ভারতের শীর্ষ ধনী মুকেশ আম্বানির ছেলে অনন্ত আম্বানিকে টেকসই উন্নয়ন বিষয়ে ‘প্রফেসরশিপ অব প্র্যাকটিস’ দিয়েছে যুক্তরাজ্যের নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়। বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে তাঁর কাজের স্বীকৃতি হিসেবে এ পদ দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
তবে অনন্ত আম্বানি গুজরাটে যে বিশাল বন্য প্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণকেন্দ্র ভান্তারা পরিচালনা করেন, সেখানে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী কীভাবে আনা হয়েছে, তা নিয়ে আগে থেকেই প্রশ্ন রয়েছে। এ কারণে বন্য প্রাণী ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করা গবেষক, সংগঠন ও ব্যক্তিদের একাংশ নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের এই সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
৩১ বছর বয়সী অনন্ত আম্বানি রিলায়েন্স গ্রুপের নির্বাহী পর্ষদে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিভাগের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাঁর বাবা মুকেশ আম্বানি মূলত তেল ও গ্যাস ব্যবসা থেকে বিপুল সম্পদ গড়েছেন। তাঁর মালিকানাধীন রিলায়েন্সের জামনগর শোধনাগারকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল শোধনাগার হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
মুকেশ আম্বানির সঙ্গে ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়েও বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়েছে। তাঁর রিলায়েন্স শিল্পগোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো দলটিকে বড় অঙ্কের অনুদান দিয়েছে। ২০২৪ সালে মুম্বাইয়ে অনন্ত আম্বানির জাঁকজমকপূর্ণ বিয়েতে অংশ নিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
ভান্তারায় দেড় লাখের বেশি প্রাণী: গুজরাটে পরিবারের মালিকানাধীন তেল শোধনাগারের কাছে প্রায় ১ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে ভান্তারা গড়ে তুলেছেন অনন্ত আম্বানি। সেখানে দেড় লাখের বেশি প্রাণী রয়েছে বলে জানা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে প্রায় ২০০টি সিংহ, ২৫০টি চিতাবাঘ ও ৯০০টি কুমির। অনন্তের বিয়ের আগে সেখানে বড় আকারের অনুষ্ঠানও আয়োজন করা হয়েছিল, যাতে তারকা ও রাজনীতিকেরা অংশ নেন।
ভান্তারায় আনা কিছু প্রাণীর উৎস নিয়ে বন্য প্রাণী সংরক্ষণকর্মীরা আগে থেকেই প্রশ্ন তুলেছেন। বিশেষ করে বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী কীভাবে সেখানে এসেছে, তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে। তবে ভান্তারার বিরুদ্ধে কোনো অনিয়মের অভিযোগ এখন পর্যন্ত প্রমাণিত হয়নি।
ভারতের প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী ও পরিবেশবিষয়ক লেখক রামচন্দ্র গুহ নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের সিদ্ধান্তকে ‘রহস্যজনক’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর ভাষ্য, ভারত ও বিশ্বের পরিবেশ নিয়ে কাজ করা অন্তত ৫০ থেকে ১০০ জন গবেষক ও বিশেষজ্ঞের নাম তিনি বলতে পারেন, যাঁরা এ ধরনের সম্মানের জন্য বেশি যোগ্য।
গুহ বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়টি কার পরামর্শে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং নিয়োগের আগে যথাযথ যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর মতে, এ সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়টির প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক মর্যাদার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের এক মুখপাত্র অবশ্য বলেছেন, ভান্তারায় বন্য প্রাণী সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাণী কল্যাণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে অনন্ত আম্বানির কাজ এবং রিলায়েন্স গ্রুপের সবুজ জ্বালানিতে রূপান্তরের ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকার স্বীকৃতি হিসেবেই এ সম্মান দেওয়া হয়েছে।
ভারতে অবৈধ বন্য প্রাণী বাণিজ্য নিয়ে অনুসন্ধানকারী ভুবন ম্যাঙ্গালোর, যিনি ভান্তারা নিয়ে অ্যাংলিয়া রাসকিন বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিসন্দর্ভ লিখছেন, এ নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘এটা কি কোনো রসিকতা?’
বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীদেরও আপত্তি: নিউক্যাসল বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ ইউনিয়ন শাখার সভাপতি অধ্যাপক ম্যাট পেরি জানান, পরিবেশগত উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মীরা নিয়োগটির বিষয়ে আপত্তি জানিয়েছিলেন।
সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের জলবায়ু, পরিবেশ ও টেকসই উন্নয়ন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক লায়লা মেহতাও উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তাঁর মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সরকারি অর্থায়ন কমে যাওয়ার সময়ে ধনকুবের ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানের অর্থ শিক্ষা ও গবেষণার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হওয়া উচিত ক্ষমতাকে প্রশ্ন করা এবং করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, তাদের একাডেমিক স্বীকৃতি দেওয়া নয়।
গত এপ্রিলে অনন্ত আম্বানি ভান্তারা বিশ্ববিদ্যালয় চালু করেন। এটিকে বন্য প্রাণী সংরক্ষণ ও পশুচিকিৎসাবিজ্ঞানে বিশ্বের প্রথম বৈশ্বিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
অয়েল চেঞ্জ ইন্টারন্যাশনালের গবেষণা বিভাগের সহপরিচালক লর্ন স্টকম্যান বলেন, জলবায়ু সংকটের সময়ে তেল ও গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত কমানো জরুরি। এ কারণে সরকারি অর্থে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে আরো কঠোর মানদণ্ড প্রত্যাশিত।
প্রাণী আমদানি নিয়ে পুরোনো প্রশ্ন: ২০২৫ সালে জার্মান সংবাদপত্র সুড্ডয়চে সাইটুংয়ের এক অনুসন্ধানে বলা হয়, ভান্তারায় আনা অনেক প্রাণী গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো দেশ হয়ে এসেছে। এসব দেশে বন্য প্রাণী কেনাবেচার নেটওয়ার্কের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এর ফলে কিছু বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী ভান্তারায় অবৈধভাবে আনা হয়েছে কি না, তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়।
গত বছরের আগস্টে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ভান্তারা নিয়ে তদন্ত করে। তিন সপ্তাহেরও কম সময় চলা ওই তদন্তে চিড়িয়াখানাটির পরিচালকদের কোনো অনিয়মের জন্য দায়ী করা হয়নি।
এরপর বিপন্ন প্রজাতির প্রাণী বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণকারী জাতিসংঘের সংস্থা সাইটিস ভান্তারা নিয়ে তথ্য অনুসন্ধান করে। প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে প্রাণী আনার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত কিছু অনুমতিপত্র সম্ভবত জাল ছিল। একই সঙ্গে বিপুলসংখ্যক প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে সতর্ক থাকার সুপারিশ করে সংস্থাটি। কারণ, এর ফলে অসাবধানতাবশত অবৈধভাবে সংগ্রহ করা প্রাণীর চাহিদা তৈরি হতে পারে।
সাইটিস ভারতকে বিপন্ন বন্য প্রাণী আমদানির ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপের সুপারিশ করেছিল। পরে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও জাপান এ সুপারিশের বিরোধিতা করে। তাদের বক্তব্য ছিল, অবৈধভাবে প্রাণী আমদানির যথেষ্ট প্রমাণ নেই। এরপর সাইটিস ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে নেয়।
গত আগস্টে ভান্তারা তাদের কার্যক্রমে ‘নতুন করে শুরু’র ঘোষণা দেয়। এর অংশ হিসেবে সাইটিসের সাবেক প্রধানকে কার্যক্রম তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত সব ধরনের বন্য প্রাণী আমদানি বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
ভান্তারা এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। আম্বানি পরিবার ও ভান্তারা এর আগে বন্য প্রাণী পাচারের অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের বক্তব্য, প্রাণীদের উদ্ধার, পুনর্বাসন ও যত্ন নেওয়াই তাদের মূল লক্ষ্য ও কাজ। সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান
সানা/ডিসি/আপ্র/২৭/৯/২০২৬