যুদ্ধের নবম দিনে ইরানের তেল ও জ্বালানি স্থাপনাকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল। রাজধানী তেহরান ও এর পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি তেল ডিপো ও শোধনাগারে দফায় দফায় হামলার পর ভয়াবহ আগুনে রাতের আকাশ রক্তাভ হয়ে ওঠে। নালায় ছড়িয়ে পড়া তেলে আগুন ধরে সড়কের পাশে সৃষ্টি হয় ‘আগুনের নদী’। এসব হামলায় অন্তত ৪১ জন নিহত হয়েছেন। দিনের বেলায় তেহরানের আকাশ ছিল ঘন ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন।
যুদ্ধের নতুন লক্ষ্য জ্বালানি খাত
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলা শুরু হলে প্রথম দিকে লক্ষ্য ছিল সামরিক স্থাপনা ও শীর্ষ নেতৃত্ব। তবে রোববার প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে দেশটির তেল ও জ্বালানি স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়।
তেহরান ও আলবোরজ প্রদেশের কারাজ শহরে একাধিক তেল ডিপোতে হামলার কথা জানিয়েছে ইরানের তেল মন্ত্রণালয়। হামলার পর ভয়াবহ আগুনে চারদিকে দিনের মতো আলোর সৃষ্টি হয়।
‘মনে হচ্ছিল কিয়ামত শুরু হয়েছে’
তেহরানের শাহরান তেল ডিপোতে হামলার পরের ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে দেখা যায়, বিধ্বস্ত ডিপো থেকে তেল নালায় ছড়িয়ে পড়ে আগুন ধরে সড়কের পাশে ‘আগুনের নদী’ তৈরি হয়েছে।
তেহরানের এক বাসিন্দা সিএনএনকে বলেন,
“গত রাতে যে বিস্ফোরণ দেখেছি, জীবনে এমন কিছু দেখিনি। মনে হচ্ছিল যেন কিয়ামত শুরু হয়েছে।”
বিষাক্ত বৃষ্টির সতর্কতা
তেল স্থাপনায় হামলার পর বিষাক্ত বৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছে ইরানের রেড ক্রিসেন্ট। এতে ত্বক ও ফুসফুস ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিকদের ঘরের ভেতরে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জ্বালানি সরবরাহে চাপ পড়ায় তেহরান প্রশাসন প্রতিদিন একজনের তেল নেওয়ার সীমা ৩০ লিটার থেকে কমিয়ে ২০ লিটার করেছে।
পাল্টা হামলায় মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ
হামলার জবাবে ইরান সৌদি আরব, কুয়েত ও জর্ডানে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে।
সৌদি আরবের আল-খার্জ গভর্নরেটের একটি কম্পাউন্ডে ক্ষেপণাস্ত্র আঘাতে এক বাংলাদেশি ও এক ভারতীয় নিহত হন।
কুয়েতে বিমানবন্দর, জ্বালানি ডিপো ও নিরাপত্তা ভবনে হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন।
পরিস্থিতির কারণে কুয়েত তেল উৎপাদন কমানোর ঘোষণা দিয়েছে।
এ ছাড়া ইরান তেল আবিব ও হাইফাসহ ইসরায়েলের কয়েকটি শহরে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায়। এতে তিনজন আহত হয়েছেন। বাহরাইনে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার সময় ধ্বংসাবশেষ পড়ে তিনজন আহত হন।
লেবাননেও তীব্র সংঘাত
ইসরায়েল লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলেও হামলা চালাচ্ছে। ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে সংঘর্ষে দুই ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়েছে।
অন্যদিকে লেবাননের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ইসরায়েলের হামলায় এখন পর্যন্ত ৮৩ শিশুসহ ৩৯৪ জন নিহত হয়েছেন এবং আহত হয়েছেন ১ হাজার ১৩০ জন।
ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি, ইরানের প্রতিরোধের ঘোষণা
ইরানে বেসামরিক স্থাপনায় হামলার পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, এমন সময় আসবে যখন ইরানে ‘আত্মসমর্পণ করছি’ বলার মতো কেউ থাকবে না।
অন্যদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, হামলার বিরুদ্ধে দৃঢ় প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে এবং কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি প্রথম দিনের হামলাতেই নিহত হয়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে। নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করেছে দেশটির অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্ট।
ইসরায়েলের দাবি: ৩,৪০০ হামলা
ইসরায়েলের সামরিক বাহিনীর মুখপাত্র এফি ডেফরিন জানিয়েছেন, এখন পর্যন্ত ইরানে প্রায় ৩ হাজার ৪০০টি হামলা চালানো হয়েছে এবং দেশটির ১৫০টির বেশি আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করা হয়েছে।
আইআরজিসির দাবি: মূল লক্ষ্য যুক্তরাষ্ট্র
ইরানের ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তাদের চালানো হামলার ৬০ শতাংশ যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও কৌশলগত স্বার্থ লক্ষ্য করে এবং ৪০ শতাংশ ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে।
আইআরজিসির মুখপাত্র আলী মোহাম্মদ নায়েনি বলেন,
“আমরা এ যুদ্ধে আমেরিকানদের প্রধান শত্রু মনে করি।”
তিনি সতর্ক করে বলেন, তেল স্থাপনায় হামলা অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থসংশ্লিষ্ট জ্বালানি স্থাপনাগুলোও লক্ষ্যবস্তু করা হবে।
যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়েছে ১২ দেশে
চলমান সংঘাত ইতিমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ১২টি দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। ইরানের বাইরে এসব দেশে অন্তত ৩৩ জন নিহত হয়েছেন।
গত শুক্রবার ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছিল, দেশটিতে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৩৩২। রোববারের হামলায় আরও ৪১ জন নিহত হওয়ায় মোট সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৭৩।
যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যা
যুদ্ধ শুরু: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ইরানে মোট নিহত: ১,৩৭৩ জন
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশে নিহত: ৩৩ জন
ইসরায়েলে নিহত: ১১ জন
ইরানে ইসরায়েলের হামলা: ৩,৪০০+
ধ্বংস করা আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা: ১৫০+
যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান চীনের
চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেছেন, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা চালানো উচিত হয়নি। তিনি অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ করে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানান।
তার ভাষায়,
“শক্তির অধিকারী হওয়া মানেই শক্তিশালী যুক্তি নয়। বিশ্ব আবার ‘জোর যার মুল্লুক তার’ যুগে ফিরে যেতে পারে না।”
সানা/আপ্র/৯/৩/২০২৬