গণমানুষের প্রত্যাশা পূরণে অঙ্গীকারবদ্ধ সৃজনশীল দৈনিক
বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬

মেনু

জোড়াতালি নয়, হামে শিশুমৃত্যু রোধে প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান

স্বাস্থ্য ডেস্ক

স্বাস্থ্য ডেস্ক

প্রকাশিত: ২০:৩৪ পিএম, ৩০ এপ্রিল ২০২৬ | আপডেট: ২১:৫৩ এএম ২০২৬
জোড়াতালি নয়, হামে শিশুমৃত্যু রোধে প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান
ছবি

ছবি সংগৃহীত

ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ
হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার আগে শিশু টিকাদান কর্মসূচিতে বাংলাদেশের অভাবনীয় সাফল্য ছিল আমাদের জাতীয় গর্ব। এই সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবেও প্রশংসিত ও স্বীকৃত হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আজ সেই দেশেই প্রতিদিন হামের উপসর্গে শিশুরা প্রাণ হারাচ্ছে। পরিসংখ্যান এখানে কেবল সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি পরিবার, একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ আর এক অপূরণীয় শূন্যতা।

হামের প্রাদুর্ভাবের পর দ্রুত টিকা ক্রয় এবং দেশব্যাপী টিকাদান কর্মসূচিসহ সরকার যে নানামুখী উদ্যোগ নিয়েছে, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, এগুলো যেন কেবল সাময়িক বা আপদকালীন সমাধান না হয়; বরং একে একটি স্থায়ী ও টেকসই ব্যবস্থায় রূপান্তর করতে হবে। একটি কার্যকর স্থায়ী সমাধানের জন্য টিকা ও সিরিঞ্জ ক্রয় থেকে শুরু করে পরিবহন, কোল্ড-স্টোরেজ ব্যবস্থাপনা, সঠিক সময়ে টিকাদান এবং পূর্ণ ডোজ নিশ্চিত করাসহ পুরো ‘ইকো-সিস্টেম’ সর্বদা প্রস্তুত রাখা অপরিহার্য। এই ইকো-সিস্টেমের যেকোনো পর্যায়ে সমস্যা যেমন টিকা ও সিরিঞ্জের ঘাটতি, জনবল সংকট, মাঠকর্মীদের অসন্তোষ কিংবা নিবিড় তদারকি ও সজাগ দৃষ্টির অভাব পুরো কার্যক্রমকে ব্যাহত করতে পারে।

প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে টিকার সুফল সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও, টিকাদানে সামান্য ঘাটতি বা অবহেলার ভয়াবহ পরিণাম আমরা এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী হামের উপসর্গ নিয়ে ২০০-এর বেশি শিশুর মৃত্যু, ৩২ হাজারের বেশি শিশুর হাসপাতালে ভর্তি, পরিবারের চরম উৎকণ্ঠা, আর্থিক ক্ষতি ও ভোগান্তি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে সেই ঘাটতিগুলো দেখিয়ে দিচ্ছে। জনস্বাস্থ্যের মতো এত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় যে দপ্তরের তদারকি করার কথা, সেই ইপিআই দপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা এখন সময়ের দাবি। তাই এই সংকটের স্থায়ী সমাধানের জন্য সবার আগে ইপিআই ইউনিট একজন নিয়মিত ডিরেক্টরসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় লোকবলের সমন্বয়ে শক্তিশালী ও কার্যকর করা প্রয়োজন।

