একজন শিল্পীর কণ্ঠ কখনো শুধু গান হয়ে বাজে না, হয়ে ওঠে একটি সময়ের স্মৃতি, একটি জাতির আবেগ, কখনো বা মানুষের দুর্দিনে আশার আলো। উপমহাদেশের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী রুনা লায়লাকে ঘিরে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এবারের আয়োজন ঠিক তেমনই এক বিরল সন্ধ্যার প্রতিশ্রুতি বহন করছে। একদিকে থাকবে দেশের সংগীত ইতিহাসের উজ্জ্বলতম নক্ষত্রকে জাতীয় সম্মাননা প্রদানের মুহূর্ত, অন্যদিকে তাঁর কণ্ঠে ভেসে উঠবে কালজয়ী সব গান। আর এই আয়োজনের প্রতিটি টিকিট হয়ে উঠবে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একেকটি মানবিক অঙ্গীকার।
আগামীকাল ২৪ জুলাই সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় রাজধানীর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে রুনা লায়লার একক সংগীতানুষ্ঠান ও সম্মাননা প্রদান অনুষ্ঠান। সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে ইতোমধ্যেই সংগীতপ্রেমীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
অনুষ্ঠানের টিকিট তিনটি শ্রেণিতে বিক্রি করা হবে। প্রথম শ্রেণির টিকিটের মূল্য পাঁচ হাজার টাকা, দ্বিতীয় শ্রেণির তিন হাজার টাকা এবং তৃতীয় শ্রেণির দুই হাজার টাকা। ২২ ও ২৩ জুলাই সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির অর্থ, হিসাব ও পরিকল্পনা বিভাগের প্রশাসনিক ভবনের নিচতলা থেকে টিকিট সংগ্রহ করার ব্যবস্থা রয়েছে। টিকিট বিক্রি থেকে প্রাপ্ত সম্পূর্ণ অর্থ প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে দেওয়া হবে, যা ব্যয় হবে বন্যাদুর্গত মানুষের সহায়তায়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। বিশেষ অতিথি থাকবেন সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এবং প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। সভাপতিত্ব করবেন সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। স্বাগত বক্তব্য রাখবেন বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন)।
ছয় দশকের সুরভরা এক অনন্য যাত্রা
রুনা লায়লার সংগীতজীবন শুধু দীর্ঘ নয়, দক্ষিণ এশিয়ার সংগীত ঐতিহ্যের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। ছয় দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলা, উর্দু, হিন্দি, পাঞ্জাবিসহ ১৮টি ভাষায় তিনি গেয়েছেন দশ হাজারেরও বেশি গান। তাঁর কণ্ঠে যেমন শাস্ত্রীয় সংগীতের মাধুর্য, তেমনি আধুনিক, চলচ্চিত্র, গজল, লোকগীতি কিংবা সুফি সংগীতেও সমান স্বাচ্ছন্দ্য। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁর গান শ্রোতাদের কাছে সমান আবেদন ধরে রেখেছে।
কিশোরী বয়সেই ১৯৬৫ সালে ‘জুগনু’ চলচ্চিত্রে প্লেব্যাকের মাধ্যমে তাঁর পেশাদার সংগীতজীবনের সূচনা। পরে বাংলা চলচ্চিত্রে সুবল দাসের সুরে ‘স্বরলিপি’ ছবিতে গান গেয়ে তিনি বাংলা সংগীতাঙ্গনে নিজের স্বতন্ত্র অবস্থান গড়ে তোলেন। অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই তাঁর রেকর্ড করা গানের সংখ্যা পৌঁছে যায় প্রায় এক হাজারে।
দেশের সীমানা পেরিয়ে বিশ্বমঞ্চের শিল্পী
রুনা লায়লা শুধু বাংলাদেশের নন; তিনি উপমহাদেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক দূত। বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের পাশাপাশি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, ওমান, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং বিশ্বের নানা শহরে তাঁর একক সংগীতানুষ্ঠান বরাবরই দর্শক-শ্রোতার বিপুল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে।
১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে আসার পর ভারতের কয়েকটি বড় কনসার্টে অংশ নিয়ে তিনি সেখানকার সংগীতপ্রেমীদেরও মুগ্ধ করেন। বিশেষ করে তাঁর গাওয়া ‘দমাদম মাস্ত কলন্দর’ গানটি তাঁকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অনন্য পরিচিতি এনে দেয়। কিংবদন্তি লতা মঙ্গেশকর ও আশা ভোঁসলের সঙ্গে তাঁর আন্তরিক সম্পর্ক ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা উপমহাদেশের সংগীত ইতিহাসেরই অংশ হয়ে আছে।
সংগীত সংশ্লিষ্টদের মতে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এখনও রুনা লায়লার নাম মানেই মর্যাদা, পরিশীলিত সংগীত এবং অসাধারণ মঞ্চনৈপুণ্য। তাঁর একক কনসার্ট সব সময়ই একটি বিশেষ সাংস্কৃতিক ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। সে কারণেই দীর্ঘ বিরতির পর শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে তাঁর একক পরিবেশনাকে ঘিরে সংগীতপ্রেমীদের প্রত্যাশাও অনেক বেশি।
সম্মাননা ও পুরস্কার
বাংলাদেশের সংগীতকে বিশ্বমঞ্চে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করতে রুনা লায়লার অবদান অনস্বীকার্য। আটবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পীর সম্মান অর্জনের পাশাপাশি তিনি পেয়েছেন দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা স্বাধীনতা পুরস্কার। ভারতের সায়গল পুরস্কার ও ‘মিনার-এ-দিল্লি’ সম্মাননা, পাকিস্তানের নিগার, ক্রিটিক্স ও গ্র্যাজুয়েটস পুরস্কারসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিতে সমৃদ্ধ তাঁর বর্ণাঢ্য সংগীতজীবন।
গানের পাশাপাশি চাষী নজরুল ইসলাম পরিচালিত ‘শিল্পী’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেও তিনি প্রশংসা কুড়িয়েছেন।
গানের টিকিটেই মানবতার স্পর্শ
এবারের আয়োজনের সবচেয়ে বড় তাৎপর্য কেবল সম্মাননা বা একক কনসার্ট নয়; প্রতিটি টিকিটই হয়ে উঠছে মানবিক সহমর্মিতার প্রতীক। সংগীতের মাধ্যমে বন্যাদুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়ানোর এই উদ্যোগ আয়োজনটিকে দিয়েছে ভিন্ন উচ্চতা।
তাই ২৪ জুলাইয়ের সন্ধ্যায় জাতীয় নাট্যশালার মঞ্চে যখন রুনা লায়লার কণ্ঠে ভেসে উঠবে তাঁর অমর সব গান, তখন সেটি শুধু একজন কিংবদন্তি শিল্পীর পরিবেশনা হবে না; হবে এক শিল্পীর প্রতি জাতির শ্রদ্ধা, সংগীতের প্রতি ভালোবাসা এবং বিপন্ন মানুষের প্রতি সম্মিলিত মানবিক দায়বদ্ধতার এক স্মরণীয় উদ্যাপন।
সানা/আপ্র/২৩/৭/২০২৬