যুদ্ধ এখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। এর সূচনা গত শনিবার ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্য দিয়ে। এরপর সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, লেবাননসহ ওই অঞ্চলের কয়েকটি দেশে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। শুরুতে এসব দেশের মার্কিন ঘাঁটিতে হামলা হলেও এখন বেসামরিক স্থাপনাও আক্রান্ত হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় তেহরানে নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশটির শীর্ষপর্যায়ের কয়েকজন কর্মকর্তা। শুধু ইরানে নিহত হয়েছেন ৬ শতাধিক মানুষ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, এ যুদ্ধ চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ চলতে পারে। প্রয়োজনে ইরানে স্থল অভিযান চালানোর হুমকিও দিয়েছেন তিনি।
ইসরায়েল, যুক্তরাষ্ট্র, ইরান সরাসরি যুদ্ধে রয়েছে। এখন দেখে নেওয়া যাক, কোন দেশ কার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে, কোন রাষ্ট্রনেতা চলমান যুদ্ধের বিষয়ে কী বলেছেন-
যুক্তরাজ্য: যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র যুক্তরাজ্য। এর আগে ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনীর সঙ্গে যুক্তরাজ্যও হামলায় শরিক হয়েছিল। তবে এবার এমনটা এখনো দেখা যায়নি। যুক্তরাজ্য সরকার বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তারা আঞ্চলিক যুদ্ধ দেখতে চায় না। যুক্তরাজ্য সরকারের একজন মুখপাত্র বলেছেন, ‘ইরানকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া উচিত নয়। আর এ কারণে আমরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর প্রচেষ্টাকে ক্রমাগত সমর্থন করে আসছি।’
হামলায় অংশ না নিলেও কাতারে আল–উবেইদ বিমানঘাঁটির সুরক্ষায় আরএএফ টাইফুন মোতায়েন করেছেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। তবে তিনি বলেছেন, ব্রিটিশ বাহিনী ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেবে না। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, রোববার কাতারের দিকে এগোতে থাকা একটি ইরানি ড্রোন ধ্বংস করেছে ব্রিটিশ যুদ্ধবিমান। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মধ্যে এটিই ব্রিটিশ বাহিনীর প্রথম অংশগ্রহণ।
রাশিয়া: ইরানের মিত্র হিসেবে পরিচিত রাশিয়া। দেশটি ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় টেলিগ্রামে পোস্ট করা এক বিবৃতিতে এ হামলাকে জাতিসংঘভুক্ত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের বিরুদ্ধে ‘পূর্বপরিকল্পিত সশস্ত্র আগ্রাসন’ বলে আখ্যায়িত করা হয়। রাশিয়া সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, এ হামলা মধ্যপ্রাচ্যে ‘মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয়’ ডেকে আনতে পারে। আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডকে নিন্দনীয় উল্লেখ করে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন বলেছেন, এ হত্যাকাণ্ড মানবিক নৈতিকতা এবং আন্তর্জাতিক আইনের সব মানদণ্ড লঙ্ঘন করেছে।
চীন: তেল-বাণিজ্যের দিক থেকে ইরানের ঘনিষ্ঠ চীনের অবস্থান নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পোস্ট দিয়ে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র বলেন, ইরানের ‘সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি অবশ্যই শ্রদ্ধা জানাতে হবে’। অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং। এক বিবৃতিতে সংলাপ ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরুর মধ্য দিয়ে দ্রুত উত্তেজনা কমিয়ে আনা এবং মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার আহ্বান জানিয়েছে চীন।
ফ্রান্স: জার্মানি ও যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে একটি যৌথ বিবৃতি দিয়েছেন ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ। তিনি বলেছেন, এ উত্তেজনা ‘সবার জন্য বিপদের কারণ’ হতে পারে। এটা আর বাড়তে দেওয়া যায় না।
এক্সে দেওয়া পোস্টে ফরাসি রাষ্ট্রপ্রধান আরো বলেন, ‘ইরানের শাসকদের বুঝতে হবে যে তাঁদের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী কর্মকাণ্ড বন্ধ করার জন্য সদিচ্ছার সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। মধ্যপ্রাচ্যে সব পক্ষের নিরাপত্তার জন্য এটা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়।’
ইউরোপীয় ইউনিয়ন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউরোপীয় কমিশনের প্রধান উরসুলা ভন ডার লেন বিবদমান সব পক্ষকে ‘সর্বোচ্চ সংযম’ পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, বেসামরিক মানুষদের রক্ষা করতে আন্তর্জাতিক আইন মেনে চলা জরুরি। ইইউ কমিশনের প্রধান বিবৃতিতে বলেন, আলোচনার মাধ্যমে ইরানের পারমাণবিক আর ব্যালিস্টিক কর্মসূচি মোকাবিলার লক্ষ্যে ধারাবাহিকভাবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হয়েছে।
কানাডা: এক্সে পোস্ট করা এক বিবৃতিতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নি বলেছেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে এবং দেশটির শাসনকাঠামোর আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য আরো হুমকি হয়ে ওঠা ঠেকাতে নেওয়া পদক্ষেপে তাঁর দেশ যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন দেবে। বিবৃতিতে কানাডা নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে বলেছে, ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ‘অস্থিতিশীলতা ও সন্ত্রাসের প্রধান উৎস’। বিশ্বের সবচেয়ে খারাপ মানবাধিকার রেকর্ডগুলোর মধ্যে একটি ইরান। দেশটিকে কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন বা বিকাশের অনুমতি দেওয়া উচিত হবে না।
