চিত্রনায়ক সালমান শাহ হত্যা মামলায় খলনায়ক আশরাফুল হক ডনের জামিন আবেদন নাকচ করে দিয়েছেন আদালত। সোমবার (৫ অক্টোবর) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মঞ্জুরুল ইসলাম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন।
প্রসিকিউশন পুলিশের এসআই শাহ আলম এ তথ্য জানিয়েছেন।
আদালতে ডনের পক্ষে আইনজীবী মফিজুল ইসলাম জামিন আবেদন করেন। শুনানিতে তিনি বলেন, সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনা সম্পর্কে আশরাফুল হক ডন কিছুই জানতেন না। অহেতুক হয়রানি করার উদ্দেশ্যে তাকে মামলায় সম্পৃক্ত করা হয়েছে। তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ, পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এবং তাঁর স্থায়ী ঠিকানা রয়েছে। জামিন পেলে তিনি পলাতক হবেন না বলেও আদালতকে জানান আইনজীবী।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মুহাম্মদ শামছুদ্দোহা সুমন জামিনের বিরোধিতা করেন। উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত জামিন আবেদন নাকচ করে দেন।
এর আগে গত ৯ আগস্ট রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে ডনকে গ্রেফতার করে ইমিগ্রেশন পুলিশ। এরপর থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
গত বছরের ২০ অক্টোবর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরীর পক্ষে তাঁর ভাই মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম মামলাটি দায়ের করেন। এজাহারে বলা হয়, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের ফ্ল্যাটে পূর্বপরিকল্পিতভাবে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়। মামলায় তাঁর স্ত্রী সামিরা হক, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, আশরাফুল হক ডনসহ ১১ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদেরও আসামি করা হয়েছে।
সালমান শাহর মৃত্যুর পর তাঁর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলা করেছিলেন। পরে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি সেটিকে হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন। আদালত অপমৃত্যুর মামলার সঙ্গে হত্যার অভিযোগ তদন্তের জন্য সিআইডিকে নির্দেশ দেন।
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়ে জানায়, সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছেন। ওই প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে কমরউদ্দিন চৌধুরী রিভিশন মামলা করলে ২০০৩ সালের ১৯ মে আদালত মামলাটি বিচার বিভাগীয় তদন্তে পাঠান।
দীর্ঘ ১১ বছর পর ২০১৪ সালের ৩ আগস্ট মহানগর হাকিম ইমদাদুল হক বিচার বিভাগীয় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই প্রতিবেদনেও হত্যার অভিযোগ নাকচ করা হয়।
এরপর ২০১৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নীলা চৌধুরী ওই প্রতিবেদনে নারাজি দেন। তিনি ১১ জনের নাম উল্লেখ করে তাঁদের ছেলের মৃত্যুর ঘটনায় জড়িত থাকার সন্দেহের কথা জানান।
পরে মামলাটির তদন্তভার র্যাবের কাছে যায়। রাষ্ট্রপক্ষের আপত্তির পর ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার ষষ্ঠ বিশেষ জজ ইমরুল কায়েশ র্যাবকে তদন্ত থেকে বিরত থাকার আদেশ দেন। এরপর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন বা পিবিআই।
চার বছর তদন্তের পর ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি পিবিআই চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। এতে বলা হয়, ঘটনার সময় উপস্থিত ও ঘটনায় সংশ্লিষ্ট ৫৪ জনের জবানবন্দি এবং জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করে সালমান শাহকে হত্যার অভিযোগের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পিবিআইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়, চিত্রনায়িকা শাবনূরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়ে পারিবারিক কলহ এবং স্ত্রী সামিরা হকের কারণে মা নীলা চৌধুরীকে ছেড়ে থাকার মানসিক যন্ত্রণায় সালমান শাহ আত্মহত্যা করেছিলেন।
তবে ওই প্রতিবেদনেও সন্তুষ্ট হননি নীলা চৌধুরী। ছেলের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে তিনি আরো তদন্তের দাবি জানান। ২০২১ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মামুনুর রশীদ পিবিআইয়ের প্রতিবেদন আমলে নিয়ে আসামিদের অব্যাহতির আদেশ দেন।
এরপর সালমান শাহর পরিবারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়ে ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে রিভিশন আবেদন করা হয়। ২০২২ সালের ১২ জুন রিভিশন আবেদন গ্রহণ করা হলেও বিভিন্ন কারণে দীর্ঘদিন এর শুনানি হয়নি।
গত ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক নীলা চৌধুরীর রিভিশন আবেদন মঞ্জুর করেন। আদালত সালমান শাহর বাবা কমরউদ্দিন আহমদের অভিযোগ এবং সন্দেহভাজন রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদের জবানবন্দি সংযুক্ত করে রমনা মডেল থানাকে হত্যা মামলা করার নির্দেশ দেন।
মামলায় আসামি করা হয়েছে সালমান শাহর স্ত্রী সামিরা হক, সামিরার মা লতিফা হক লুসি, ব্যবসায়ী আজিজ মোহাম্মদ ভাই, খলনায়ক আশরাফুল হক ডন, ডেডিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রিজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদকে।
সালমান শাহ ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ঢাকার ইস্কাটনের বাসায় মারা যান। সে সময় চলচ্চিত্র জগতে তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল তুঙ্গে। তাঁর মৃত্যুর পর থেকেই এটি আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড-তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক চলে আসছে।
সানা/কেএমএএ/আপ্র/৫/১০/২০২৬