সম্পত্তি দান করার পরও নিজের জীবদ্দশায় তা ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রেখে দেশে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনে নতুন বিধান যুক্ত হয়েছে। জাতীয় সংসদে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬’ পাস হওয়ার মাধ্যমে এ নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
নতুন আইনে ‘জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দান’ নামে একটি পৃথক পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে সম্পত্তির মালিকানা গ্রহীতার অনুকূলে হস্তান্তর হলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগদখল ও ব্যবহার করতে পারবেন।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে নতুন একটি দিগন্ত উন্মোচন করা হয়েছে। এ আইন হেবা, দান বা অন্য কোনো বৈধ পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করবে না।
তিনি বলেন, কেউ হেবা করতে চাইলে করতে পারবেন। অন্য আইনে সম্পত্তি হস্তান্তর করতে চাইলেও তাতে কোনো বাধা থাকবে না। নতুন বিধানটি হবে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি বিকল্প পদ্ধতি।
হেবা আইনে হস্তক্ষেপ নয়
ইসলামী আইনের সঙ্গে বৈপরীত্যের অভিযোগ নাকচ করে আইনমন্ত্রী বলেন, ইসলামি আইন বা হেবা আইনে হস্তক্ষেপ করা হয়নি। বরং হেবাকে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, একটি গোষ্ঠী বিষয়টি নিয়ে রাজনীতি করার চেষ্টা করছে।
দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত থাকবে ভোগাধিকার
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট একলাছ উদ্দিন ভূঁইয়া বলেন, সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) আইন, ২০২৬ একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। দেশের বিদ্যমান আইনি কাঠামোয় এটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, আইনের গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—বাবা-মা, দাদা-দাদি বা নানা-নানি, সন্তান-সন্ততি কিংবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করার পরও দাতা নিজের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার নিজের কাছে রাখতে পারবেন।
সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত সংশোধনী আইনটি যথাযথভাবে সর্বত্র প্রয়োগের প্রত্যাশা ব্যক্ত করে তিনি বলেন, সন্তানকে সম্পত্তি হস্তান্তরের পর পিতা-মাতার করুণ পরিণতির বহু ঘটনা দেখা গেছে। পিতা-মাতার প্রতি সন্তানদের অবজ্ঞারও বহু নজির রয়েছে।
কোন কোন সম্পর্কের মধ্যে দান করা যাবে
আইনের নতুন বিধান অনুযায়ী, দাতা নিজের জীবদ্দশায় সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার নিজের জন্য সংরক্ষণ করে স্থাবর বা অস্থাবর সম্পত্তি দান করতে পারবেন।
এই ধরনের দান করতে পারবেন—
* পিতা বা মাতা তার সন্তান বা সন্তানদের;
* দাদা-দাদি বা নানা-নানি তাদের নাতি বা নাতনিকে;
* সন্তান তার পিতা-মাতা বা দাদা-দাদিকে;
* নাতি-নাতনি তাদের দাদা-দাদি বা নানা-নানিকে;
* স্বামী ও স্ত্রী পরস্পরকে।
তবে স্থাবর সম্পত্তির ক্ষেত্রে এ বিধানের অধীনে ঘোষণা করে এবং নিবন্ধন আইন, ১৯০৮ অনুযায়ী নিবন্ধিত দলিল সম্পাদনের মাধ্যমে দান করতে হবে।
গ্রহীতা মারা গেলেও দাতার অধিকার থাকবে
দাতার জীবদ্দশায় গ্রহীতা মারা গেলে আইন অনুযায়ী সম্পত্তিটি গ্রহীতার উত্তরাধিকারীদের কাছে হস্তান্তরিত হবে। তবে সম্পত্তির ওপর দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার বহাল থাকবে এবং তা সম্পত্তির সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে।
