলাদেশ আজ ঈদের নামাজে, আলিঙ্গনে, সেমাইয়ের গন্ধে, নতুন পোশাকের খসখস শব্দে, ঘরে ফেরার স্বস্তিতে জেগে উঠেছে। কিন্তু এই উৎসবের সকালেই কোথাও প্রবাসী সন্তানের জন্য মায়ের উৎকণ্ঠা, কোথাও দুর্ঘটনায় থেমে যাওয়া যাত্রাপথের বেদনা, কোথাও বাজারের চাপ, কোথাও কবরের পাশে নীরব দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের অশ্রু—সব মিলিয়ে এবারের ঈদ শুধু উৎসবের নয়, সময়েরও এক গভীর প্রতিচ্ছবি।
এটি আনন্দের দিন।
আবার আত্মসমীক্ষারও দিন।
এটি ফিরে পাওয়ার দিন।
আবার হারিয়ে ফেলা মানুষদের মনে করারও দিন।
ঘরে ফিরেছে মানুষ, থামেনি টান
কয়েক দিনের টানা যাত্রা শেষে রাজধানী ছেড়ে লাখো মানুষ ফিরেছে গ্রামের বাড়িতে। বাস, ট্রেন, লঞ্চ, ফেরি—সব পথেই ছিল ভিড়। ছিল ক্লান্তি। ছিল ভোগান্তি। কিন্তু নাড়ির টান তার চেয়েও বড়। সেই টানেই শহর ফেলে মানুষ ফিরেছে শিকড়ে।
কোথাও মা দরজায় দাঁড়িয়ে ছিলেন।
কোথাও বাবা রাত জেগে অপেক্ষা করেছেন।
কোথাও ছোট ভাই নতুন জামা পরে বারবার উঠোনে গেছে।
কোথাও মেয়ে ফিরেছে বহুদিন পর।
ঈদের আগে পথের কষ্ট ছিল বাস্তব। বগুড়ায় ট্রেন দুর্ঘটনা, সদরঘাটে মর্মান্তিক প্রাণহানি, অতিরিক্ত ভাড়া নিয়ে অভিযোগ, বৃষ্টির বাগড়া, দীর্ঘ অপেক্ষা—সবই ছিল। তবু মানুষের একটাই কথা, ঈদে বাড়ি ফিরতেই হবে। কারণ ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি বাঙালি মুসলমানের সবচেয়ে বড় পারিবারিক পুনর্মিলন।
এই ফিরে আসার ভেতরেই ঈদের প্রথম সৌন্দর্য।
মানুষ তার মানুষে ফেরে।
শহর ফেরে গ্রামে।
ব্যস্ততা ফেরে মমতায়।
রাষ্ট্রীয় আবহে নতুন বার্তা
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নতুন প্রেক্ষাপটে এটি দেশের প্রথম ঈদ। জাতীয় ঈদগাহে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী একসঙ্গে ঈদের জামাতে শরিক হওয়ার কথা রয়েছে। রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতৃত্বের এই একত্র উপস্থিতি অনেকের কাছে প্রতীকী গুরুত্বও বহন করছে।
প্রধান জামাত হবে জাতীয় ঈদগাহে।
বিকল্প ব্যবস্থা রাখা হয়েছে জাতীয় মসজিদে।
রাজধানীসহ সারা দেশে ঈদের জামাত ঘিরে নেওয়া হয়েছে প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা।
কিন্তু রাষ্ট্রীয় আয়োজনের বাইরেও আজকের দিনের আসল শক্তি অন্যত্র।
সেটি কাতারে কাতারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ।
ধনী-গরিবের কাঁধ মেলানো।
মর্যাদা ভুলে স্রষ্টার সামনে সমান হয়ে যাওয়া।
ঈদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক ভাষ্যও বোধহয় এটাই—সমতা।
ঘরের ভেতর উৎসব, মনে মনে শূন্যতা
ঈদের সকাল মানেই রান্নাঘরে ব্যস্ততা।
সেমাই, ফিরনি, কোরমা, পোলাও।
আতর, টুপি, পাঞ্জাবি, শাড়ি।
শিশুর উচ্ছ্বাস।
বড়দের ডাকাডাকি।
আত্মীয়ের বাড়ি যাওয়ার তাড়া।
