নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৭৫০ জনে দাঁড়িয়েছে। এর মধ্যে নেপালেই ৭৩৪ জনের মরদেহ ও দেহাবশেষ উদ্ধার হয়েছে। তিব্বতের শিগাতসে শহরের জিরোং কাউন্টিতে প্রাণ হারিয়েছেন আরো ১৬ জন। দুই দেশে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন তিন হাজারের বেশি মানুষ। তাঁদের সন্ধানে রোববার পঞ্চম দিনের মতো উদ্ধার অভিযান চলছে।
নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি প্রশমন ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ তথ্যের বরাত দিয়ে নেপাল নিউজ জানিয়েছে, রোববার (৩০ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত দেশটির আট জেলা থেকে ৭৩৪টি মরদেহ ও দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে চিতওয়ানে ২৫৯টি, নবলপরাসী পূর্বে ১৮৪টি, নবলপরাসী পশ্চিমে ৮২টি, গোর্খায় ৫৮টি, নুয়াকোটে ৫২টি, ধাদিংয়ে ৫০টি, তানাহুনে ৩৬টি এবং রসুয়ায় ১৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
নেপালে এখনো ২ হাজার ৪৯৮ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কর্মী, ৫৮৯ জন বিদেশি নাগরিক এবং বিদেশি পর্যটকদের সঙ্গে ভ্রমণ করা ১২৭ জন নেপালি রয়েছেন। এ ছাড়া রসুয়ার ৫৬২ জন স্থানীয় বাসিন্দা, নুয়াকোটের ১১৫ জন, মাকওয়ানপুরের ৬৫ জন এবং লাংটাং জাতীয় উদ্যানের তিনজন নিখোঁজ রয়েছেন। সরকারি কর্মকর্তা ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন।
নেপালের সেনাবাহিনী, পুলিশ ও সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর ১৯ হাজার ৮৯৫ সদস্য উদ্ধার অভিযানে অংশ নিচ্ছেন। তাঁদের অভিযানে এ পর্যন্ত ৮ হাজার ১৮৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করে নিরাপদ স্থানে নেওয়া হয়েছে। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেল থেকে ২৭৯ জন কর্মী এবং ২২৭ জন বিদেশি নাগরিককে হেলিকপ্টারে করে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
বন্যায় আহত ২৪২ জন বর্তমানে চিকিৎসা নিচ্ছেন অথবা চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড় পেয়েছেন।
এদিকে চীনের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের শিগাতসে শহরের জিরোং কাউন্টিতে ভূমিধসে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৬ জনে দাঁড়িয়েছে। এর আগে সেখানে সাতজনের মৃত্যুর কথা নিশ্চিত করা হয়েছিল। তিব্বতে এখনো ৫৪৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন।
হিমালয়ের ধস থেকেই বিপর্যয়ের সূত্রপাত: গত বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্তের কাছে হিমালয় অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ বরফ, পাথর ও মাটি নদীতে ধসে পড়ে। এতে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি হয়। বন্যার পানি ও ধ্বংসাবশেষ দ্রুতগতিতে নদী উপত্যকা দিয়ে নেমে এসে বসতি, সড়ক, সেতু ও বিদ্যুৎ অবকাঠামো ভাসিয়ে নেয়।
প্রথম দিকে ধারণা করা হয়েছিল, ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেছে। পরে ভূকম্পনসংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা জানায়, ভূমিকম্প নয়; বরং ভূমিধস থেকেই ভূকম্পনজনিত শক্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের ধারণা, হিমবাহের একটি বড় অংশ ধসে পড়ার কারণেই বরফ, কাদা ও পাথরের বিশাল ঢল নেমে আসে। নেপালের রসুয়া জেলার উঁচু পার্বত্য এলাকা থেকে বরফ ও পাথরের বিশাল ধস নদীর উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। এতে নদীতে হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পানি ও ধ্বংসাবশেষের প্রবাহ তৈরি হয়। পরে সেই প্রবল স্রোত নেপালের বিভিন্ন জনপদ এবং চীন-নিয়ন্ত্রিত তিব্বতের কিছু এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
বন্যার প্রবল স্রোত ভোতে কোশি ও ত্রিশূলীসহ সংশ্লিষ্ট নদী অববাহিকা ধরে নিচের দিকে নেমে যায়। এতে বহু বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় দুর্গম এলাকাগুলোতে উদ্ধার তৎপরতা কঠিন হয়ে উঠেছে।
জলবিদ্যুৎ প্রকল্পে বিশেষ উদ্ধার অভিযান: বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোতেও উদ্ধার অভিযান চলছে। এতে নেপালের বাহিনীর সঙ্গে চীন ও ভারতের বিশেষায়িত কারিগরি দল যোগ দিয়েছে।
নেপালের জ্বালানিমন্ত্রী বিরাজ ভক্ত শ্রেষ্ঠ জানিয়েছেন, ত্রিসুলি-৩ ‘এ’ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের একটি কেবল টানেল ছিদ্র করে ভেতরে অনুসন্ধানের চেষ্টা চালানো হচ্ছে। সেখান থেকে মূল সুড়ঙ্গে ঢোকার সুযোগ তৈরি করা হচ্ছে। ওই সুড়ঙ্গে কিছু কর্মী আটকে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে ত্রিসুলি-৩ ‘বি’ কেন্দ্রেও উদ্ধারকাজ চলছে।
তবে টানা বৃষ্টিতে উদ্ধার অভিযান ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, বৃষ্টির কারণে নদীতে পানির প্রবাহ বাড়ছে। এতে উদ্ধারকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত করতে হতে পারে।
নেপালের আবহাওয়া বিভাগ জানিয়েছে, দুর্গত এলাকাগুলোতে অন্তত সোমবার পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। সেখানে সর্বনিম্ন সতর্কবার্তা ‘হলুদ সতর্কতা’ জারি রয়েছে। ফলে আগামী দিনগুলোতে উদ্ধার অভিযান আরো কঠিন হয়ে পড়ার আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সানা/আপ্র/৩১/৮/২০২৬