শীত এখনো পুরোপুরি আসেনি। তবে আগাম শীতের সবজিতে ভরে উঠতে শুরু করেছে রাজধানীর বাজার। শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মুলার সরবরাহ বাড়ায় এসব পণ্যের দাম কিছুটা কমেছে। কয়েকটি সবজি এখন ৫০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু টমেটো, কাঁচামরিচ, গাজর ও গোল বেগুনের মতো পণ্যে স্বস্তি নেই। মাছ-মাংসের বাজারেও কমেনি উচ্চমূল্যের চাপ। এর মধ্যে রমজান আসতে কয়েক মাস বাকি থাকতেই ছোলা ও ছোলার ডালের দাম বেড়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে বাজারে স্বস্তি ফিরেছে আংশিক, কিন্তু সংসারের ব্যয়ের চাপ কমেনি।
শুক্রবার (৬ নভেম্বর) রাজধানীর উত্তরা, বাড্ডা, মালিবাগসহ বিভিন্ন এলাকার বাজার ঘুরে পাওয়া চিত্রে এমন পরিস্থিতি দেখা গেছে। বাজারভেদে পণ্যের দামে কিছু পার্থক্য থাকলেও ক্রেতাদের অভিজ্ঞতা প্রায় একই- কিছু সবজি কিনতে আগের তুলনায় কম টাকা লাগছে, কিন্তু মাছ, মাংস ও অন্যান্য নিত্যপণ্যের ব্যয় আগের মতোই বেশি।
বাজারে শীতের আগাম সবজির সরবরাহ বাড়ায় সবচেয়ে বেশি স্বস্তি মিলছে শিম, ফুলকপি, বাঁধাকপি ও মুলায়। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি শিম বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৮০ টাকায়। আকারভেদে প্রতিটি ফুলকপি ৪০ থেকে ৫০ টাকা এবং বাঁধাকপি ৫০ থেকে ৬০ টাকা। মুলার কেজি ৪০ থেকে ৬০ টাকা। ধুন্দল, ঝিঙা ও মেটে আলু পাওয়া যাচ্ছে ৬০ টাকা কেজি দরে।
তবে সবজির বাজারে এখনো দামের বৈষম্য স্পষ্ট। বেগুনের জাত ও আকারভেদে কেজি ৪০ থেকে ৭০ টাকা হলেও গোল বেগুনের দাম ১২০ টাকা। টমেটো ও কাঁচামরিচের কেজি ১২০ টাকা করে। গাজর বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকায়। দেশি শসা ৮০ টাকা এবং হাইব্রিড শসা ৬০ টাকা কেজি। ঢ্যাঁড়শ ও কচুমুখি ৫০ থেকে ৬০ টাকা, বরবটি, করলা ও কাঁকরোল ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতিটি লাউ ৪০ থেকে ৫০ টাকা, পেঁপে ৩০ টাকা, মিষ্টিকুমড়া ৩০ থেকে ৪০ টাকা এবং আলু ২৫ থেকে ৩০ টাকা কেজি।
উত্তরার আজমপুর সমবায় মার্কেটের সবজি বিক্রেতা আরিফ বলেন, শীতকালীন সবজির সরবরাহ এখন অনেক বেড়েছে। এ কারণে বেশ কিছু সবজির দাম আগের তুলনায় কমেছে। বাজারে সরবরাহ আরো বাড়লে সামনের দিনগুলোতে দাম কমার সম্ভাবনা রয়েছে।
একই বাজারের বিক্রেতা সোহাগ মিয়া বলেন, শীতের সবজি আসতে শুরু করায় আগের তুলনায় দাম কমেছে। তবে এখনো সব ধরনের শীতকালীন সবজি বাজারে আসেনি। সরবরাহ বাড়লে দাম আরো কমবে। তাঁর ভাষ্য, ফুলকপি ও বাঁধাকপি আকারভেদে প্রতি পিস ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে; কেজি হিসেবে এসব সবজির দাম প্রায় ৬০ টাকা।
ছোলায় রমজানের আগাম প্রভাব: সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তির বিপরীতে ছোলার দাম বাড়ায় ক্রেতাদের মধ্যে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রমজান শুরু হতে এখনো কয়েক মাস বাকি থাকলেও রাজধানীর বাজারে গত এক সপ্তাহে প্রতি কেজি ছোলার দাম বেড়েছে প্রায় ১০ থেকে ১৫ টাকা। বর্তমানে প্রতি কেজি ছোলা বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকায়। গত সপ্তাহেও দাম ছিল ১০০ টাকার মধ্যে। একই সময়ে ছোলার ডালের দাম বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২০ থেকে ১৩০ টাকায়।
মালিবাগ এলাকার ভাই ভাই স্টোরের স্বত্বাধিকারী মো. রফিকুল ইসলাম জানান, পাইকারি আড়তদারদের কাছ থেকেই বাড়তি দামে ছোলা কিনতে হচ্ছে। গত সপ্তাহে যে ছোলা ৯২ থেকে ৯৫ টাকা কেজি দরে কেনা হয়েছিল, এখন তা পাইকারিতে পড়ছে ১০২ থেকে ১০৫ টাকা। রমজান আসার আগেই পাইকারি বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে।
বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী জামিল হোসেনের অভিযোগ, রমজানের কয়েক মাস আগেই ছোলার দাম এভাবে বাড়ানো সিন্ডিকেটের কারসাজি। প্রতি বছর রমজানের অজুহাতে আগেভাগে নিত্যপণ্যের দাম বাড়ানো হয়। এতে সাধারণ মানুষের পকেটে টান পড়ে।
ছোলার দাম বাড়লেও সপ্তাহের ব্যবধানে কিছুটা কমেছে ডিমের দাম। পাইকারি বাজারসংলগ্ন এলাকায় ফার্মের মুরগির ডিম প্রতি ডজন ১৩০ থেকে ১৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে, যা আগের সপ্তাহের তুলনায় ১০ টাকা কম। তবে বাজারভেদে খুচরা দামে পার্থক্য রয়েছে।