অর্থাৎ, দানগ্রহীতা মারা গেলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ওই সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার হারাবেন না।
আইনে এই পদ্ধতিকে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি স্বতন্ত্র ধরন হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। ফলে প্রচলিত সাধারণ দান, হেবা বা অন্য কোনো বৈধ হস্তান্তর পদ্ধতির বৈধতা এতে সীমিত, ক্ষুণ্ন বা প্রভাবিত হবে না।
নিবন্ধনের পর দান বাতিলের সুযোগ
নতুন বিধান অনুযায়ী, এ ধরনের দান একবার নিবন্ধিত হয়ে গেলে সাধারণভাবে তা অপ্রত্যাহারযোগ্য হবে। তবে বিশেষ পরিস্থিতিতে দাতা ও গ্রহীতা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে দানের ফলে সৃষ্ট অধিকার পরিবর্তন, বাতিল বা অন্যভাবে ব্যবস্থাপনা করতে পারবেন।
এ ক্ষেত্রে আর্থিক, চিকিৎসাগত, শিক্ষাগত বা পারিবারিক প্রয়োজন কিংবা অন্য কোনো প্রকৃত ও যৌক্তিক প্রয়োজন বিবেচনায় নেওয়া যাবে।
কোনো পক্ষের সম্মতি নেওয়া সম্ভব না হলে—যেমন অপ্রাপ্তবয়স্ক, নিখোঁজ, মানসিকভাবে অক্ষম বা আইনগতভাবে অক্ষম হলে—অন্য পক্ষ জেলা জজের কাছে আবেদন করতে পারবেন।
জেলা জজ প্রয়োজনীয় শর্ত বিদ্যমান থাকলে এ ধরনের অধিকার পরিবর্তন, বাতিল বা অন্যভাবে ব্যবস্থাপনার অনুমতি দিতে পারবেন। তবে আদেশ দেওয়ার আগে সম্পত্তি বা সংশ্লিষ্ট অধিকারে স্বার্থ রয়েছে এমন ব্যক্তিদের নোটিশ দিতে হবে। প্রয়োজন মনে করলে যথাযথ তদন্ত বা অনুসন্ধান করতে হবে এবং আবেদনটি সৎ উদ্দেশ্যে করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হতে হবে।
প্রবীণদের নিরাপত্তায় নতুন বিধান
সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট ছিদ্দিক উল্লাহ মিয়া বলেন, নতুন আইনে সম্পত্তি হস্তান্তর বা দানের ক্ষেত্রে দাতার জীবনকালীন নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত হবে। দাতা জীবদ্দশায় সম্পত্তির পূর্ণ ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার নিজের কাছে অক্ষুণ্ন রেখেই পরবর্তী প্রজন্মের অনুকূলে মালিকানা হস্তান্তর করতে পারবেন।
তার মতে, সংশোধিত আইনটি সমাজের জন্য ইতিবাচক। এটি পিতা-মাতার প্রতি সন্তানদের দায়িত্ববোধ ও নৈতিকতা এবং পারিবারিক সম্পর্কের ভিত শক্ত করতে ভূমিকা রাখবে।
তিনি বলেন, পরিবারের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা এবং প্রবীণ বয়সে নিজের সামাজিক ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সংকটের একটি সুষম ও আইনি সমাধান দেবে এই বিধান।
৮ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত হয় আইন
জাতীয় সংসদে পাস ও রাষ্ট্রপতির সম্মতি লাভের পর গত ৮ সেপ্টেম্বর আইনটি সর্বসাধারণের জন্য প্রকাশ করা হয়। এটি ২০২৬ সালের ১০৫ নম্বর আইন। সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর অধিকতর সংশোধনের জন্য আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে।
প্রকাশিত গেজেটে বলা হয়েছে, সম্পত্তি হস্তান্তর আইন, ১৮৮২-এর অধীনে জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণপূর্বক দানের বিধান সুনির্দিষ্ট করা এবং ওই ভোগাধিকার সুরক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিধান প্রণয়ন করা প্রয়োজন। আইনটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন বিধানটি পারিবারিক সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি প্রবীণদের আত্মমর্যাদা এবং আর্থ-সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
এসি/আপ্র/০৩/১০/২০২৬