বর্তমানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ইউনিটের অধীনে একজন উপ-পরিচালক ইপিআই কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। উল্লেখ্য, ১৯৯৮ থেকে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত সেক্টর প্রোগ্রামের আওতায় এটি প্রথমে ইএসপি এবং পরবর্তীতে এমএনসিএএইচ অপারেশন প্ল্যানের অধীনে একজন লাইন ডিরেক্টরের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী পরিবার পরিকল্পনা ও কমিউনিটি ক্লিনিকসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে সমন্বিত করে যদি একটি স্বতন্ত্র অধিদপ্তর বা কর্তৃপক্ষ গঠন করা হয়, তবে ইপিআই-এর গুরুত্ব ও ব্যাপকতা বিবেচনায় এর জন্য একজন ‘অতিরিক্ত মহাপরিচালক’ পদ সৃষ্টির বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা যেতে পারে। শিশু টিকাদান প্রক্রিয়ার সরবরাহ ব্যবস্থার নিরবচ্ছিন্নতা রক্ষায় ১২ মাসের সাথে অতিরিক্ত ৩ মাসের প্রোভিশন রেখে প্রতি বছর ১৫ মাসের জন্য যে পরিমাণ টিকা দরকার তা কেনার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে অর্থ বছরের শুরুতে ক্রয় প্রক্রিয়া অনুমোদনসহ যে সময় লাগে, সে সময়কালীন টিকার স্টক নিশ্চিত হবে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে অপারেটিং বাজেট থেকে টিকা ক্রয়ের যে ব্যবস্থা চালু হয়েছে তা অব্যাহত রেখে প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থের বরাদ্দ দিতে হবে। এ ছাড়া টিকাদান কর্মী এবং টিকাদানের সাথে জড়িত টেকনোলজিস্টসহ সব শূন্য পদ দ্রুত এবং নিয়মিতভাবে পূরণ করতে হবে। তবে পরিবার পরিকল্পনা ও কমিউনিটি ক্লিনিকসহ প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাকে একত্রিত করলে যে নতুন অর্গানোগ্রাম তৈরি হবে, সে অনুযায়ী সব পদ পূরণ করতে হবে। তাছাড়া টিকাদান কর্মী ও টেকনোলজিস্টদের নিয়মিত ভিত্তিতে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাসহ পারফরম্যান্স-বেসড প্রণোদনা প্রদানের ব্যবস্থা থাকতে হবে।

হার্ড ইমিউনিটি রক্ষার্থে প্রতিটি গ্রাম, ইউনিয়ন, উপজেলা, জেলা এবং সিটি কর্পোরেশনে ৯৫ শতাংশের বেশি শিশুকে পূর্ণাঙ্গ ডোজে টিকা নিশ্চিত করতে হবে। এর জন্য কমিউনিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সিভিল সোসাইটি প্ল্যাটফর্মকে সংশ্লিষ্ট করতে হবে। যে এলাকায় ৯৫ শতাংশের বেশি শিশু পূর্ণাঙ্গ ডোজে টিকা নেবে, সে এলাকার কমিউনিটি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সিভিল সোসাইটি প্ল্যাটফর্মকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দিতে হবে। দেশের বায়ো-সিকিউরিটি নিশ্চিত করতে হামসহ সব ধরনের টিকা দেশেই উৎপাদনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য। এই লক্ষ্য অর্জনে ইডিসিএল-এর ভ্যাকসিন প্রকল্প বাস্তবায়নে আরও তৎপর হতে হবে। উল্লেখ্য, ২০২১ সালে এই প্রক্রিয়া শুরু হলেও প্রকল্পটি এখনো কেবল জমি অধিগ্রহণের পর্যায়েই সীমাবদ্ধ রয়েছে।

২০২৩ সালে একনেক কর্তৃক অনুমোদনের পর গোপালগঞ্জে প্রথম দফায় জমি অধিগ্রহণ করা হলেও, পরবর্তীতে ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে প্রকল্পটি গোপালগঞ্জের পরিবর্তে মুন্সীগঞ্জের সিরাজদিখানে সরকারি খাসজমিতে বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। অন্যদিকে ভ্যাকসিনের মতো একটি উচ্চপ্রযুক্তি-নির্ভর প্রকল্প সফলভাবে পরিচালনার জন্য যে বিশেষায়িত ও দক্ষ জনশক্তি প্রয়োজন, তা গড়ে তোলার উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। বিলম্ব হলেও অবিলম্বে একটি উপযুক্ত অর্গানোগ্রাম (সাংগঠনিক কাঠামো) প্রণয়ন করে সেই অনুযায়ী জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরি। একই সঙ্গে নিয়োগকৃত কর্মীদের দেশি-বিদেশি উচ্চতর প্রশিক্ষণের আওতায় আনতে হবে। পাশাপাশি, বিশ্বের অভিজ্ঞ ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মাধ্যমে প্রযুক্তি হস্তান্তরের ব্যবস্থা করাও অত্যাবশ্যক।