অস্ট্রেলিয়া: অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপে দেশটির সমর্থন রয়েছে। এক্সে পোস্ট করা বিবৃতিতে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ বলেন, ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন থেকে বিরত রাখতে এবং আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে ওঠা ঠেকাতে এই সামরিক পদক্ষেপের পক্ষে রয়েছে অস্ট্রেলিয়া। তবে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে মিলে ইরানের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নেবে না তাঁর দেশ।
উত্তর কোরিয়া: ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েলি হামলাকে ‘অবৈধ আগ্রাসন’ এবং ‘জাতীয় সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন’ বলে মনে করে উত্তর কোরিয়া। উত্তর কোরিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্রের বরাত দিয়ে দেশটির রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম কোরিয়ান সেন্ট্রাল নিউজ এজেন্সি এ তথ্য জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের এ আগ্রাসনমূলক যুদ্ধ কোনো অবস্থাতেই গ্রহণযোগ্য নয়।
ন্যাটো: ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের পদক্ষেপের প্রশংসা করলেও পশ্চিমা সামরিক জোট ন্যাটোর প্রধান মার্ক রুতে বলেছেন, এ সংঘাতে বা এর কোনো অংশে একক জোট হিসেবে জড়িয়ে পড়ার কোনো পরিকল্পনা নেই ন্যাটোর।
ইরাক: আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার ঘটনায় প্রতিবেশী দেশ ইরাক তিন দিনের জাতীয় শোক ঘোষণা করেছে। দেশটির সরকারের মুখপাত্র বাসেম আল আওয়াদি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘মানবিক ও নৈতিক নিয়ম লঙ্ঘন করে প্রকাশ্য আগ্রাসন চালানোর মধ্য দিয়ে’ খামেনিকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনায় আন্তর্জাতিক রীতিনীতির ‘স্পষ্ট লঙ্ঘন ঘটেছে’ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
পাকিস্তান: পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিকে হত্যার ঘটনাকে আন্তর্জাতিক আইনের ‘সুষ্পষ্ট লঙ্ঘন’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি লিখেছেন, ‘রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধানকে লক্ষ্যবস্তু না করা একটি দীর্ঘকালীন প্রথা। খামেনির শাহাদাতে পাকিস্তানের জনগণ ইরানের শোকাতুর মানুষের পাশে আছে।’
ভারত: ইরানে যুদ্ধ এবং হামলায় আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নিহত হওয়ার ঘটনায় নিশ্চুপ রয়েছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। এটা নিয়ে ঘরে–বাইরে সমালোচিত হচ্ছেন তিনি। তবে ইরানে হামলার তিন দিন পর সোমবার ভারত সফররত কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নির সঙ্গে যৌথ ব্রিফিংয়ে নরেন্দ্র মোদি ছোট করে বলেছেন, ভারত মধ্যপ্রাচ্যের সংকট নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং উত্তেজনা প্রশমনে আলোচনার পক্ষে মত দিয়েছে।
স্পেন: স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এক্সে পোস্ট দিয়ে দ্রুত যুদ্ধ বন্ধ ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে একটি দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার বিষয়ে সব পক্ষকে সতর্ক করে দিয়েছেন। সেই সঙ্গে স্পেন সরকার আরো জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলায় দেশটির ভূমি ও সম্পদ ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
ইউক্রেন: রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ‘সহযোগী’ ইরানের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। এক্স পোস্টে জেলেনস্কি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র দৃঢ়ভাবে কাজ করছে। যখনই মার্কিন সংকল্প থাকে, তখনই বিশ্বব্যাপী অপরাধীরা দুর্বল হয়ে পড়ে। এই রাশিয়ানদেরও বুঝতে হবে।’
আলবেনিয়া: ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় সমর্থন জানিয়েছেন আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইদি রমা। এক্স পোস্টে তিনি বলেন, ইসরায়েল ও শান্তিকামী ভ্রাতৃপ্রতিম আরব দেশগুলোর পাশে দৃঢ়ভাবে আছে আলবেনিয়া।
হাঙ্গেরি: ইউরোপে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্রদের একজন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর ওরবান। ইরানে হামলার পরপরই তিনি জ্বালানি তেলের দামের ওপর এর প্রভাব নিয়ে নিজের উদ্বেগ জানিয়েছেন।
বাংলাদেশ: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির হত্যাকাণ্ডের খবরে ব্যথিত হওয়ার কথা জানিয়েছে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে এ হামলা চালানো হয়েছে। গত সোমবার (২ মার্চ) পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ কথা বলা হয়। এ ঘটনায় শোকসন্তপ্ত ইরানিদের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে হামলাকারী হিসেবে কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে বলা হয়, কোনো সংকটের সমাধান সংঘাতে আসবে বলে বাংলাদেশ মনে করে না। বরং পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধা এবং আইন সমুন্নত রেখে আলোচনাই বিরোধ নিষ্পত্তির একমাত্র পথ। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পর ইরান মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ওই হামলার নিন্দা জানিয়ে রোববার সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়েছিল। সেখানে হামলাকারী হিসেবে কোনো দেশের নাম উল্লেখ না করে বাহরাইন, ইরাক, জর্ডান, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের নিন্দা জানানো হয়।
তথ্যসূত্র: টাইম, বিবিসি, রয়টার্স ও আল-জাজিরা
সানা/আপ্র/৩/৩/২০২৬