যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বিপুল অর্থ বিনিয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত ফল পাননি বিশ্বের শীর্ষ ধনকুবের ইলন মাস্ক। তাঁর সমর্থিত প্রার্থীদের বড় পরাজয়ে ওয়াশিংটনের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা বড় ধাক্কা খেয়েছে। একই সঙ্গে মাস্কের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের ব্যবসায়িক ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কংগ্রেসে তাঁর মিত্রের সংখ্যা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন কোম্পানির সরকারি চুক্তি, নীতিগত সুবিধা এবং ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডের ওপর কঠোর তদন্ত ও নজরদারির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও তাঁর প্রযুক্তি খাতের মিত্রদের বিরুদ্ধে দেশজুড়ে বিরোধিতা জোরালো হয়েছে। এর ফলে ধনকুবেরদের রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঋণনির্ভর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো, বিশেষ করে ডেটা সেন্টার নির্মাণের পরিকল্পনা সমালোচনার মুখে পড়েছে।
নির্বাচনী অর্থায়নের নথি বিশ্লেষণ করে সিএনবিসি জানিয়েছে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে অন্তত ৪৭ কোটি ৪০ লাখ ডলার ব্যয় করেছেন মাস্ক। এর মধ্যে শুধু টেক্সাসেই খরচ করেছেন ২২ কোটি ৪০ লাখ ডলার, যা তাঁর মোট নির্বাচনী ব্যয়ের প্রায় অর্ধেক। কিন্তু ডেমোক্র্যাটদের জোয়ারে তাঁর সমর্থিত রিপাবলিকান সেনেট প্রার্থী কেন প্যাক্সটন এবং গভর্নর পদপ্রার্থী গ্রেগ অ্যাবট শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছেন।
নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর শেয়ারবাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। রিপাবলিকানদের ব্যবসাবান্ধব নীতির সুবিধায় দীর্ঘদিন ধরে এগিয়ে চলা স্পেসএক্স ও টেসলার শেয়ারের দরপতন ঘটেছে। পাশাপাশি ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ায় প্রযুক্তি খাতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শেয়ারেও চাপ তৈরি হয়েছে।
ভোটের ফলাফলে স্পষ্ট হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক ভোটার প্রযুক্তি কোম্পানির ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং রাজনীতিতে ধনকুবেরদের বিপুল অর্থ ব্যয়ের বিরোধিতা করছেন। তাঁরা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমালোচকদের সমর্থন দেওয়ার পাশাপাশি এ প্রযুক্তির বিস্তারে প্রয়োজনীয় ডেটা সেন্টার স্থাপনের ওপর বিধিনিষেধ আরোপের পক্ষেও অবস্থান নিয়েছেন।
বিজয়ী ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর জেমস তাড়ারিকো তাঁর বিজয় ভাষণে মাস্কের নাম উল্লেখ না করেই বলেন, রাজনীতি থেকে বড় অঙ্কের অর্থের প্রভাব সরিয়ে ফেলতে হবে, যাতে কোনো ট্রিলিয়নিয়ার অর্থের জোরে নির্বাচন কিনে নিতে না পারেন। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এমনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে, যাতে শুধু শীর্ষ এক শতাংশ মানুষ নয়, সাধারণ জনগণও এর সুফল পায়।
মাস্কের বিপুল নির্বাচনী ব্যয়ের প্রসঙ্গে জার্মান মার্শাল ফান্ডের ভিজিটিং সিনিয়র ফেলো জে সি লিন্ডজেনিক বলেন, এই নির্বাচনের ফল ট্রাম্পের বলয়ে মাস্কের যে রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি হয়েছিল, তা স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে।
টেক্সাসে ব্যবসায়িক স্বার্থে নতুন অনিশ্চয়তা: মাস্কের ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠেছে টেক্সাস। অস্টিনের বাইরে টেসলার সবচেয়ে বড় মার্কিন কারখানা রয়েছে সেখানে। দক্ষিণ টেক্সাসের স্টারবেইস কমপ্লেক্স থেকে স্পেসএক্সের রকেট উৎক্ষেপণ করা হয়। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও চিপ উৎপাদনে নতুন বিনিয়োগের পরিকল্পনাও রয়েছে মাস্কের।
