জুলাই সনদ বাস্তবায়নকে কেন্দ্র করে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে মতবিরোধ ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান নিয়ে শপথ গ্রহণের দিন থেকেই শুরু হওয়া এই অচলাবস্থার এখনও কার্যকর সমাধানের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিরোধী দল সংবিধানের পূর্ণাঙ্গ সংস্কার দাবি করলেও ক্ষমতাসীন পক্ষ সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় দ্বন্দ্ব আরও ঘনীভূত হয়েছে।
জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান সংবিধান সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান ও সমান প্রতিনিধিত্বের ভিত্তিতে একটি বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেন। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ’-এর বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে একে ‘সূচনা থেকেই অবৈধ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি সর্বদলীয় কমিটি গঠনের প্রস্তাব দিলেও তা প্রত্যাখ্যান করে বিরোধী জোট কঠোর আন্দোলনের পথে হাঁটার ঘোষণা দেয়।
এরই মধ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট সংসদের পাশাপাশি রাজপথে আন্দোলন জোরদার করেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ কর্মসূচি ও সেমিনারের মাধ্যমে তারা জুলাই সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবি জানাচ্ছে এবং প্রয়োজনে সরকার পতনের আন্দোলনের হুঁশিয়ারিও দিচ্ছে।
অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুলাই সনদের প্রতি সরকারের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, বিএনপি সবার আগে সনদে স্বাক্ষর করেছে এবং এর প্রতিটি ধারা বাস্তবায়ন করা হবে। সংসদ ও জনসভা—উভয় ক্ষেত্রেই তিনি এ অঙ্গীকার পুনরায় তুলে ধরেন।
রাজনৈতিক অচলাবস্থার পেছনে মূলত সংবিধান সংস্কারের ধরন ও পরিসর নিয়ে মতপার্থক্যকে দায়ী করা হচ্ছে। ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর জারি হওয়া ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ’ এবং পরবর্তী গণভোটে বিপুল সমর্থন পাওয়া সত্ত্বেও এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে দ্বিধা সৃষ্টি হয়েছে। বিরোধী পক্ষের দাবি, গণভোটে অনুমোদিত সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নই জনগণের প্রত্যাশা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণঅভ্যুত্থানের পর মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এর অংশ হিসেবে পূর্ববর্তী সরকারের বিতর্কিত সংশোধনীগুলো বাতিল এবং নতুন কাঠামো প্রবর্তনের দাবি উঠে।
তবে ক্ষমতাসীন দল সংবিধানের কাঠামোগত ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ধাপে ধাপে সংশোধনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। বিপরীতে বিরোধী জোট দ্রুত ও পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের দাবি জানিয়ে আসছে। তাদের মতে, গণভোটে প্রাপ্ত সমর্থন উপেক্ষা করা হলে তা জনগণের সঙ্গে প্রতারণার শামিল হবে।
বিরোধী দলের নেতারা অভিযোগ করছেন, সরকার মৌলিক বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। নাহিদ ইসলামসহ জোটের নেতারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, দাবি বাস্তবায়ন না হলে আন্দোলন আরও বিস্তৃত করা হবে।
অন্যদিকে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা নজরুল ইসলাম খান বিরোধীদের এই অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তার মতে, সরকারের সুস্পষ্ট প্রতিশ্রুতির পরও রাজপথে উত্তেজনা সৃষ্টি করা এক ধরনের অসৎ উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত বহন করতে পারে।
সামগ্রিক পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক অচলাবস্থা নিরসনে কার্যকর সংলাপ ও সমঝোতার বিকল্প নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সানা/আপ্র/১৬/৪/২০২৬