রাজধানীতে একই পথে যাতায়াতকারী যাত্রীদের একত্র করে অটোরিকশা, রিকশা বা ব্যক্তিগত গাড়িতে ভাগাভাগি করে চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়েছে নতুন এক প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগে। এতে যাত্রীরা অন্য সহযাত্রীর সঙ্গে ভাড়া ভাগ করে চলতে পারবেন, ফলে ব্যক্তিগত খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমবে।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা আজাদুল ইসলাম (ছদ্মনাম) প্রতিদিন কর্মস্থলে যাতায়াতে বাস, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, রিকশা ও মেট্রোরেল ব্যবহার করেন। তবে বাসের ভিড়, পকেটমারের ঝুঁকি এবং অটোরিকশার উচ্চ ভাড়ার কারণে তাঁর মতো অনেক যাত্রীই দীর্ঘদিন ধরে বিকল্প সমাধান খুঁজছিলেন। একই গন্তব্যে যাওয়া অন্য যাত্রীর সঙ্গে ভাড়া ভাগাভাগির সুযোগ থাকলে খরচ কমানো সম্ভব-এমন ভাবনা থেকেই এসেছে নতুন এই উদ্যোগ।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের তিন শিক্ষার্থী-জোবায়ের খান, মুস্তাকিম মোরসেদ ও আবুল বাসার-‘জাইগো’ নামের একটি যানবাহন ভাগাভাগি ভিত্তিক অ্যাপ তৈরি করেছেন। অ্যাপটির মাধ্যমে একই সময়ে একই পথে বা গন্তব্যে যেতে আগ্রহী যাত্রীদের এক প্ল্যাটফর্মে যুক্ত করা হয়। এরপর তাঁরা একসঙ্গে একটি গাড়ি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা রিকশায় ভ্রমণ করে ভাড়া ভাগ করে নেন।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, কারওয়ান বাজার থেকে যাত্রাবাড়ী যেতে একটি অটোরিকশার ভাড়া যদি ৪০০ টাকা হয়, তাহলে তিনজন যাত্রী একসঙ্গে গেলে ভাড়াটি তাঁদের মধ্যে ভাগ হয়ে যাবে। উদ্যোক্তাদের দাবি, এতে ব্যক্তিপ্রতি যাতায়াত ব্যয় ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ পর্যন্ত কমতে পারে। এ সেবার জন্য যাত্রীদের কাছ থেকে আলাদা কোনো কমিশন নেওয়া হচ্ছে না।
উদ্যোক্তাদের মতে, এই উদ্যোগ শুধু ব্যক্তিগত খরচ কমানো নয়, নগরের যানজট কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে। একই সংখ্যক যাত্রীর জন্য কমসংখ্যক যানবাহন ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে সড়কে গাড়ির চাপ কমবে, জ্বালানি খরচও হ্রাস পাবে।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে গুগল প্লে স্টোর ও হুয়াওয়ের অ্যাপ গ্যালারিতে অ্যাপটি চালু হওয়ার পর তিন মাসেই ব্যবহারকারী সংখ্যা সাড়ে সাত হাজার ছাড়িয়েছে। প্রতিদিনই নতুন ব্যবহারকারী যুক্ত হচ্ছেন। সম্প্রতি বৈশ্বিক স্টার্টআপ নেটওয়ার্ক ‘এফ৬এস’-এর শীর্ষ রাইড হেইলিং প্রতিষ্ঠানের তালিকায় চতুর্থ স্থান অর্জন করেছে উদ্যোগটি।
অ্যাপটি ব্যবহার করতে হলে মুঠোফোনে ডাউনলোড করে নাম ও ফোন নম্বর দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। এতে দুটি সুবিধা রয়েছে-নিয়মিত রুট নির্ধারণ করে সহযাত্রী খোঁজা এবং তাৎক্ষণিকভাবে কাছাকাছি একই গন্তব্যের যাত্রীদের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন। লাইভ অবস্থান ব্যবহার করে কাছাকাছি যাত্রীদের মিলিয়ে দেওয়া হয়।
নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ব্যবহারকারী যাচাইকরণ, লাইভ লোকেশন ট্র্যাকিং এবং জরুরি কল সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে। নারী যাত্রীদের জন্য রয়েছে আলাদা পছন্দ নির্ধারণের সুযোগ, যাতে প্রয়োজনে শুধু নারী সহযাত্রীদের সঙ্গেই ভ্রমণ করা যায়।
তবে উদ্যোগটির কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখনো তুলনামূলক কম হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সহযাত্রী পেতে সময় লাগে। কখনো কখনো রাইডের অনুরোধের পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়, যা জরুরি মুহূর্তে অসুবিধা সৃষ্টি করতে পারে।
বুয়েটের আরবান অ্যান্ড রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ইশরাত ইসলাম এই উদ্যোগকে সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন। তাঁর মতে, ভাগাভাগি পরিবহনব্যবস্থা নগর পরিবহনে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আরো কাজ করার প্রয়োজন রয়েছে।
বর্তমানে সেবাটি ঢাকাকেন্দ্রিক হলেও উদ্যোক্তারা এর পরিসর বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। আগামী মাসে মালয়েশিয়ায় কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা রয়েছে, পাশাপাশি ভারত ও শ্রীলঙ্কাতেও এই সেবা সম্প্রসারণের চিন্তা চলছে।
সানা/আপ্র/৪/৫/২০২৬