গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
সোমবার, ০৯ মার্চ ২০২৬

মেনু

কোথাও এক কিলোমিটার লাইন, কোথাও পাম্পে তেল নেই

তেলের জন্য নগরজুড়ে দীর্ঘ অপেক্ষা

নিজেস্ব প্রতিবেদক

নিজেস্ব প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২১:১৩ পিএম, ০৯ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ২২:৩৩ এএম ২০২৬
তেলের জন্য নগরজুড়ে দীর্ঘ অপেক্ষা
ছবি

তেল নিতে এভাবে দীর্ঘ লাইনে অপেক্ষারত মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত যানের চালকেরা -ছবি সংগৃহীত

রাজধানীতে জ্বালানি তেলের সরবরাহ সংকট কাটেনি। অনেক ফিলিং স্টেশনে তেল না থাকায় বিক্রি বন্ধ রাখা হয়েছে, আবার যেসব পাম্পে বিক্রি চলছে সেখানে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি কয়েকশ মিটার থেকে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। তেল পাওয়ার আশায় অনেক চালক ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন।

সোমবার (৯ মার্চ) সকালে মিরপুর, কল্যাণপুর, মোহাম্মদপুর, বিজয়সরণি ও কালশী এলাকার কয়েকটি ফিলিং স্টেশন ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

কোথাও বিক্রি বন্ধ, তবু লাইনে দাঁড়িয়ে চালকেরা: রাজধানীর অনেক ফিলিং স্টেশনে তেল বিক্রি বন্ধ থাকলেও সেখানে যানবাহনের সারি দেখা গেছে। মোটরসাইকেল, ব্যক্তিগত গাড়ি ও অন্যান্য যানবাহনের চালকেরা তেল আসার আশায় অপেক্ষা করছেন।

চালকদের ভাষ্য, অনেকের গাড়ির তেল প্রায় শেষ কিংবা পুরোপুরি ফুরিয়ে গেছে। ফলে অন্য পাম্পে যাওয়ার মতো অবস্থাও নেই। পাম্প ছেড়ে গেলে অনেককে গাড়ি ঠেলে নিতে হতে পারে।

কোথাও এক থেকে দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ সারি: যেসব পাম্পে তেল বিক্রি চলছে, সেখানে গাড়ির লাইন কয়েকশ মিটার থেকে এক থেকে দেড় কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। অনেক চালক জানান, তারা দেড় থেকে দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে লাইনে অপেক্ষা করছেন।

সোমবার সকালে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার নয়টি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে তিনটিতে তেল বিক্রি বন্ধ পাওয়া গেছে। একটি পাম্পে শুধু ডিজেল এবং আরেকটিতে শুধু অকটেন বিক্রি হচ্ছিল। বাকি কয়েকটিতে সীমিত পরিমাণে তেল সরবরাহ করা হচ্ছিল।

মিরপুরে পাম্প বন্ধ, তেলের অপেক্ষায় দীর্ঘ লাইন: সকাল ৯টার দিকে মিরপুর-২ নম্বর এলাকায় একটি পাম্পের প্রায় তিনশ মিটার আগে থেকেই ব্যক্তিগত গাড়ি ও মোটরসাইকেলের সারি দেখা যায়। কিন্তু পাম্পে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে তেল বিক্রি বন্ধ। পাম্পের এক নিরাপত্তাকর্মী জানান, ডিপো থেকে তেলের গাড়ি না আসা পর্যন্ত বিক্রি শুরু করা সম্ভব নয়। পাম্পের ক্যাশিয়ার জানান, আগের দিন বিকেলে পাওয়া সাড়ে চার হাজার লিটার অকটেন রাতের মধ্যেই শেষ হয়ে যায়। সকাল সাড়ে সাতটা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা মোটরসাইকেলচালক সেলিম মিয়া বলেন, তিনি প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করছেন। রোজা রেখে বাইক ঠেলে অন্য পাম্পে যাওয়াও সম্ভব নয় বলে জানান তিনি।

কল্যাণপুরে পাম্পে শুধু গ্যাস বিক্রি: কল্যাণপুর এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে জ্বালানি তেল বিক্রি বন্ধ। পাম্পটিতে শুধু গ্যাস বিক্রি করা হচ্ছিল। একই এলাকায় আরেকটি পাম্পেও প্রবেশপথে ‘তেল নেই’ লেখা সাইনবোর্ড টাঙানো ছিল।

