বাংলাদেশের নোয়াখালী, চট্টগ্রাম বন্দর ও সিলেট অঞ্চল পুনরুদ্ধারের দাবি তুলেছেন ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সংসদ সদস্য নিশিকান্ত দুবে। তাঁর দাবি, ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের অংশ হিসেবে বিবেচিত এসব অঞ্চল ভারতের কাছ থেকে পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল। এ জন্য ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর সিদ্ধান্তকে দায়ী করেছেন তিনি। তাঁর এমন বক্তব্যে সমর্থন জানিয়েছেন ত্রিপুরার সাবেক রাজপরিবারের উত্তরসূরি এবং তিপরা মোথা পার্টির প্রতিষ্ঠাতা প্রদ্যোত বিক্রম মানিক্য দেববর্মা।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) ভারতের বার্তা সংস্থা এএনআইকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে নিশিকান্ত দুবে বলেন, শুধু পাকিস্তানের দখলে থাকা কাশ্মির পুনরুদ্ধার নয়, নেহরু জোর করে যেসব ভূখণ্ড হস্তান্তর করেছিলেন, সেগুলোও ফিরিয়ে নেওয়ার সময় এসেছে। এর মধ্যে নোয়াখালী, চট্টগ্রাম বন্দর ও সিলেট রয়েছে।
বিজেপির এই সংসদ সদস্যের দাবি, ১৯৪৬-৪৭ সালে এসব অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষেত্রে তৎকালীন ত্রিপুরার মহারাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্যের মতামত উপেক্ষা করা হয়েছিল। নেহরু অন্তর্বর্তী সরকারে মুসলিম লীগের সমর্থন পাওয়ার বিষয়ে বেশি আগ্রহী ছিলেন। এ কারণে ত্রিপুরা রাজপরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও অঞ্চলগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
নিশিকান্ত দুবে বলেন, তৎকালীন রাজা বীর বিক্রম কিশোর মানিক্য নেহরুর সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে প্রশ্ন তুলেছিলেন, কীভাবে নোয়াখালী পাকিস্তানের হাতে তুলে দেওয়া যায়, কীভাবে সিলেট ও চট্টগ্রামে গণভোটের আয়োজন করা যায়। ওই অঞ্চলগুলো তাঁর রাজ্যের অংশ হওয়ায় সেগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকারও তাঁর থাকা উচিত বলে দাবি করেছিলেন রাজা।
তাঁর (দুবে) ভাষ্য অনুযায়ী, রাজা বলেছিলেন, ত্রিপুরা ভারতের অংশ থাকবে, পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হবে, নাকি স্বাধীন রাষ্ট্র হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকার তাঁর। কিন্তু তাঁর আপত্তি উপেক্ষা করা হয়েছিল বলে দাবি করেন দুবে।
তিনি আরো বলেন, ১৯৪৬ সালের ২ সেপ্টেম্বর নেহরু অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। তখন তাঁর লক্ষ্য ছিল মুসলিম লীগের সমর্থন নিয়ে সরকার পরিচালনা করা। নোয়াখালীতে ১৯৪৬ সালের সাম্প্রদায়িক সহিংসতার সময়ও নেহরু মুসলিম লীগকে সরকারে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি নিয়ে ব্যস্ত ছিলেন বলে অভিযোগ করেন দুবে। এ সময় নোয়াখালীতে এক দিনে প্রায় ১০ হাজার হিন্দু নিহত হয়েছিলেন বলেও দাবি করেন বিজেপির এই সংসদ সদস্য। তবে হতাহতের এই সংখ্যা তাঁর বক্তব্যের দাবি, স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য নয়।
চট্টগ্রাম বন্দর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের হাতে চলে যাওয়াকে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ উন্নয়নে বড় বাধা হিসেবে দেখছেন নিশিকান্ত দুবে। তাঁর দাবি, বন্দরটির নিয়ন্ত্রণ হারানোর কারণে উত্তর-পূর্ব ভারতের খনিজ সম্পদ, প্রাকৃতিক গ্যাসসহ বিভিন্ন সম্পদের যথাযথ ব্যবহার ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি। এ অঞ্চলের বিচ্ছিন্নতা ও অনুন্নয়নের পেছনেও চট্টগ্রাম বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হারানোর বিষয়টি দায়ী বলে মন্তব্য করেন তিনি।
দুবের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে ত্রিপুরার সাবেক রাজপরিবারের উত্তরসূরি এবং তিপরা মোথা পার্টির প্রধান প্রদ্যোত বিক্রম মানিক্য দেববর্মা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, দেশভাগের সময় তাঁর দাদিকে অন্ধকারে রেখে সাবেক ত্রিপুরা রাজ্যের বিশাল অংশ পূর্ব পাকিস্তানের হাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। এটি তাঁদের জাতির ইতিহাসের সবচেয়ে অন্ধকার অধ্যায় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
প্রদ্যোত মানিক্য আরো বলেন, চট্টগ্রাম বন্দরের মাধ্যমে সমুদ্রপথে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ থাকলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা সরু স্থলপথ ‘চিকেনস নেক’ নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হতে হতো না। তৎকালীন ভারত সরকারের কৌশলগত ভুলের মাশুল শুধু ত্রিপুরা কিংবা উত্তর-পূর্বাঞ্চল নয়, পুরো দেশকে দিতে হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর দাবি, তাঁদের বৃহত্তর টিপ্রাল্যান্ড আন্দোলনকে প্রায়ই ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ অতীতের ঐতিহাসিক ভুলের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া অঞ্চলগুলোকে আবার একত্র করার আকাঙ্ক্ষাই এ আন্দোলনের অন্যতম উদ্দেশ্য।
ইতিহাসের প্রেক্ষাপট
নিশিকান্ত দুবের বক্তব্যের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেও কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে। ভারতের ত্রিপুরা বিধানসভার সরকারি ইতিহাস অনুযায়ী, ত্রিপুরার প্রশাসনিক ক্ষমতা ভারত সরকারের কাছে হস্তান্তরের চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল ১৯৪৯ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। ওই বছরের ১৫ অক্টোবর থেকে ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্যটির প্রশাসনের দায়িত্ব গ্রহণ করে। ফলে ত্রিপুরা ১৯৪৮ সালের অক্টোবরে ভারতের অংশ হয়েছিল বলে দুবের বক্তব্যের সঙ্গে সরকারি নথির তারিখের পার্থক্য রয়েছে।
অন্যদিকে, ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই সিলেটে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছিল। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে উপস্থাপিত ফলাফল অনুযায়ী, ২ লাখ ৩৯ হাজার ৬১৯ জন পূর্ববঙ্গের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে এবং ১ লাখ ৮৪ হাজার ৪১ জন আসামের সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট দেন। গণভোটের ফলাফলের ভিত্তিতে সিলেটের অধিকাংশ এলাকা তৎকালীন পূর্ববঙ্গের অন্তর্ভুক্ত হয়।
বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের অন্তর্ভুক্ত নোয়াখালী, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড পুনরুদ্ধারের দাবি তুলে বিজেপি সংসদ সদস্যের এই বক্তব্য প্রতিবেশী দুই দেশের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
তথ্যসূত্র: প্রতিবেদন তৈরিতে ভারতীয় বার্তা সংস্থা এএনআইয়ের সাক্ষাৎকারের বরাত দিয়ে প্রকাশিত একাধিক ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন এবং ঐতিহাসিক নথি ব্যবহার করা হয়েছে।
সানা/আপ্র/৭/১১/২০২৬