নিজে ধূমপান না করেও ধোঁয়ার বিষ থেকে রেহাই নেই। অন্যের ধূমপানের ধোঁয়া নিঃশ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করেই বিশ্বে ২০২৩ সালে প্রায় ১৬ লাখ ৬০ হাজার মানুষের অকালমৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে কোটি কোটি শিশুও রয়েছে পরোক্ষ ধূমপানের ঝুঁকিতে। বিশ্বজুড়ে ২৭০ কোটির বেশি মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার। এর কোনো নিরাপদ মাত্রাও নেই। মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী ‘দ্য ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই ভয়াবহ চিত্র।
গবেষণায় বলা হয়েছে, তামাক এখনো বিশ্বজুড়ে রোগ ও মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। ২০২৩ সালে ধূমপানজনিত বিভিন্ন রোগে আনুমানিক ৮০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে। এই মৃত্যুর মধ্যে সরাসরি ধূমপান না করেও অন্যের ধোঁয়ার শিকার হওয়া অধূমপায়ীরাও রয়েছেন।
গবেষকেরা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যভান্ডার পাবমেডে প্রকাশিত বিভিন্ন গবেষণা এবং জনসংখ্যাভিত্তিক জরিপ পর্যালোচনা করেছেন। এর মাধ্যমে ১৯৯০ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত বিশ্বের ২০৪টি দেশ ও অঞ্চলে পরোক্ষ ধূমপানের সংস্পর্শে আসা মানুষের সংখ্যা এবং এর কারণে সৃষ্ট রোগের বোঝা নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়।
গবেষণায় দেখা গেছে, ২০২৩ সালে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার প্রায় ২৭০ কোটি মানুষের মধ্যে ৭৬ কোটি ৭০ লাখ ছিল শূন্য থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশু। শুধু ওই বছরই পরোক্ষ ধূমপানের কারণে শিশুদের শ্বাসতন্ত্রে প্রায় ৫২ লাখ সংক্রমণের ঘটনা ঘটেছে। অর্থাৎ ধূমপানের ক্ষতি শুধু ধূমপায়ীর শরীরেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; তার চারপাশে থাকা শিশুদেরও গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে।
পরোক্ষ ধূমপানের কারণে সবচেয়ে বেশি দেখা দেওয়া রোগগুলোর মধ্যে ছিল ইসকেমিক হৃদ্রোগ। হৃদপেশিতে পর্যাপ্ত অক্সিজেন না পৌঁছালে এ রোগ হয়। দীর্ঘ সময় অন্যের ধূমপানের ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকায় অধূমপায়ীদেরও হৃদ্রোগসহ বিভিন্ন গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি বাড়ে।
কেউ ধূমপান করলে আশপাশের মানুষ সাধারণত দুই ধরনের ধোঁয়ার সংস্পর্শে আসেন। এর একটি জ্বলন্ত তামাকজাত পণ্য থেকে সরাসরি বের হওয়া ধোঁয়া। অন্যটি ধূমপায়ীর নিশ্বাসের সঙ্গে বের হওয়া ধোঁয়া।
গবেষণায় বলা হয়েছে, অধূমপায়ীরা মূলত জ্বলন্ত তামাকজাত পণ্য থেকে সরাসরি বের হওয়া ধোঁয়াই বেশি গ্রহণ করেন। এই ধোঁয়া কোনো ছাঁকনির মধ্য দিয়ে যায় না। ফলে ধূমপায়ী যে ধোঁয়া গ্রহণ করেন, তার তুলনায় এতে বিষাক্ত ও ক্যানসার সৃষ্টিকারী উপাদানের ঘনত্ব বেশি থাকে।
১৯৯০ সালের পর বিশ্বে ধূমপায়ীর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তবে জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যে পরোক্ষ ধূমপানের শিকার মানুষের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় বিশ্বে মোট আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা প্রায় অপরিবর্তিত রয়েছে।
পরোক্ষ ধূমপানে নারীরাও তুলনামূলক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বিশেষ করে যেসব অঞ্চলে নারীদের মধ্যে ধূমপানের হার কম, সেখানেও তারা অন্যের ধূমপানের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়ছেন। গবেষকদের মতে, এত বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও নারীদের স্বাস্থ্যের জন্য পরোক্ষ ধূমপানকে এখনো যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয় না।
গবেষকেরা নারী ও শিশুদের পরোক্ষ ধূমপানের ক্ষতি থেকে আরো ভালোভাবে সুরক্ষা দিতে জনসমাগমস্থল ও বাড়িতে তামাক নিয়ন্ত্রণে সরকারগুলোকে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। সূত্র: এএফপি
সানা/আপ্র/৯/৯/২০২৬