আসাদগেটে তেল মিললেও দীর্ঘ অপেক্ষা: আসাদগেট এলাকার একটি ফিলিং স্টেশনে ডিজেল ও অকটেন বিক্রি চলছিল। তবে পাম্পে ঢোকার আগে প্রায় সোয়া এক কিলোমিটার দূর পর্যন্ত ব্যক্তিগত গাড়ির লাইন দেখা যায়। লাইনে দাঁড়ানো এক চালক জানান, তিনি সকাল ৯টার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন এবং প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষার পর সামনে কয়েকটি গাড়ি রয়েছে।

পাম্পের এক কর্মচারী জানান, আগের রাতে আসা তেলের বড় একটি অংশ ইতিমধ্যে বিক্রি হয়ে গেছে। বাকি তেল শেষ হয়ে গেলে নতুন সরবরাহ না এলে তাদেরও বিক্রি বন্ধ করতে হতে পারে।

বিজয়সরণিতে সবচেয়ে দীর্ঘ সারি: রাজধানীর বিজয়সরণি এলাকার একটি পাম্পে সবচেয়ে দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। সেখানে ব্যক্তিগত গাড়ির লাইন দেড় কিলোমিটারেরও বেশি দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়ে মহাখালী এলাকার একটি হাসপাতাল পর্যন্ত পৌঁছায়। মোটরসাইকেলের সারিও অনেক দূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে।


যুদ্ধের প্রভাব ও আতঙ্কে বাড়ছে কেনাকাটা: ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান সংঘাতের প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানি অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব দেশেও পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। সরকার রেশনিং পদ্ধতিতে তেল সরবরাহ শুরু করার আগে অনেক গ্রাহক অতিরিক্ত তেল কিনতে শুরু করেন। এতে অনেক পাম্পে দ্রুত তেল শেষ হয়ে যায়।

শুক্র ও শনিবার সরকারি ছুটির কারণে ডিপো থেকে তেলবাহী গাড়ি চলাচল বন্ধ থাকায় সরবরাহেও বিঘ্ন ঘটে।

চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম: রাজধানীর কিছু পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চাহিদার তুলনায় তেলের সরবরাহ কম আসছে। ফলে যে পরিমাণ তেল আসছে তা দ্রুতই শেষ হয়ে যাচ্ছে।

একটি পাম্পের কর্মচারী বলেন, তাদের প্রতিদিন কয়েকটি তেলের গাড়ি প্রয়োজন হলেও বাস্তবে একটি গাড়ি আসে, যা বিপুল চাহিদার তুলনায় খুবই কম।

গ্রাহকদের ক্ষোভ ও অনিশ্চয়তা: তেল নিতে এসে অনেক গ্রাহক দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করছেন। কেউ কেউ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ছুটির পর থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক হবে বলা হলেও বাস্তবে তা দেখা যাচ্ছে না।

একজন গ্রাহক জানান, একাধিক পাম্প ঘুরেও তিনি তেল পাননি। কোথাও বলা হচ্ছে তেলের গাড়ি এলে বিক্রি শুরু হবে।

কোথাও সরবরাহ স্বাভাবিক: তবে রাজধানীর কিছু পাম্পে তেলের সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক দেখা গেছে। সেখানে রেশনিং পদ্ধতিতে গ্রাহকদের তেল দেওয়া হচ্ছে এবং নিয়মিত তেলের গাড়ি পৌঁছাচ্ছে বলে কর্মচারীরা জানিয়েছেন।

একটি তেলের গাড়ি সাধারণত প্রায় তেরো হাজার পাঁচশ লিটার তেল বহন করতে পারে। রেশনিং পদ্ধতিতে তা দিয়ে কয়েক হাজার মোটরসাইকেল বা শতাধিক গাড়িকে তেল দেওয়া সম্ভব।

কেন তৈরি হয়েছে এই পরিস্থিতি: পেট্রোল পাম্প মালিকদের মতে, ডিপো থেকে চাহিদার তুলনায় কম তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে অনেক পাম্প পর্যাপ্ত তেল পাচ্ছে না।

তারা জানান, তেলবাহী জাহাজ দেশে এলেও তা খালাস, শুল্ক প্রক্রিয়া এবং পরিবহন শেষে পাম্পে পৌঁছাতে সাধারণত সাত থেকে দশ দিন সময় লাগে। এই সময়ের মধ্যে আতঙ্কে অতিরিক্ত কেনাকাটা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে।

