টানা কয়েক সপ্তাহের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, চরম উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হুমকি ও সামরিক হামলার পর অবশেষে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দুই সপ্তাহের একটি সাময়িক যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে। মঙ্গলবার (৭ এপ্রিল) মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই ঘোষণা দেন। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শেষ মুহূর্তে অর্জিত এই সমঝোতা বিশ্বজুড়ে তাৎক্ষণিক স্বস্তি এনে দিলেও স্থায়ী শান্তির পথ এখনো অনিশ্চয়তায় ঘেরা।
হরমুজ প্রণালি খুলে স্বস্তি, কমলো তেলের দাম: যুদ্ধবিরতির আওতায় ইরান কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই সংকীর্ণ জলপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় যে বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছিল, তার প্রভাব ইতোমধ্যে কমতে শুরু করেছে। যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৫ ডলারের বেশি কমে প্রায় ৯৩ ডলারে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে এশিয়া ও ইউরোপজুড়ে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের উত্থান দেখা গেছে।
ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনা, জটিল ইস্যুর সমাধান খোঁজা: এই যুদ্ধবিরতির ভিত্তিতে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে আগামী শুক্রবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দুই পক্ষের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। আলোচনায় হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার মতো জটিল বিষয়গুলো প্রাধান্য পাবে। পাকিস্তানের নেতৃত্বে এই মধ্যস্থতায় পর্দার আড়াল থেকে চীনের সম্পৃক্ততার কথাও জানা গেছে।
চরম হুমকি থেকে শেষ মুহূর্তের সমঝোতা: যুদ্ধবিরতির আগে পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত উত্তেজনাপূর্ণ। নির্ধারিত সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ট্রাম্প ইরানকে সতর্ক করেছিলেন-চুক্তিতে না এলে “এক রাতেই একটি সভ্যতা ধ্বংস” করে দেওয়া হবে। সময়সীমা শেষ হওয়ার মাত্র দেড় ঘণ্টা আগে এই যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আসে। এর আগে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার প্রস্তুতি নেয়, অন্যদিকে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ রেখে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ অচল করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেয়।
প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংসে বিপর্যস্ত ইরান: সংঘাত চলাকালে ইরানের খার্ক দ্বীপসহ গুরুত্বপূর্ণ তেল স্থাপনায় হামলা চালানো হয়। তাবরিজ, কাশান, কারাজ, কোম ও আহওয়াজসহ বিভিন্ন এলাকায় সেতু, রেললাইন ও যোগাযোগ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানবাধিকার সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই সংঘাতে সাড়ে তিন হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত এক হাজার ছয়শ পঁয়ষট্টি জন বেসামরিক নাগরিক।
ইরাক খুললো আকাশপথ, লেবাননে উত্তেজনা অব্যাহত: যুদ্ধবিরতির পর ইরাক নিজেদের আকাশসীমা ও বিমানবন্দর খুলে দিয়েছে। তবে লেবানন পরিস্থিতি এখনো অস্থির। ইসরায়েল জানিয়েছে, যুদ্ধবিরতি ইরানে কার্যকর হলেও লেবাননে তাদের সামরিক অভিযান চলবে। ইতোমধ্যে সেখানে হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। যদিও হিজবুল্লাহ যুদ্ধবিরতিতে সম্মতি জানিয়ে সাময়িকভাবে হামলা বন্ধ রেখেছে।
বিজয় দেখছে দুই পক্ষই: যুদ্ধবিরতি নিয়ে দুই পক্ষের অবস্থান একেবারেই ভিন্ন। ট্রাম্প প্রশাসন একে কৌশলগত সাফল্য হিসেবে দেখাচ্ছে এবং দাবি করছে, যুক্তরাষ্ট্র তার সামরিক লক্ষ্য অর্জন করেছে। অন্যদিকে ইরান বলছে, তাদের ১০ দফা পরিকল্পনা মেনে নিতে যুক্তরাষ্ট্র বাধ্য হয়েছে। এই পরিকল্পনায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
হাত এখনও ট্রিগারে’-ইরানের কড়া বার্তা: ইরান স্পষ্ট করে জানিয়েছে, এই যুদ্ধবিরতি চূড়ান্ত নয়। তাদের ভাষায়, এটি কেবল একটি সাময়িক সুযোগ। দাবি পূরণ না হলে তারা পুনরায় যুদ্ধে ফিরবে। এমনকি তারা সতর্ক করে বলেছে-“আমাদের হাত এখনও বন্দুকের ট্রিগারে রয়েছে।”
বিশ্বের স্বস্তি, তবে সতর্কতা অব্যাহত: জাতিসংঘসহ জাপান, অস্ট্রেলিয়া, মিশর, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশ এই যুদ্ধবিরতিকে স্বাগত জানিয়েছে। তারা সবাই একে ইতিবাচক সুযোগ হিসেবে দেখলেও সতর্ক করেছে-এই সময়কে কাজে লাগিয়ে স্থায়ী সমাধানে পৌঁছাতে না পারলে পরিস্থিতি আবারো ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারে।
অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ, নজর ইসলামাবাদ আলোচনায়: বিশ্লেষকদের মতে, এই যুদ্ধবিরতি মূলত একটি কৌশলগত বিরতি। হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, পারস্পরিক অবিশ্বাস ও আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য-সব মিলিয়ে পরিস্থিতি এখনো ভঙ্গুর। ফলে ইসলামাবাদের আলোচনাই নির্ধারণ করবে, এই সাময়িক বিরতি স্থায়ী শান্তির পথে রূপ নেবে, নাকি এটি আরো বড় সংঘাতের আগে এক ক্ষণিকের অবকাশ হয়ে থাকবে।
সানা/আপ্র/৮/৪/২০২৬