তবু প্রতিটি ঘর এক রকম নয়।
কোথাও টেবিল ভরা খাবার।
কোথাও হিসাব কষে রান্না।
কোথাও নতুন জামা সবার হয়নি।
কোথাও বাবা নেই।
কোথাও মা নেই।
কোথাও প্রবাসী স্বামী শুধু ফোনে ঈদ করছেন।
ঈদের দিন মানুষ সবচেয়ে বেশি টের পায়, আনন্দ কখনোই একা আসে না। তার সঙ্গে স্মৃতি থাকে। অনুপস্থিতি থাকে। অভাব থাকে। তাই নামাজ শেষে অনেকে কবরস্থানে যাবেন। মোনাজাতে স্মরণ করবেন চলে যাওয়া আপনজনদের। কারও ঈদ শুরু হবে আলিঙ্গনে, কারও ঈদ শুরু হবে অশ্রুতে।
বাজারে চাপ, তবে উৎসব থামে না
পণ্যের দাম বেড়েছে।
সংসারের চাপ বেড়েছে।
অনেক পরিবারের ঈদের বাজেট ছোট হয়েছে।
কিন্তু ঈদের আনন্দের হিসাব কেবল টাকায় মাপে না মানুষ।
কেউ নিজের জন্য না কিনে সন্তানের জন্য কিনেছেন।
কেউ কম খরচে উৎসব টিকিয়ে রেখেছেন।
কেউ ধার করে হলেও ঘরে কিছু ভালো রান্না তুলেছেন।
কেউ পুরোনো জামা পরে নতুন জামা তুলেছেন ছোট ভাইয়ের হাতে।
এখানেই এ সমাজের নীরব মহত্ত্ব।
যার আছে, সে দেয়।
যার কম আছে, সে-ও ভাগ করে।
ফিতরা, যাকাত, দান, সাদাকা—সব মিলিয়ে ঈদ এক ধরনের সামাজিক ন্যায়বোধেরও নাম।
আজকের দিনে সবচেয়ে বড় প্রশ্নও তাই—আমার আনন্দে অন্যের অংশ আছে কি না।
ঈদ এমন এক দিন, যেদিন অভাবী মানুষও অন্তত প্রিয়জনের মুখে একটু হাসি দেখতে চান।
এই ত্যাগের ভেতরেই ঈদের আসল রূপ।
উৎসব শুধু ভোগের নয়।
উৎসব ভাগের।
খুশি ভাগের।
রুটি ভাগের।
ভালোবাসা ভাগের।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই বাণীতে ধনী-গরিবের ভেদরেখা ভুলে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় হাসপাতাল, কারাগার, শিশু সদন, বৃদ্ধ নিবাস, আশ্রয়কেন্দ্রসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে উন্নত খাবারের আয়োজনও রাখা হয়েছে।
ঈদকে পূর্ণ করে ফিতরা।
যাকাত।
দান।
দরিদ্রের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার নীরব আনন্দ।
কারণ—একটি ঘরে ঈদ আর পাশের ঘরে অনাহার, এই বৈপরীত্য ঈদের চেতনার সঙ্গে যায় না।
প্রবাসীর ঈদ, ফোনের ওপারের কান্না
বাংলাদেশের অসংখ্য পরিবারে ঈদ পূর্ণ হয় না, যদি না দূরদেশে থাকা মানুষটির কথা মনে করা হয়। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুদ্ধ ও নিরাপত্তা-উদ্বেগের মধ্যে এবারের ঈদ করছেন বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশি। দেশে তাদের স্বজনরা তাই উৎসবের মাঝেও দুশ্চিন্তায়।
ফোনে হয়তো শোনা যাচ্ছে—
আমি ভালো আছি।
চিন্তা কোরো না।
কিন্তু এই কথার ভেতরেও থাকে চাপা ভয়।
থাকে অনিশ্চয়তা।
থাকে দূর আকাশের নিচে একা হয়ে থাকার বোধ।
প্রবাসীদের পাঠানো অর্থে যে ঘরে ঈদের বাজার উঠেছে, সেই ঘরেই আজ তাদের অনুপস্থিতি সবচেয়ে তীব্র।
বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে বিষণ্ন এক ঈদ