মাছ-মাংসে বাড়তি খরচ বহাল: সবজির বাজারে দাম কিছুটা কমলেও মাছের বাজারে স্বস্তির খবর নেই। অধিকাংশ মাছ আগের সপ্তাহের কাছাকাছি দামেই বিক্রি হচ্ছে। রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রতি কেজি রুই মাছ আকারভেদে ২৮০ থেকে ৩৮০ টাকা, বড় তেলাপিয়া ১৮০ থেকে ২০০ টাকা, সিলভার কার্প ও গ্রাস কার্প ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং পাঙাশ ১৬০ থেকে ২৫০ টাকা। কাতলা ৩৫০ থেকে ৩৮০ টাকা, চাষের কই ২০০ থেকে ২২০ টাকা এবং পাবদা ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে।
ইলিশের দাম এখনো সাধারণ ক্রেতাদের নাগালের বাইরে। আকার ও মানভেদে প্রতি কেজি ইলিশ ৮০০ থেকে ২ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কোনো কোনো বাজারে বড় আকারের ইলিশের দাম উঠেছে ২ হাজার ৬০০ টাকা পর্যন্ত।
মাংসের বাজারেও দামের উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন নেই। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি ১৭০ থেকে ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ২৪০ থেকে ৩৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের কেজি ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকা এবং খাসির মাংস ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ২৫০ টাকা। অন্যদিকে মালিবাগসহ কয়েকটি বাজারের তথ্য অনুযায়ী, ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা, সোনালি মুরগি ৩০০ থেকে ৩৩০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৫৫০ থেকে ৫৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজার ও মুরগির ধরনভেদে দামের এই পার্থক্য রয়েছে।
মাছের দামেও বাজারভেদে ব্যবধান দেখা যাচ্ছে। অন্য একটি বাজার পর্যবেক্ষণে পাঙাশ ২২০ থেকে ২৬০ টাকা, তেলাপিয়া ২০০ থেকে ২২০ টাকা এবং রুই ও কাতলা ৩৬০ থেকে ৫৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে। চিংড়ির দাম আকার ও মানভেদে ৮০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা।
নিত্যপণ্যের দরে মিশ্র চিত্র: ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) ৫ নভেম্বরের খুচরা বাজারদরের প্রতিবেদনেও নিত্যপণ্যের বাজারে মিশ্র পরিস্থিতির প্রতিফলন রয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহের ব্যবধানে দেশি পেঁয়াজ, কাঁচামরিচ, বেগুন, ফার্মের ডিম, ছোলা, সুগন্ধি পোলাও চাল ও আমদানি করা আদার দাম কমেছে। বিপরীতে প্যাকেট ময়দা, খোলা পাম তেল ও চিনির দাম কিছুটা বেড়েছে। অধিকাংশ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আগের সপ্তাহের মতোই অপরিবর্তিত রয়েছে।
অন্যদিকে রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে পাওয়া তথ্যে পেঁয়াজের দাম কিছুটা কমে কেজিপ্রতি ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় নেমেছে, যা আগে ছিল ৫০ থেকে ৬০ টাকা। তবে আদা ও রসুনের দাম এখনো চড়া। প্রতি কেজি রসুন ১৫০ থেকে ১৮০ টাকা এবং আদা ১৪০ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বোতলজাত সয়াবিন তেলের সংকটও পুরোপুরি কাটেনি। খুচরা বাজারে প্রতি লিটার তেল কিনতে হচ্ছে ২০৫ থেকে ২১০ টাকায়। চিনি বিক্রি হচ্ছে ১১০ থেকে ১১৫ টাকা কেজি দরে। মানভেদে মসুর ডালের দাম ৯০ থেকে ১৫৫ টাকা।
বাজারের এই চিত্রে একদিকে মৌসুমি সবজির সরবরাহ বাড়ার ইতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে মাছ-মাংস ও কয়েকটি নিত্যপণ্যের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের ব্যয় কমতে দিচ্ছে না। বিশেষ করে রমজানের আগে ছোলার দাম বাড়ার প্রবণতা বাজারে আগাম মূল্যচাপের আশঙ্কা তৈরি করেছে। পাইকারি পর্যায়ে দাম বৃদ্ধির কারণ অনুসন্ধান, সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং অযৌক্তিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে কার্যকর নজরদারি জরুরি। তা না হলে শীতের সবজিতে সাময়িক স্বস্তি মিললেও নিত্যপণ্যের সামগ্রিক বাজারে ক্রেতাদের চাপ কমবে না।
সানা/আপ্র/৭/১১/২০২৬