দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এই প্রথম কোনো মার্কিন সাবমেরিন থেকে নিক্ষিপ্ত টর্পেডোর আঘাতে একটি যুদ্ধজাহাজ ধ্বংস হয়েছে। শ্রীলঙ্কার কাছাকাছি ভারত মহাসাগরে গত বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ইরানের যুদ্ধজাহাজ ‘আইআরআইএস ডেনা’ ডুবে যায়।
পেন্টাগনের প্রকাশিত একটি ভিডিওতে দেখা যায়, জাহাজটির পেছনের অংশে টর্পেডো আঘাত হানার সঙ্গে সঙ্গে বিশাল জলরাশি আকাশে ছিটকে ওঠে এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই জাহাজটির কাঠামো দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়।
‘নীরব মৃত্যু’ বললেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী
মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এক ব্রিফিংয়ে এই হামলাকে ‘নীরব মৃত্যু’ বলে অভিহিত করেছেন।
জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেন, ব্যবহৃত টর্পেডোটি তাৎক্ষণিক বিধ্বংসী প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছে।
শ্রীলঙ্কার কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ডুবে যাওয়া জাহাজ থেকে ৩২ জন ইরানি নাবিককে উদ্ধার করা হয়েছে। জাহাজটিতে মোট প্রায় ১৮০ জন ক্রু ছিলেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
মার্ক–৪৮ টর্পেডো: আধুনিক নৌযুদ্ধের ভয়ংকর অস্ত্র
ইরানি যুদ্ধজাহাজটি ডোবাতে ব্যবহৃত হয়েছে মার্ক–৪৮ হেভিওয়েট টর্পেডো। প্রথম অন্তর্ভুক্ত হয় ১৯৭২ সালে। ওজন প্রায় ৩,৮০০ পাউন্ড। সোনার প্রযুক্তির মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তু শনাক্ত করে। জাহাজের নিচে গিয়ে বিস্ফোরিত হয় এই বিস্ফোরণে সৃষ্ট গ্যাসের বুদ্বুদ জাহাজের মূল কাঠামো ভেঙে দেয়। ফলে জাহাজটি দ্রুত দুই টুকরো হয়ে ডুবে যায়।
১৯৪৫ সালের পর প্রথম টর্পেডো হামলা
মার্কিন নৌবাহিনীর ইতিহাস অনুযায়ী, সর্বশেষ ১৯৪৫ সালের ১৪ আগস্ট মার্কিন সাবমেরিন ইউএসএস টর্স্ক থেকে শত্রুপক্ষের জাহাজে টর্পেডো ছোড়া হয়েছিল। সেই হামলায় জাপানের একটি ৭৫০ টনের জাহাজ ডুবে যায়।
এরপর স্নায়ুযুদ্ধসহ দীর্ঘ সময় ধরে মার্কিন সাবমেরিনগুলো মূলত গোয়েন্দা অভিযান ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ব্যবহৃত হলেও সরাসরি জাহাজ ডোবাতে টর্পেডো ব্যবহার করা হয়নি।
সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলার দীর্ঘ ইতিহাস
যদিও টর্পেডো ব্যবহারের ঘটনা বিরল, তবে বিভিন্ন যুদ্ধে মার্কিন সাবমেরিন থেকে নিয়মিত টমাহক ক্রুজ মিসাইল ছোড়া হয়েছে।
এসব হামলার মধ্যে রয়েছে—
১৯৯১ সালের অপারেশন ডেজার্ট স্টর্ম
ইরাক যুদ্ধ
আফগানিস্তান অভিযান
লিবিয়া ও সোমালিয়া অভিযান
ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে হামলা
ইরানের ইস্পাহানের পারমাণবিক স্থাপনায় আঘাত
ট্রাম্প: ইরানে স্থল সেনা পাঠানো এখন ‘সময়ের অপচয়’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে স্থল সেনা পাঠানোর বিষয়টি বর্তমানে ‘সময়ের অপচয়’। এনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,
“ইরান সবকিছু হারিয়েছে—তাদের নৌবাহিনী প্রায় শেষ।” এর আগে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সতর্ক করে বলেন, বিদেশি সেনা মোতায়েন করা হলে তা ‘দখলদারদের জন্য বিপর্যয়’ ডেকে আনবে।
তেল আবিবে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা
ইসরায়েলের বাণিজ্যিক কেন্দ্র তেল আবিব লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের সম্মিলিত হামলা চালিয়েছে ইরানের বিপ্লবী গার্ড আইআরজিসি।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, হামলায় একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র শহরের দিকে ধেয়ে যায়।
ইরানে স্কুলে হামলা: যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততার সন্দেহ
দক্ষিণ ইরানের মিনাব শহরের একটি বালিকা বিদ্যালয়ে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ১৬৫ শিক্ষার্থী নিহত হওয়ার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে বলে সন্দেহ করছেন মার্কিন তদন্তকারীরা।
জাতিসংঘে ইরানের রাষ্ট্রদূত জানান, হামলার পর নিহত শিক্ষার্থীদের জন্য গণজানাজা ও শোক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী স্কুল বা হাসপাতালের মতো বেসামরিক স্থাপনায় ইচ্ছাকৃত হামলা যুদ্ধাপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা, জ্বালানি বাজারে চাপ
চলমান সংঘাতের কারণে হরমুজ প্রণালি এলাকায় শত শত জাহাজ আটকে পড়েছে। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই জলপথ দিয়ে পরিবহন হয়।
জ্বালানি পরিবহন স্বাভাবিক রাখতে ইরানের সঙ্গে আলোচনায় বসেছে চীন।
বিশ্লেষকদের মতে, পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
সানা/আপ্র/৬/৩/২০২৬