বৈশ্বিক সব সমস্যার দ্রুত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান সম্ভব না হলেও যেখানে সমঝোতার সুযোগ আছে, সেখানে তা খুঁজে বের করার চেষ্টা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নতুন সভাপতি ও বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান।
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দায়িত্ব গ্রহণের পর জাতিসংঘ সদর দপ্তরে প্রথম ব্রিফিংয়ে তিনি বলেন, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা ও সম্ভাবনাগুলো কাজে লাগাতে জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতা ও সংলাপকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেবেন তিনি।
খলিলুর রহমান বলেন, সব সমস্যার দ্রুত ও বন্ধুত্বপূর্ণ সমাধান হয়ে যাবে—এমন সরল প্রত্যাশা তিনি করেন না। কিছু বিষয় অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে, আবার কোনো কোনো সমস্যার সমাধানে সময় লাগতে পারে। তবে যেখানে সম্ভব, সেখানে অভিন্ন জায়গা খুঁজে নিয়ে সহাবস্থানের পথ বের করার চেষ্টা থামানো যাবে না।
সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সহযোগিতাকে নিজের দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, সদস্য রাষ্ট্রগুলো একসঙ্গে কাজ করলে তাঁর দায়িত্ব পালন সহজ হবে।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের প্রস্তাবিত সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার উদ্যোগের কথাও জানিয়েছেন নতুন সভাপতি। তিনি জাতিসংঘ সনদের প্রথম বাক্যের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, সেখানে ‘জাতিসংঘের জনগণ’-এর কথা বলা হয়েছে, শুধু সদস্য রাষ্ট্রের কথা বলা হয়নি। তাঁর মতে, জাতিসংঘ রাষ্ট্রগুলোর সমষ্টির চেয়েও বৃহত্তর একটি প্রতিষ্ঠান।
এ কারণে নাগরিক সমাজ, ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, শিক্ষাবিদসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে জাতিসংঘের কার্যক্রমের সঙ্গে আরও সম্পৃক্ত করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
রোহিঙ্গা প্রসঙ্গেও কথা বলেন খলিলুর রহমান। এক সাংবাদিক জানতে চান, জাতিসংঘে যাদের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব নেই, বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গারা কীভাবে সেখানে নিজেদের কথা তুলে ধরতে পারবে।
জবাবে খলিলুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের সরকারপ্রধানের রোহিঙ্গা বিষয়ক উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি শরণার্থীদের পরিস্থিতি সরাসরি দেখেছেন। তিনি তাদের দুর্ভোগ এবং নিজ বাড়িতে ফিরে যাওয়ার আকাঙ্ক্ষাও প্রত্যক্ষ করেছেন।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসকে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে নিয়ে যাওয়ার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, একবার এক লাখ মানুষ ইফতারের জন্য সেখানে জড়ো হয়েছিল এবং প্রত্যেকেই জানিয়েছিল, তারা বাড়ি ফিরে যেতে চায়।
খলিলুর রহমান বলেন, নিজ ঘরবাড়ি থেকে উচ্ছেদ হওয়া এই বিশাল জনগোষ্ঠীর প্রত্যাবাসনের আকাঙ্ক্ষাই তাদের প্রধান কথা। বাংলাদেশ তাদের সেই কণ্ঠস্বর জাতিসংঘে নিয়ে গেছে এবং তা আরও জোরালো করার কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
এর আগে মঙ্গলবার রাতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে সাধারণ পরিষদের ৮০তম অধিবেশনের সমাপ্তি পর্বে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি হিসেবে আনুষ্ঠানিক শপথ নেন খলিলুর রহমান। শপথের পর তিনি ৮১তম অধিবেশনের প্রথম পূর্ণাঙ্গ সভায় সভাপতিত্ব করেন। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৮১তম অধিবেশন ৮ সেপ্টেম্বর শুরু হয়ে আগামী বছরের ৭ সেপ্টেম্বর শেষ হবে।
খলিলুর রহমান গত ২ জুন গোপন ব্যালটে ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি নির্বাচিত হন। তিনি ৯৯ ভোট পেয়ে সাইপ্রাসের প্রার্থী আন্দ্রেয়াস এস কাকুরিসকে পরাজিত করেন; কাকুরিস পেয়েছিলেন ৯১ ভোট। জাতিসংঘের আঞ্চলিক পর্যায়ক্রমিক ব্যবস্থায় এবার সভাপতির পদটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জন্য নির্ধারিত ছিল।
জার্মানির সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আনালেনা বেয়ারবকের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন খলিলুর রহমান। আগামী এক বছর তিনি ১৯৩ সদস্যের জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁর দায়িত্ব গ্রহণের মধ্য দিয়ে প্রায় চার দশক পর বাংলাদেশ আবার এই পদে ফিরল। এর আগে ১৯৮৬-৮৭ সালে সাধারণ পরিষদের ৪১তম অধিবেশনে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী।
সানা/আপ্র/৯/৯/২০২৬