মার্কিন কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে কাজ করতে ‘অত্যন্ত আগ্রহী’, দ্রুত বাস্তবায়ন দেখাতে পারলে প্রস্তাব সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে
নিজস্ব প্রতিবেদক: দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের মধ্যে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা ভাসমান এলএনজি সংরক্ষণ ও গ্যাসে রূপান্তর ইউনিট স্থাপনে বিনিয়োগে আগ্রহ দেখিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এ ধরনের বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন।
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) ঢাকার মতিঝিলে এফবিসিসিআই কার্যালয়ে বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠকে এ আগ্রহের কথা জানান মার্কিন রাষ্ট্রদূত। বৈঠক শেষে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বৈঠকে ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন বলেন, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ বজায় রাখা হলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা আরো সুদৃঢ় হবে। বাংলাদেশে কাজ করতে মার্কিন কোম্পানিগুলো অত্যন্ত আগ্রহী উল্লেখ করে তিনি এসব কোম্পানিকে উন্মুক্ত প্রতিযোগিতার সুযোগ দেওয়ার ওপর জোর দেন।
জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির বলেন, দ্রুততম সময়ে ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ এবং সরবরাহের সক্ষমতা দেখাতে পারলে মার্কিন কোম্পানিগুলোর প্রস্তাব সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। স্বল্প সময়ে কার্যকর এলএনজি সরবরাহ পরিকল্পনা উপস্থাপন করতে পারলে প্রতিযোগিতায় তাদের অবস্থান আরো শক্তিশালী হবে।
গ্যাস সংকটে নতুন টার্মিনালের পরিকল্পনা: সমুদ্রপথে আনা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস গ্রহণ ও সংরক্ষণ করা হয় ভাসমান টার্মিনালে। সেখানে এলএনজিকে আবার গ্যাসে রূপান্তর করে পাইপলাইনের মাধ্যমে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হয়।
দেশে বর্তমানে মহেশখালীতে দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল রয়েছে। এর একটি এক্সিলারেট এনার্জির এবং অন্যটি সামিট এলএনজি টার্মিনাল। তাদের দৈনিক গ্যাস সরবরাহ সক্ষমতা যথাক্রমে ৬০০ ও ৫০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
দেশে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে দিনে প্রায় ২ হাজার ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্র থেকে পাওয়া যায় প্রায় ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৬৫০ মিলিয়ন ঘনফুট। আমদানি করা এলএনজি থেকে আসে প্রায় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট।
ফলে কোনো ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ বা বিকল হলে দেশের সার্বিক গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।
সবশেষ গত ২১ জুলাই এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনালের বৈদ্যুতিক ক্যাবলে আগুন লেগে সেটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে ওই টার্মিনাল থেকে দৈনিক প্রায় ৪৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দুই সপ্তাহের বেশি সময় পর ৬ আগস্ট টার্মিনালটি আংশিক চালু হয়। পরে কারিগরি সমস্যা ও কার্গোর স্বল্পতার কারণে সেখানকার গ্যাস সরবরাহ কয়েক দফা ওঠানামা করে।
এ পরিস্থিতিতে বাসাবাড়ির পাশাপাশি শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সরকারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে। সংকট মোকাবিলায় ২০২৯ সালের মধ্যে আরো তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের পরিকল্পনা করেছে সরকার।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, এ জন্য পায়রা, মোংলা ও হিরনপয়েন্টে টার্মিনাল স্থাপনের সম্ভাব্যতা যাচাই করা হচ্ছে। পাশাপাশি বিনিয়োগকারীও খোঁজা হচ্ছে।
চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাবে বাড়তি ব্যয়ের শঙ্কা: এর মধ্যে তৃতীয় এলএনজি টার্মিনাল স্থাপনের কাজ চীনের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার খবরও প্রকাশ হয়েছে। তবে এ প্রকল্পে বর্তমানে গ্যাস গ্রহণের জন্য যে ব্যয় হচ্ছে, তার তুলনায় ৩৫ থেকে ৩৭ শতাংশ বেশি দিতে হবে বলে জানা গেছে।
গত ১৯ জুন চায়না ন্যাশনাল এনার্জি ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি মহেশখালীর কুতুবজোমে একটি সমুদ্রভিত্তিক এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব দেয়। এতে দৈনিক ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পুনঃরূপান্তরের সক্ষমতা এবং সর্বোচ্চ ৭৫০ মিলিয়ন ঘনফুট সক্ষমতা ধরা হয়েছে।
খবর অনুযায়ী, ১৫ বছরের চুক্তির আওতায় টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য প্রতিষ্ঠানটি প্রতিদিন ৩ লাখ ৪২ হাজার ডলার নেবে। বর্তমানে এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান টার্মিনালের জন্য সরকারের দৈনিক ব্যয় ২ লাখ ৫৪ হাজার ডলার এবং সামিট এলএনজি টার্মিনালের জন্য ২ লাখ ৪৯ হাজার ১১৫ ডলার।
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৩ বছরে ১১৭ এলএনজি কার্গো: বৈঠকে বাংলাদেশে মার্কিন বিনিয়োগ বৃদ্ধি, বড় অবকাঠামো প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা, বাণিজ্য পরিবেশ সহজ করা, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং জ্বালানি খাতে অংশীদারত্ব নিয়েও আলোচনা হয়। বাংলাদেশ ২০২৬ থেকে ২০৩৮ সাল পর্যন্ত ১৩ বছরে যুক্তরাষ্ট্র থেকে মোট ১১৭টি এলএনজি কার্গো বা জাহাজভর্তি এলএনজি আমদানির সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আন্তর্জাতিক এলএনজি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান গানভর ইউএসএ এলএলসির সঙ্গে এ-সংক্রান্ত চুক্তিকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে অভিহিত করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট টি ক্রিস্টেনসেন।
আমদানি নীতি আরো ব্যবসাবান্ধব করার তাগিদ: বৈঠকে বাংলাদেশের আমদানি নীতি নিয়েও আলোচনা হয়। নতুন আমদানি নীতিতে বেশ কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে বলে প্রশংসা করেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। তবে কিছু ধারা আরো ব্যবসাবান্ধব করা সম্ভব বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, আমদানি নীতি একটি চলমান প্রক্রিয়া। বাজার ও অর্থনীতির বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রয়োজনীয় সংস্কার কার্যক্রম নিয়মিত পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
কৌশলগত সরঞ্জাম কেনার ক্ষেত্রে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের জন্য স্থানীয় এজেন্ট নিয়োগের পুরোনো বাধ্যবাধকতা বাতিলের বিষয়টিও রাষ্ট্রদূতের কাছে তুলে ধরেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, সরাসরি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কাজের সুযোগ তৈরি হওয়ায় ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ফিরেছে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ হয়েছে। সরকার প্রতিটি ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে কাজ করছে।
বৈঠকে শিল্পসচিব আব্দুন নাসের খান, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মো. মুস্তাফিজুর রহমান এবং মার্কিন দূতাবাসের অর্থনৈতিক প্রধান অ্যাঞ্জেলো পালাজ্জেলো উপস্থিত ছিলেন।
সানা/ডিসি/আপ্র/৭/৯/২০২৬