প্রথাগত নিয়মে কেবল অবকাঠামো নির্মাণ ও প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পন্ন হওয়ার পর জনবল নিয়োগের উদ্যোগ নিলে কার্যকর ভ্যাকসিন উৎপাদন সম্ভব হবে না; বরং এটি অকার্যকর প্রতিষ্ঠানের তালিকায় আরও একটি নতুন সংযোজন হবে মাত্র। বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করার জন্য আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সদয় দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। আবার হ্যাম, ডেঙ্গু এবং অন্যান্য সংক্রামণ রোগের কেস রিপোর্টিং-এর জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এমআইএস শাখার আওতাধীন ‘হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন অ্যান্ড কন্ট্রোল রুম’-এর কার্যক্রমকে কাঙ্ক্ষিত মানে উন্নীত করার লক্ষ্যে দক্ষ জনবল নিয়োগ অপরিহার্য। বর্তমানে এই কেন্দ্রটি ২৪/৭ নিরবচ্ছিন্নভাবে হাম, ডেঙ্গুসহ ২৪টি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য বিষয়ক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকে। কেন্দ্রটির সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য ৩টি শিফটে ৯-১২ জন মেডিকেল অফিসার, ৬ জন ডাটা অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং ৪ জন সাপোর্ট স্টাফ প্রয়োজন। কিন্তু, বর্তমানে জনবলের তীব্র সংকট রয়েছে। বর্তমানে সংযুক্তিতে থাকা ৬-৭ জন মেডিকেল অফিসারের মধ্যে ৪ জনই বদলির অপেক্ষায় আছেন।

জুন ২০২৪-এ অপারেশন প্ল্যান (ওপি) সমাপ্ত হওয়ার পর ডাটা অ্যাসিস্ট্যান্ট পদটি অপারেটিং বাজেটে অন্তর্ভুক্ত না করায় বর্তমানে কোনো নিয়মিত কর্মী নেই; যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ওপি’র অধীন নিয়োগকৃত একজন কর্মী ভবিষ্যতে স্থায়ীকরণের প্রত্যাশায় বিনা পারিশ্রমিকে সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়া প্রয়োজনীয় ৪ জন সাপোর্ট স্টাফের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন। স্বাস্থ্য খাতের এই জরুরি সেবাটি সচল রাখতে দ্রুত স্থায়ী পদ সৃষ্টি ও জনবল নিয়োগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এই পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করা হলে হামসহ টিকা দিয়ে প্রতিরোধযোগ্য শিশু মৃত্যু রোধে একটি স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত হবে। জানা গেছে, সরকার ইতোমধ্যে এগুলোর বেশকিছু বিষয় সক্রিয়ভাবে বিবেচনা করছে। আশা করা যায়, সবগুলো পরামর্শ গুরুত্বের সাথে নিয়ে সরকার একটি সুসংহত জাতীয় টিকাদান ব্যবস্থা গড়ে তুলবে।

লেখক: অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

আপ্র/কেএমএএ/৩০.০৪.২০২৬

সংশ্লিষ্ট খবর

এক সপ্তাহের মধ্যে শতভাগ শিশু হামের টিকা পাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী
৩০ এপ্রিল ২০২৬

এক সপ্তাহের মধ্যে শতভাগ শিশু হামের টিকা পাবে: স্বাস্থ্যমন্ত্রী

আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে শতভাগ শিশুকে হামের টিকার আওতায় আনা সম্ভব হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবা...

হাম আক্রান্তদের ৭৪ শতাংশ টিকা পায়নি
২৯ এপ্রিল ২০২৬

হাম আক্রান্তদের ৭৪ শতাংশ টিকা পায়নি

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সংবাদ ব্রিফিং

এক বছরে বিশ্বে হেপাটাইটিস বি কমেছে ৩২ শতাংশ
২৯ এপ্রিল ২০২৬

এক বছরে বিশ্বে হেপাটাইটিস বি কমেছে ৩২ শতাংশ

বিশ্বজুড়ে প্রাণঘাতী রোগ হেপাটাইটিস বি–তে আক্রান্তের হার এক বছরে ৩২ শতাংশ কমেছে বলে জানিয়েছে বিশ্ব স্...

সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত যা মেনে চলা উচিত
২৯ এপ্রিল ২০২৬

সুস্থ থাকার জন্য নিয়মিত যা মেনে চলা উচিত

স্বাস্থ্য প্রতিদিন--------

মন্তব্য বৈশিষ্ট্য বন্ধ রয়েছে

বর্তমানে মন্তব্য বৈশিষ্ট্য নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। অনুগ্রহ করে পরে আবার চেষ্টা করুন।

অনলাইন জরিপ

কোনো সক্রিয় জরিপ নেই