রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দৈনন্দিন জীবনে মশার উপদ্রব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে নাগরিকরা ঘরে বাইরে প্রাণে বাঁচতে পারছেন না। বংশাল, যাত্রাবাড়ী, সূত্রাপুর, শান্তিনগর, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় সকাল থেকে রাত পর্যন্ত মশার কামড়ে মানুষের কাজ, পড়াশোনা ও ঘুম-সবকিছু ব্যাহত হচ্ছে। নাগরিকদের অভিব্যক্তি অনুযায়ী ‘মেয়র আসে-জায়, সরকার আসে-সরকার যায়, প্রশাসক আসে-প্রশাসক যায়, কিন্তু মশা যায় না।’
সরকারী ও নাগরিক উভয় পর্যায়ে সমস্যা স্বীকার করা হলেও কার্যকর সমাধান পাওয়া যাচ্ছে না-এতে মানুষ হতাশ বলে অভিমত করছে শহরবাসী।
নগরবাসীর শঙ্কা ও অভিযোগ: স্থানীয়রা জানাচ্ছেন, মশার উপদ্রব এত বেড়েছে যে ঘর থেকে বের হওয়া কঠিন। শিশুরা সঠিকভাবে পড়াশোনা করতে পারছে না, ঘরের ভেতরেও মশারির ভিতর বসে থাকতে বাধ্য। কয়েক মাসে মশক নিধনের ওষুধ সামান্য দেওয়া হলেও তাতে কার্যকারিতা খুব কম-অল্প কিছু মরে আবার দ্রুত ফিরে আসে। অনেক এলাকায় মশার যন্ত্রণায় লোকজন রাতে ভালো ঘুমাতে পারছে না।
পুরান ঢাকা সূত্রাপুরের ব্যবসায়ী বলেছেন, নির্বাচনের আগে তার সন্তানের ডেঙ্গু হয়েছিল, এবং মশার কারণে ঘরেও মশারি টাঙিয়ে রাখতে হচ্ছে।
প্রশাসক ও করপোরেশনের পদক্ষেপ: দু’টি সিটি করপোরেশনও মশা বিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন-কিন্তু নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের মতে তা পর্যাপ্ত নয়। দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (উঝঈঈ) প্রশাসক এমডি আব্দুস সালাম ঘোষণা করেছেন আগামী তিন কার্যদিবসের জন্য একটি ১০ দিনের বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু হবে, যেখানে ‘শূন্য সহনশীলতা’ নীতিতে মশা নিধনের কাজ দ্রুত ও সঠিকভাবে সম্পন্ন করা হবে। তিনি মাঠ পর্যায়ে তদারকি বাড়াতে ও কর্মীদের দায়িত্ব পালন নিশ্চিত করতে এই উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, মশার উপদ্রব বেড়েছে তা অস্বীকার করা যাবে না এবং সরকার তা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে-বিশেষ করে ডিএসসিসি কর্তৃক ব্যবহৃত জীবাণুনাশকের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হচ্ছে, এবং যদি ওষুধ কার্যকর না হয় তবে বিকল্প ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
‘এ বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং দ্রুত কার্যকর ফলাফল আনব।’-মন্ত্রী আরো বলেন নাগরিকদের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা ও জলাবদ্ধতা দূর করার জন্য সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।
বাস্তবতা ও কারণ: বিশেষজ্ঞরা বলছেন শুধু ফগিং বা ছিটানোই যথেষ্ট নয়-বৃহত্তর পরিকল্পিত অভিযান, লার্ভা ধ্বংস, ড্রেন পরিষ্কার রাখা এবং নাগরিক সচেতনতা একত্রে প্রয়োজন। বেশ কিছু প্রতিবেদনে দেখা গেছে ঢাকা শহরজুড়ে আগের মতো নিয়মিত মশা নিধনে ওষুধ বিতরণ, নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার, জলাবদ্ধতা নির্মূল ইত্যাদি কার্যক্রম পর্যাপ্তভাবে হচ্ছে না। বিশেষ করে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির অভাবে তদারকি কমে গিয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। ঢাকা জনসাধারণের জন্য মশার এই উপদ্রব শুধু বিরক্তিকর নয়, বরং স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়ও হয়ে উঠছে-কারণ শুষ্ক ঋতুর শেষে এই উপদ্রব ক্রমেই বাড়ছে এবং ডেঙ্গুসহ অন্যান্য রোগের ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।
নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের আহ্বান: নাগরিকরা সরকার ও সিটি করপোরেশন থেকে দ্রুত কাঙ্ক্ষিত পদক্ষেপ চাইছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে-মশার লার্ভা জন্মাতে দেয়া যাবে না, ড্রেন, খোলা পানি, নির্মাণাধীন স্থানে পানি জমতে দিয়ে মশার সংখ্যা বৃদ্ধির পথ খোলা রাখা যাবে না। ‘এটা শুধু সিটি করপোরেশনের কাজ নয়-সবাইকে নিজেদের ঘর-বাড়ি পরিষ্কার রাখা বাধ্যতামূলক।’
নাগরিকদের ভোগান্তি দেখা যাচ্ছে শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্যান্য শহরেও-যেমন কুমিল্লার দাউদকান্দি পৌরসভার কিছু অংশেও মশার উপদ্রব বাড়ছে এবং রাসায়নিক স্প্রে ব্যবহারে সমস্যা দেখা দিয়েছে।
সানা/ডিসি/আপ্র/২৮/০২/২০২৬