এবারের ঈদ শুধু বাংলাদেশের নয়, সমগ্র মুসলিম বিশ্বের আবেগের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়ানো। গাজায় যুদ্ধের দীর্ঘ ছায়া, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত, বাস্তুচ্যুত মানুষের সারি, শোকাহত পরিবার, অনিশ্চিত নিরাপত্তা—সব মিলিয়ে এবারের বৈশ্বিক ঈদে আনন্দের পাশে বড় করে লেখা আছে বেদনা।
কোথাও শিশুরা নতুন জামা পায়নি।
কোথাও বাড়ি নেই।
কোথাও নামাজের মাঠ নেই।
কোথাও ঈদের দিনও আকাশে ভাসছে আতঙ্ক।
এই বাস্তবতা বাংলাদেশের ঈদকেও নাড়া দেয়। কারণ এ দেশের মানুষের ঘরেও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে যোগ আছে—প্রবাসে, আত্মীয়তায়, আবেগে, বিশ্বাসে। তাই আজকের মোনাজাতে শুধু নিজের পরিবারের সুখ নয়, যুদ্ধবিদ্ধস্ত মানুষের শান্তিও থাকবে।
বৃষ্টির শঙ্কা, উৎসবের আলো অমলিন
ঈদের দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টির সম্ভাবনা আছে। মেঘলা আকাশ হতে পারে। কোথাও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি নামতে পারে। কিন্তু এতে ঈদের রঙ ফিকে হয় না। বাঙালির উৎসবের শক্তি বাইরে নয়, ভেতরে।
মাঠ না হলে মসজিদ।
উঠোন না হলে বারান্দা।
রোদ না হলে মেঘের নিচেই ঈদ।
আসলে ঈদ মানুষের ভিতরের আলোর নাম।
ঈদের শিক্ষা, আজকের দায়
পবিত্র ঈদুল ফিতর মাসজুড়ে অর্জিত সংযমকে জীবনে নামিয়ে আনার আহ্বান। ক্ষুধার কষ্ট বুঝে ক্ষুধার্তের পাশে দাঁড়ানোর শিক্ষা। আত্মশুদ্ধির আলোকে সমাজকে মানবিক করার আহ্বান। ভেদরেখা ভুলে সহমর্মিতার হাত বাড়ানোর ডাক।
আজকের দিনে তাই শুধু শুভেচ্ছা নয়, প্রতিজ্ঞাও দরকার।
বিদ্বেষ কমানোর প্রতিজ্ঞা।
অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর প্রতিজ্ঞা।
অসহায়ের পাশে থাকার প্রতিজ্ঞা।
পরিবারকে সময় দেওয়ার প্রতিজ্ঞা।
প্রদর্শনের বদলে মমতা বেছে নেওয়ার প্রতিজ্ঞা।
ঈদ শেষ হয়ে যাবে।
জামা পুরোনো হবে।
আলোকসজ্জা নিভে যাবে।
কিন্তু এই শিক্ষাগুলো যদি টিকে যায়, তবেই ঈদ সত্যি পূর্ণতা পাবে।
এ ঈদ সবার হোক
আজ বাংলাদেশের আকাশে ঈদের চাঁদ। সেই চাঁদ শুধু উৎসবের প্রতীক নয়, মানবতারও প্রতীক। তার আলো গ্রামবাংলার উঠোনে যেমন পড়ে, তেমনি পড়ে প্রবাসীর জানালায়, যুদ্ধবিধ্বস্ত শিশুর মুখে, কবরের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের চোখেও।
তাই আজকের সবচেয়ে বড় প্রার্থনা একটাই—
এ আনন্দ যেন একার না হয়।
এ শান্তি যেন সবার হয়।
এ দোয়া যেন সীমান্ত না মানে।
বাংলাদেশে ঘরে ঘরে হাসি ফুটুক।
অভাবীর ঘরেও চুলা জ্বলুক।
প্রবাসী নিরাপদ থাকুক।
যুদ্ধ থামুক।
মানুষ মানুষের কাছে ফিরুক।
রক্তছায়ার ভেতরও ঈদের চাঁদ উঠেছে।
সে চাঁদ আমাদের মনে করিয়ে দিক—
অন্ধকার যত গভীরই হোক,
মানুষের জন্য মানুষের দরজা বন্ধ হয়ে যেতে পারে না।
সানা/আপ্র/২১/৩/২০২৬