একসময় বিকেল হলেই পাড়া-মহল্লার মাঠে ছুটে যেত শিশুরা। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, দৌড়ঝাঁপ আর বাইরে ঘোরাঘুরিতেই কাটত তাদের অবসর। এখন সেই জায়গা অনেকটাই দখল করেছে মুঠোফোন, ল্যাপটপ ও টেলিভিশনের পর্দা। বিনোদন কিংবা অবসর কাটাতে অনেক শিশু ঘণ্টার পর ঘণ্টা পর্দার সামনে বসে থাকছে। ফলে কমছে শারীরিক সক্রিয়তা, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, পর্যাপ্ত শারীরিক সক্রিয়তার অভাব ও অতিরিক্ত পর্দানির্ভরতা শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে। নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ না পেলে ওজন বৃদ্ধি, ঘুমের সমস্যা ও সামাজিক দক্ষতা বিকাশে প্রতিবন্ধকতাসহ নানা ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
খেলাধুলার অভাবে বাড়তে পারে স্থূলতার ঝুঁকি
খেলাধুলা শুধু শিশুর মন ভালো রাখে না, শরীরের স্বাভাবিক গঠন ও বিকাশেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দৌড়ানো, লাফানো ও বিভিন্ন খেলায় অংশ নেওয়ার ফলে পেশি সক্রিয় থাকে এবং শরীরের নড়াচড়া বাড়ে। পাশাপাশি বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা করলে পারস্পরিক যোগাযোগ, সহযোগিতা ও দলগতভাবে কাজ করার অভ্যাস তৈরি হয়।
কিন্তু দীর্ঘ সময় বসে থাকা এবং বাইরে খেলাধুলার সুযোগ কমে যাওয়ায় শিশুদের দৈনন্দিন শারীরিক সক্রিয়তা হ্রাস পাচ্ছে। এর সঙ্গে উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার, চকলেট কিংবা অতিরিক্ত চিনিযুক্ত খাবার গ্রহণের অভ্যাস যুক্ত হলে ওজন বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। শারীরিক পরিশ্রম কম অথচ ক্যালরি গ্রহণ বেশি হলে অল্প বয়সেই স্থূলতা দেখা দিতে পারে।
রোদ-বাতাসের অভাবে হতে পারে পুষ্টির ঘাটতি
শিশুর সুস্থভাবে বেড়ে ওঠার জন্য পড়াশোনার পাশাপাশি সুষম খাবার ও পর্যাপ্ত শারীরিক সক্রিয়তা প্রয়োজন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে বয়ঃসন্ধিকালীন বিপুলসংখ্যক ছেলে-মেয়ে পর্যাপ্ত শারীরিক কার্যক্রমে অংশ নেয় না।
বাইরে খেলাধুলা কিংবা হাঁটাহাঁটির সুযোগ কমে গেলে সূর্যালোকের সংস্পর্শও কমে যায়। এতে শরীরে ভিটামিন ডি তৈরির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। অন্যদিকে, নিয়মিত অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের অভ্যাস থাকলে আয়রন, ক্যালসিয়ামসহ প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ঘুম ও মস্তিষ্কের বিকাশেও প্রভাব
দিনের বড় একটি সময় ঘরের মধ্যে বসে মুঠোফোন, টেলিভিশন কিংবা ল্যাপটপের পর্দায় কাটালে শিশুর শারীরিক নড়াচড়া কমে যায়। অথচ দিনের বেলায় খেলাধুলা ও অন্যান্য সক্রিয় কাজে অংশ নিলে শরীরের প্রয়োজনীয় পরিশ্রম হয়। এতে রাতে স্বাভাবিকভাবে ঘুম আসতেও সুবিধা হতে পারে।
অন্যদিকে, দীর্ঘ সময় পর্দার সামনে বসে থাকার অভ্যাস ঘুমের স্বাভাবিক ছন্দে প্রভাব ফেলতে পারে। পর্যাপ্ত শারীরিক সক্রিয়তার অভাব ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস দীর্ঘ মেয়াদে শিশুর সামগ্রিক সুস্থতার জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
শুধু পড়াশোনা নয়, খেলাধুলাও জরুরি
অনেক অভিভাবক মনে করেন, সন্তানকে যত বেশি সময় পড়তে বসানো যাবে, তার ফলাফল তত ভালো হবে। কিন্তু শিশুর সামগ্রিক বিকাশে খেলাধুলারও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
খেলার সময় শিশুরা পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে, সমস্যা সমাধান করতে, অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ করতে এবং স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে শেখে। পাশাপাশি দলগত খেলাধুলার মাধ্যমে সহযোগিতা ও সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ পায়। তাই পড়াশোনার পাশাপাশি প্রতিদিন খেলাধুলার জন্যও নির্দিষ্ট সময় রাখা প্রয়োজন।
ঘরেও তৈরি করা যায় খেলাধুলার সুযোগ
সন্তানকে প্রতিদিন কিছুটা সময় বাইরে হাঁটাহাঁটি কিংবা খেলাধুলার সুযোগ করে দেওয়া উচিত। পার্ক বা মাঠে যাওয়া সম্ভব না হলে নিরাপদ জায়গায় হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা ছাদে সক্রিয় থাকার ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
বাড়িতেও বয়স উপযোগী শারীরিক খেলার ব্যবস্থা রাখা সম্ভব। রিং ধরে ঝোলা, ছোট মই বেয়ে ওঠা কিংবা নড়াচড়ার প্রয়োজন হয়—এমন নিরাপদ খেলনা শিশুকে সক্রিয় রাখতে সাহায্য করতে পারে।
বড়রা নিজেরা যোগব্যায়াম কিংবা শরীরচর্চা করলে শিশুরাও তাতে উৎসাহ পেতে পারে। এমনকি বয়স অনুযায়ী ঘরের ছোটখাটো কাজেও তাদের যুক্ত করা যেতে পারে।
সন্তানের আগ্রহ অনুযায়ী ক্রিকেট, ফুটবল, সাঁতার, কারাতে, টেনিস কিংবা অন্য কোনো খেলাধুলার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা যেতে পারে।
শিশুর শৈশব যেন শুধু মুঠোফোন কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় আটকে না থাকে, সেদিকে অভিভাবকদের নজর দেওয়া জরুরি। খেলাধুলা, বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশা এবং নিয়মিত শারীরিক সক্রিয়তার মধ্য দিয়েই শিশুর সুস্থ ও প্রাণবন্ত বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
সূত্র: কেয়ারিং ফর চিলড্রেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও আমেরিকান লাইব্রেরি অব মেডিসিন।
এসি/আপ্র/২৬/৯/২০২৬