বর্তমানে স্ট্রিট ফুডপ্রেমী মানুষের অন্ত নেই। বড় বড় রেস্তোরাঁর খাবারের চেয়ে রাস্তার পাশে তৈরি ঝালমুড়ি, ফুচকা, চটপটি কিংবা নানা ধরনের মুখরোচক খাবারই অনেকের বেশি পছন্দ। তবে খাবার যতই সুস্বাদু হোক, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে তৈরি বা সংরক্ষণ করা খাবার থেকে নানা ধরনের জীবাণু শরীরে প্রবেশ করতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হলো শিগেলা ব্যাকটেরিয়া- যা অন্ত্রে সংক্রমণ ঘটিয়ে অসুস্থ করে তুলতে পারে।
শিগেলা ব্যাকটেরিয়া কী: শিগেলা হলো এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া, যা মানুষের অন্ত্রে সংক্রমণ ঘটাতে পারে। এই সংক্রমণকে বলা হয় শিগেলোসিস। ডায়রিয়া, পেটব্যথা ও জ্বর হয় সাধারণত দূষিত খাবার বা পানি এবং অপরিষ্কার হাতের মাধ্যমে এই ব্যাকটেরিয়া শরীরে প্রবেশ করে। কিছু ক্ষেত্রে পায়খানায় রক্ত বা শ্লেষ্মা দেখা দিতে পারে। গুরুতর ডায়রিয়ার কারণে শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও লবণ বেরিয়ে গেলে পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে।
শিগেলা যেভাবে ছড়ায়: শিগেলা মূলত মল-মুখ পথে ছড়ায়। আক্রান্ত ব্যক্তির মল থেকে জীবাণু হাত, খাবার, পানি কিংবা বিভিন্ন জিনিসের মাধ্যমে অন্যের শরীরে যেতে পারে। অপরিষ্কার হাত, দূষিত পানি, ঠিকমতো রান্না না করা খাবার এবং অপর্যাপ্ত স্যানিটেশনের কারণে সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। তাই পরিবারের একজন আক্রান্ত হলে অন্যদেরও পরিচ্ছন্নতার বিষয়ে বাড়তি সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
কারা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন: পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুরা শিগেলা সংক্রমণের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ। ডায়রিয়ার কারণে তাদের শরীরে দ্রুত পানি ও প্রয়োজনীয় লবণের ঘাটতি তৈরি হতে পারে। বয়স্ক ব্যক্তি, গর্ভবতী নারী এবং যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদেরও গুরুতর সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি হতে পারে।
শিগেলার লক্ষণগুলো কী: শিগেলা সংক্রমণে ঘন ঘন পাতলা পায়খানা, পেটে মোচড় বা ব্যথা, জ্বর, বমি বমি ভাব ও বমি হতে পারে। পায়খানায় রক্ত বা শ্লেষ্মা দেখা দিলে বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্ব দিতে হবে। শিশু বারবার পায়খানা করছে, পানি বা খাবার রাখতে পারছে না, অস্বাভাবিক দুর্বল হয়ে পড়ছে কিংবা জ্বরের সঙ্গে পেটব্যথা বাড়ছে- এসব লক্ষণ দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
পানিশূন্যতার লক্ষণ চেনা: ডায়রিয়ার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিগুলোর একটি হলো পানিশূন্যতা। শিশুর মুখ ও ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া, চোখ বসে যাওয়া, স্বাভাবিকের তুলনায় কম প্রস্রাব হওয়া, অস্বাভাবিক দুর্বল বা নিস্তেজ হয়ে পড়া এবং কান্নার সময় চোখে পানি না আসার মতো লক্ষণ দেখা দিতে পারে। এসব লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।
বাড়িতে যা করতে হবে: ডায়রিয়া হলে শিশুকে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাবার স্যালাইন দিতে পারেন। প্যাকেটের নির্দেশনা মেনে সঠিক পরিমাণ পানিতে খাবার স্যালাইন তৈরি করতে হবে। শিশু বমি করলে একবারে বেশি না দিয়ে অল্প অল্প করে বারবার তরল দেওয়ার চেষ্টা করা যায়। বয়স অনুযায়ী খাবার চালিয়ে যেতে হবে এবং বুকের দুধ খাওয়া শিশুকে বুকের দুধ বন্ধ করা উচিত নয়।
সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়া ঠেকাতে সাবান ও পানি দিয়ে নিয়মিত হাত ধোয়া জরুরি। বিশেষ করে টয়লেট ব্যবহারের পর, শিশুর মল পরিষ্কার করার পর এবং খাবার তৈরির আগে হাত ভালোভাবে ধুতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির ব্যবহৃত তোয়ালে ও ব্যক্তিগত সামগ্রী আলাদা রাখাও ভালো।
নিজে থেকে ওষুধ নয়: শিশুর ডায়রিয়া হলেই নিজের সিদ্ধান্তে অ্যান্টিবায়োটিক বা পায়খানা বন্ধ করার ওষুধ দেওয়া ঠিক নয়। শিগেলা সংক্রমণে কোন চিকিৎসা প্রয়োজন, তা রোগীর অবস্থা ও চিকিৎসকের মূল্যায়নের ওপর নির্ভর করে।
কখন হাসপাতালে দ্রুত যেতে হবে: পায়খানায় রক্ত, বারবার বমি, গুরুতর পানিশূন্যতার লক্ষণ, খুব দুর্বল বা নিস্তেজ হয়ে যাওয়া, খিঁচুনি, অস্বাভাবিক আচরণ, সাড়া না দেওয়া কিংবা পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে গেলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়া জরুরি। বিশেষ করে ছোট শিশুর ক্ষেত্রে অপেক্ষা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই নিরাপদ।
শিগেলা সংক্রমণ প্রতিরোধে নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্ন খাবার, ভালো হাত ধোয়ার অভ্যাস এবং সঠিক স্যানিটেশন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো চিকিৎসা ও পানিশূন্যতা প্রতিরোধ করা গেলে গুরুতর জটিলতার ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
সূত্র: হেলথ লাইন
কেএমএএ/আপ্র/১৩.০৮.২০২৬