সব জেলায় নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত: জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে দেশের সব জেলায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার নির্দেশ দিয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ।

সোমবার জেলা প্রশাসকদের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়েছে, জ্বালানি তেলের বাজারে শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং কৃত্রিম সংকট প্রতিরোধের জন্য এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।

অনিয়ম ঠেকাতে কঠোর ব্যবস্থা: নির্দেশনায় বলা হয়েছে, তেলের অবৈধ মজুত, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি, খোলা বাজারে বিক্রি বন্ধ রাখা বা পাচারের মতো অনিয়ম ঠেকাতে জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে।

সরকার মনে করছে, মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি ও নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলে জ্বালানি তেলের বাজারে শৃঙ্খলা ফিরবে এবং ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে।

তেলের প্রধান ডিপোগুলোতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ: জ্বালানি তেল নিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশে প্রধান তেলের ডিপোগুলোতে নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেনাবাহিনী মোতায়েনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

সোমবার (৯ মার্চ) এক বার্তায় বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জানায়, জ্বালানি তেল বিপণনে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন ডিপো হতে কোন কোন ক্ষেত্রে ডিলারদের আকস্মিক বর্ধিত চাহিদা অনুযায়ী জ্বালানি তেল পাচ্ছে না বলে জানা যায়। ফলে জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানিগুলোর চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গায় প্রধান স্থাপনাসহ প্রধান প্রধান ডিপোগুলোতে অর্থাৎ খুলনা জেলার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জ জেলার বাঘাবাড়ি, নারায়ণগঞ্জ জেলার গোদনাইল ও ফতুল্লা, দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর এবং বরিশাল ডিপোতে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জ্বালানি তেল বিপণন কোম্পানি সূত্রে জানা যায়। দেশের জ্বালানি তেলের ডিপোগুলো কেপিআইভুক্ত স্থাপনা হওয়ায় জরুরিভিত্তিতে এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এ পরিপ্রেক্ষিতে বিপণন কোম্পানিগুলোর উল্লিখিত স্থাপনার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জরুরি ভিত্তিতে সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রয়োজন।

এমতাবস্থায়, উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিপণন কোম্পানিগুলোর চট্টগ্রাম মহানগরীর পতেঙ্গার প্রধান স্থাপনা, খুলনা জেলার দৌলতপুর, সিরাজগঞ্জ জেলার বাঘাবাড়ি, নারায়ণগঞ্জ জেলার গোদনাইল ও ফতুল্লা, দিনাজপুর জেলার পার্বতীপুর এবং বরিশাল ডিপোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সেনাবাহিনী মোতায়েনের পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য অনুরোধ করা হলো। 
সানা/আপ্র/৯/৩/২০২৬

 

সংশ্লিষ্ট খবর

জাকাত ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খলা এবং কার্যকর করতে নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর
০৯ মার্চ ২০২৬

জাকাত ব্যবস্থাপনা সুশৃঙ্খলা এবং কার্যকর করতে নির্দেশনা প্রধানমন্ত্রীর

জাকাত ব্যবস্থাপনা ‘সুশৃঙ্খলা এবং কার্যকর’ করতে ধর্মমন্ত্রীকে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক র...

তামাক প্রকাশ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধের প্রস্তাব দেওয়া হবে: তথ্যমন্ত্রী
০৯ মার্চ ২০২৬

তামাক প্রকাশ্যে ব্যবহার নিষিদ্ধের প্রস্তাব দেওয়া হবে: তথ্যমন্ত্রী

তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেছেন, তামাকজাত দ্রব্যের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে বিদ্যমান আইনে...

১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের জন্য অসহনীয় বোঝা, কমনওয়েলথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী
০৯ মার্চ ২০২৬

১২ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের জন্য অসহনীয় বোঝা, কমনওয়েলথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী

মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গার নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্র...

জাফরুল্লাহর নাম নিয়ে আলোচনার পর স্বাধীনতা পুরস্কারের নিয়ম পরিবর্তন
০৯ মার্চ ২০২৬

জাফরুল্লাহর নাম নিয়ে আলোচনার পর স্বাধীনতা পুরস্কারের নিয়ম পরিবর্তন

স্বাধীনতা পুরস্কারের তালিকায় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর নাম দ্বিতীয়বার আসা নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়ার পর এ স...

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই