যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ সামরিক হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম। তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
রোববার (১ মার্চ) ভোরে রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, শনিবার (২৮ ফেব্রুয়ারি) সকালে তেহরানে তাঁর সরকারি কমপ্লেক্সে পরিচালিত বিমান হামলায় তিনি নিহত হন। একই হামলায় তাঁর কন্যা, জামাতা ও নাতিও প্রাণ হারিয়েছেন বলে ইরানি গণমাধ্যমের দাবি।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবারই জানান, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ অভিযানে খামেনি নিহত হয়েছেন।
৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক, গঠিত তিন সদস্যের নেতৃত্ব পরিষদ: রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানিয়েছে, খামেনির মৃত্যুর পর ইরানজুড়ে ৪০ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। দেশটির সংবিধান অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতার অনুপস্থিতিতে শীর্ষ নেতৃত্ব পরিচালনার জন্য তিন সদস্যের একটি সাময়িক ‘নেতৃত্ব পরিষদ’ গঠন করা হয়েছে। এতে রয়েছেন প্রেসিডেন্ট, বিচার বিভাগের প্রধান এবং প্রভাবশালী গার্ডিয়ান কাউন্সিলের একজন ফকিহ। ৮৮ সদস্যের ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ই চূড়ান্তভাবে নতুন সর্বোচ্চ নেতা নির্বাচন করবে অথবা প্রয়োজন হলে স্থায়ী নেতৃত্ব পরিষদ গঠন করবে।
সিআইএ তথ্য, দিবালোকের হামলা-কৌশলগত চমক’: মার্কিন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ কয়েক মাস ধরে খামেনির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছিল। শনিবার সকালে তেহরানের কেন্দ্রস্থলের একটি কমপ্লেক্সে শীর্ষ বৈঠকের তথ্য পাওয়ার পর হামলার সময় পরিবর্তন করা হয়।
ইসরায়েল সময় ভোর ৬টায় যুদ্ধবিমান উড্ডয়ন করে। তেহরান সময় সকাল প্রায় ৯টা ৪০ মিনিটে কমপ্লেক্সে আঘাত হানে বোমা। ইসরায়েলি সূত্রের দাবি, প্রায় ৩০টি বোমা নিক্ষেপে কমপ্লেক্সটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, খামেনি ‘বেঁচে নেই-এমন লক্ষণ পাওয়া গেছে’, যদিও সরাসরি মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেননি।
নিহত শীর্ষ সামরিক নেতৃত্ব: হামলায় ইরানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী আমির নাসিরজাদেহ ও ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) কমান্ডার মেজর জেনারেল মোহাম্মদ পাকপুর নিহত হয়েছেন বলে রয়টার্সের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ইরনার বরাতে জানা যায়, সামরিক পরিষদের প্রধান রিয়ার অ্যাডমিরাল আলী শামখানিও নিহত হয়েছেন। আইআরজিসি এই অভিযানের প্রতিশোধ হিসেবে ‘ট্রুথফুল প্রমিস ৪’ নামে পাল্টা সামরিক অভিযান শুরু করেছে বলে জানিয়েছে।
২০০ যুদ্ধবিমান, ৫০০ লক্ষ্যবস্তু: ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী (আইডিএফ) জানিয়েছে, প্রায় ২০০ যুদ্ধবিমান দিয়ে ইরানের পশ্চিম ও মধ্যাঞ্চলে অন্তত ৫০০ সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চার ও এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম ছিল প্রধান টার্গেট। ইরানের রেড ক্রিসেন্ট জানিয়েছে, হামলায় এখন পর্যন্ত অন্তত ২০১ জন নিহত ও ৭৪৭ জন আহত হয়েছেন। ৩২টি প্রদেশের মধ্যে অন্তত ২৪টিতে হামলার প্রভাব পড়েছে।
স্কুলে হামলায় নিহত বেড়ে ১৪৮: ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় মিনাব শহরের একটি প্রাথমিক বালিকা বিদ্যালয়ে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৪৮ জনে দাঁড়িয়েছে। আহত হয়েছেন আরো ৯৫ জন। আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শনিবার ভোর থেকে শুরু হওয়া যৌথ অভিযানে ইরানের ৩১টি প্রদেশের মধ্যে ২০টির বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
ইরানের পাল্টা হামলা: উপসাগরীয় ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র: পাল্টা জবাবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। বাহরাইনের মানামায় অবস্থিত মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তরসংলগ্ন এলাকায় বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে। কাতার জানিয়েছে, আল-উদেইদ বিমানঘাঁটি লক্ষ্য করে ছোড়া একাধিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে। সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও অন্যান্য দেশেও সতর্কতা জারি করা হয়েছে।
মিশন শেষ হয়নি, ট্রাম্পের বার্তা: ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হওয়ার পর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ‘খামেনির মৃত্যু হলেও আমাদের মিশন শেষ হয়নি।
তিনি বলেন, সম্পূর্ণ লক্ষ্য অর্জন না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের সঙ্গে সমন্বিতভাবে হামলা চালিয়ে যাবে। তার ভাষায়, ‘শান্তি প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত এই নিখুঁত ও ভারী বিমান হামলা অব্যাহত থাকবে।’
বিবিসির প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, তেহরানে খামেনির কমপাউন্ডে হামলায় তিনি নিহত হন। স্যাটেলাইট চিত্রে কমপাউন্ড সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ার ছবি প্রকাশ পেয়েছে।
সৌদি-ইসরায়েলের চাপেই হামলা? মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, সৌদি আরব ও ইসরায়েলের যৌথ চাপের মুখেই যুক্তরাষ্ট্র এই অভিযান চালায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান একাধিকবার ট্রাম্পের সঙ্গে যোগাযোগ করে হামলার পক্ষে যুক্তি দেন। যদিও প্রকাশ্যে তিনি কূটনৈতিক সমাধানের কথা বলেছিলেন।
কাশ্মিরে বিক্ষোভ, করাচিতে সংঘর্ষে নিহত ৯: খামেনি হত্যার প্রতিবাদে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মিরে হাজারো শিয়া মুসলিম বিক্ষোভ করেছেন। শ্রীনগরে খামেনির ছবি ও পতাকা নিয়ে মিছিল হলেও বড় ধরনের সংঘর্ষের খবর পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানের করাচিতে মার্কিন কনস্যুলেটের কাছে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন নিহত হয়েছেন বলে দেশটির গণমাধ্যম জানিয়েছে।
৩৭ বছরের শাসনের অবসান: ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খামেনি-এর মৃত্যুর পর খামেনি ইরানের সর্বোচ্চ নেতা হন। ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব-পরবর্তী রাষ্ট্রকাঠামো সুসংহত করা, আইআরজিসিকে শক্তিশালী নিরাপত্তা-রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া এবং ‘প্রতিরোধ অর্থনীতি’ গড়ে তোলা ছিল তার শাসনের মূল বৈশিষ্ট্য।
২০০৯ সালের নির্বাচন-পরবর্তী বিক্ষোভ, ২০২২ সালের নারী অধিকার আন্দোলন এবং চলতি বছরের অর্থনৈতিক অস্থিরতা তার শাসনামলে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে ওঠে। সমালোচকদের মতে, জাতীয় স্বাধীনতার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিতে গিয়ে তিনি তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ থেকে দূরে সরে যান।
ইরানের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এখন ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’-এর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলা পরিস্থিতিকে দ্রুতই পূর্ণমাত্রার আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ দিতে পারে-এমন আশঙ্কা জোরালো হচ্ছে।
সানা/আপ্র/১/৩/২০২৬