এসব উদ্যোগের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে অঙ্গরাজ্য সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। বিদ্যুৎ ও পানির সরবরাহ, পরিবেশগত ছাড়পত্র, অবকাঠামো সুবিধা এবং কর প্রণোদনার মতো বিষয়গুলোতে অঙ্গরাজ্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন।
টেক্সাসের নবনির্বাচিত ডেমোক্র্যাট গভর্নর জিনা হিনোজোসা নির্বাচনী প্রচারে মাস্কের ব্যবসায়িক প্রভাব ও কর ভর্তুকির বিরোধিতা করেছেন। তিনি নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে স্থগিতাদেশ, শিল্প খাতের কর ছাড় বাতিল এবং বড় প্রকল্পের উদ্যোক্তাদের বিদ্যুতের সম্পূর্ণ ব্যয় নিজেরাই বহনের দাবি জানিয়েছেন।
বিজয় ভাষণে হিনোজোসা অঙ্গরাজ্যের ক্ষমতা ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের হাত থেকে সাধারণ মানুষের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার অঙ্গীকার করেন। তবে টেক্সাসের আইনসভায় এখনো রিপাবলিকানদের নিয়ন্ত্রণ থাকায় তাঁর পক্ষে বড় ধরনের নীতিগত পরিবর্তন আনা কঠিন হবে। তা সত্ত্বেও লাইসেন্স প্রদান ও ব্যবসায়িক প্রণোদনার ক্ষেত্রে তাঁর প্রশাসন কঠোর অবস্থান নিলে মাস্কের সম্প্রসারণ পরিকল্পনা বাধার মুখে পড়তে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বড় পরাজয়: ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের নথি অনুসারে, মধ্যবর্তী নির্বাচনে দেশজুড়ে ৪৪টি ফেডারেল নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় মাস্কের গঠিত ‘আমেরিকা প্যাক’ প্রায় আট কোটি ৭০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। কিন্তু বুধবার সকাল পর্যন্ত পাওয়া ফলাফলে দেখা যায়, তাদের সমর্থিত রিপাবলিকান প্রার্থীরা ২৯টি আসনে পরাজিত হয়েছেন। জয় পেয়েছেন মাত্র তিনটিতে। বাকি ১২টি আসনের ফল তখনো ঘোষণা করা হয়নি। অর্থাৎ মোট ব্যয়ের ৯৩ শতাংশের বেশি, আট কোটি ডলারেরও বেশি, ব্যয় হয়েছে পরাজিত প্রার্থীদের পেছনে।
এই ভরাডুবির ফলে ডেমোক্র্যাট-নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেসে মাস্কের মিত্রের সংখ্যা এখন নামমাত্র। এতে তাঁর ফেডারেল সরকারের সঙ্গে বিভিন্ন ব্যবসায়িক চুক্তি, ট্রাম্প প্রশাসনের সরকারি দক্ষতা বিভাগে অতীতের ভূমিকা এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে তাঁর কোম্পানিগুলোর সম্পর্ক নিয়ে কঠোর তদন্তের পথ তৈরি হতে পারে।
কংগ্রেসের বাড়তি নজরদারির কারণে স্পেসএক্সের দ্রুত সম্প্রসারিত সরকারি চুক্তিগুলোর অগ্রগতিও ধীর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তবে নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ এখনো ট্রাম্পের হাতে। তাঁর ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও রয়েছে। ফলে মাস্কের প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি ব্যবসার সুবিধা দেয়, এমন নীতি বাতিলের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটদের ক্ষমতা সীমিত থাকবে।
নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয় করে ব্যর্থ হওয়ার অভিজ্ঞতা মাস্কের এবারই প্রথম নয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ‘আমেরিকা প্যাক’ কংগ্রেসের যে আটজন প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছিল, তাঁদের সবাই পরাজিত হন। গত বছর উইসকনসিনে একজন রিপাবলিকান প্রার্থীকে জেতাতে দুই কোটি ডলারের বেশি ব্যয় করেও সফল হননি তিনি।
গত বছর রাজনীতিতে তুলনামূলক কম অর্থ ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন মাস্ক। কিন্তু বাস্তবে ২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে তিনি সবচেয়ে বড় ব্যক্তিগত নির্বাচনী অর্থদাতা হিসেবে আবির্ভূত হন।
টেসলার দীর্ঘদিনের বিনিয়োগকারী রন ব্যারন ২০২৫ সালের মার্চে সতর্ক করে বলেছিলেন, মাস্কের রাজনৈতিক সক্রিয়তা গ্রাহকদের দূরে সরিয়ে দিতে পারে। তাঁর ভাষায়, যুক্তরাষ্ট্রের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থানের কারণে শত্রুতে পরিণত করা মোটেও বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
তবে অন্য অনেকেই ট্রাম্পের সঙ্গে মাস্কের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক এবং নিয়ন্ত্রণমূলক বিধিবিধান থেকে শুরু করে পেন্টাগনের প্রযুক্তি খাতের বাজেট বরাদ্দে তাঁর প্রভাবকে ইতিবাচক হিসেবে দেখেছিলেন।
প্রযুক্তি খাতের বিরুদ্ধে বাড়ছে বিরোধিতা: নির্বাচনে বিপুল অর্থ ব্যয় করেও বিপাকে পড়া প্রযুক্তি খাতের একমাত্র ব্যক্তি মাস্ক নন। ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের নথি অনুযায়ী, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে নীতিমালা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে কাজ করা ‘লিডিং দ্য ফিউচার’ নামের একটি রাজনৈতিক সংস্থাকে আড়াই কোটি ডলার অনুদান দিয়েছেন ওপেনএআইয়ের প্রেসিডেন্ট গ্রেগ ব্রকম্যান ও তাঁর স্ত্রী অ্যানা। এ ছাড়া ভেঞ্চার ক্যাপিটাল প্রতিষ্ঠান ‘অ্যান্ড্রেসেন হোরোউইৎজ’ দিয়েছে আরো পাঁচ কোটি ডলার।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নিরাপত্তা ও সুরক্ষায় কঠোর নীতিমালার পক্ষে থাকা নিউইয়র্কের আইনপ্রণেতা অ্যালেক্স বোরেসকে ডেমোক্র্যাটিক দলের প্রাথমিক নির্বাচনে পরাজিত করার মতো কিছু সাফল্য প্রযুক্তি খাত পেলেও স্থানীয় পর্যায়ে ভোটারদের সমর্থন আদায় কঠিন হয়ে পড়েছে।
ওহাইওতে ডেমোক্র্যাট শ্যারড ব্রাউন রিপাবলিকান সিনেটর জন হাস্টেডকে পরাজিত করেছেন ডেটা সেন্টার স্থাপনে তাঁর অন্ধ সমর্থনের বিষয়টি সামনে এনে। ‘অ্যাডইমপ্যাক্ট’-এর তথ্যমতে, ডেটা সেন্টারের কঠোর সমালোচনা করে প্রচারিত বিজ্ঞাপনে ডেমোক্র্যাটরা প্রায় দুই কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে।
সাউথ ক্যারোলাইনাতেও ডেমোক্র্যাট অ্যানি অ্যান্ড্রুজ রিপাবলিকান সিনেটর ডার্লিন গ্রেহামকে পরাজিত করেন। সেখানে ডেটা সেন্টার শিল্পের পক্ষে কাজ করা ‘বিল্ডিং দ্য ফিউচার’ নামের সুপার প্যাক গ্রেহামের সমর্থনে ১৫ লাখ ডলারের বিজ্ঞাপন বুক করেছিল। অন্যদিকে অ্যানি অ্যান্ড্রুজ নতুন ডেটা সেন্টার নির্মাণে দুই বছরের স্থগিতাদেশ দেওয়ার পক্ষে প্রচার চালিয়েছিলেন।
অ্যাডইমপ্যাক্টের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন নির্বাচনী প্রচারগোষ্ঠী ও বাইরের সংগঠনগুলো ডেটা সেন্টার-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপনে ১৭ কোটি ৩০ লাখ ডলার ব্যয় করেছে। এর প্রায় পুরোটাই ছিল নেতিবাচক প্রচার। এই অর্থের মধ্যে ১৪ কোটি ডলার এসেছে ডেমোক্র্যাটিক বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে।
মঙ্গলবার ভোটাররা স্থানীয় পর্যায়ে ডেটা সেন্টার-সংক্রান্ত ৪১টি প্রস্তাবের ওপর সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ১০টি এলাকায় ডেটা সেন্টার স্থাপনে নিষেধাজ্ঞা আরোপের পক্ষে রায় এসেছে।
ঋণনির্ভর এআই অবকাঠামোতেও বাড়ছে ঝুঁকি: নির্বাচনের এই ফল প্রযুক্তি খাতের আর্থিক ঝুঁকিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। জেপিমরগান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের অনুমান অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় দাঁড়াতে পারে প্রায় পাঁচ ট্রিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার আসতে পারে বিনিয়োগযোগ্য ঋণবাজার থেকে।
কিন্তু ডেটা সেন্টারের মতো বড় প্রকল্প পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত প্রত্যাশিত আয় নিশ্চিত করা যায় না। প্রয়োজনীয় লাইসেন্স পেতে বিলম্ব হলে নির্মাণকাজ পিছিয়ে যায়, একই সঙ্গে রাজস্ব আয় শুরু হতেও দেরি হয়। অন্যদিকে বিদ্যুৎ ও ঋণের উচ্চ ব্যয় প্রকল্পের সামগ্রিক খরচ বাড়িয়ে দেয়। ফলে প্রত্যাশিত মুনাফা অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনী ফল শুধু মাস্কের রাজনৈতিক প্রভাবকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেনি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি খাতের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ, ডেটা সেন্টার সম্প্রসারণ এবং ঋণনির্ভর এআই অবকাঠামোর স্থায়িত্ব নিয়েও নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
সানা/আপ্র/৭/১১/২০২৬