ঈদ ঘিরে প্রতি বছরই দেশের বড় শহরগুলো থেকে গ্রামে ফেরার বিশাল মানবস্রোত তৈরি হয়। কর্মব্যস্ত নগরজীবনে ছড়িয়ে থাকা কোটি মানুষের কাছে এই সময়টি শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি পরিবারের কাছে ফিরে যাওয়ার আবেগঘন মুহূর্ত। তাই ঈদ সামনে এলেই রাজধানীসহ বড় শহরগুলোতে শুরু হয় ঘরমুখো মানুষের যাত্রা। সরকারও প্রতি বছর ঘোষণা দেয়-এবারের ঈদযাত্রা হবে স্বস্তিদায়ক ও নির্বিঘ্ন। কিন্তু দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, আশ্বাস আর বাস্তবতার মধ্যে ব্যবধান বড়।
গত এক দশকে দেশের সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। নতুন সেতু, প্রশস্ত মহাসড়ক ও উড়ালপথ নির্মাণের ফলে অনেক দূরত্ব কম সময়ে অতিক্রম করা সম্ভব হচ্ছে। তবু ঈদের সময় যাত্রীদের প্রধান উদ্বেগ থেকে যায় দুই জায়গায়-অতিরিক্ত ভাড়া এবং যাত্রাপথের অনিশ্চয়তা। অর্থাৎ রাস্তা উন্নত হলেও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা এখনও কাটেনি।
এ বছরও ঈদযাত্রা শুরুর আগেই বিভিন্ন রুটে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। অভিজ্ঞতা বলছে, ঈদ যত ঘনিয়ে আসে এবং যাত্রীর চাপ যত বাড়ে, অনেক ক্ষেত্রে পরিবহন মালিক বা চালক ভাড়া বাড়িয়ে দেন। দূরপাল্লার বাস ও লঞ্চে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়। সাধারণ যাত্রী বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে বাড়ি ফেরেন। উৎসবের আনন্দ অনেকের কাছে তখন পরিণত হয় বাড়তি আর্থিক চাপের বাস্তবতায়।
রেলপথের অবস্থাও স্বস্তিদায়ক নয়। ট্রেনকে সবচেয়ে নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবহন হিসেবে দেখা হয়, কিন্তু আসনের তুলনায় যাত্রীর সংখ্যা এত বেশি যে টিকিট পাওয়া অনেকের কাছে ভাগ্যের ব্যাপার। এবারের তথ্য অনুযায়ী প্রায় সাঁইত্রিশ লাখ মানুষ টিকিট কেনার চেষ্টা করেছেন, অথচ বিক্রি হয়েছে মাত্র ছত্রিশ হাজার। ফলে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাধ্য হয়ে সড়ক বা নৌপথের ওপর নির্ভর করছেন-যেখানে ভাড়া বাড়ানোর ঝুঁকি আরো বেশি।
ঈদযাত্রার অন্যতম গুরুতর দিক হলো দুর্ঘটনা ও নিরাপত্তা। অতিরিক্ত চাপ, চালকের অসচেতনতা বা নিরাপত্তা মান না মেনে যাত্রা করলে বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হয়। প্রতি বছর অনেক মানুষ যাত্রার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। তাই চালকরা সর্বদা সতর্ক থাকুন, লঞ্চ ও বাসের ক্রু দায়িত্বশীল থাকুন, সরকার কঠোর তদারকি চালাক, আর যাত্রীরাও সচেতনভাবে চলাচল করুন। দুর্ঘটনাবিহীন ঈদযাত্রা নিশ্চিত করা সকলের যৌথ দায়িত্ব।
সরকার ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো আগেভাগেই ছুটি দেওয়া হয়েছে, সরকারি ছুটিও বাড়ানো হয়েছে যাতে যাতায়াতে বেশি চাপ না পড়ে। রেলেও অতিরিক্ত কোচ সংযোজন ও বিশেষ ট্রেন চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে প্রস্তুতির ঘোষণা দিয়ে দায়িত্ব শেষ হয় না; বাস্তবে কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই সমান গুরুত্বপূর্ণ।
সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো ভাড়া নিয়ন্ত্রণ ও কার্যকর তদারকি। যাত্রীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা বন্ধ করতে হবে। গ্রামে যাওয়ার সময় যেমন নির্ধারিত ভাড়া নেওয়া হবে, একইভাবে ঈদের পর শহরে ফেরার সময়ও যেন অতিরিক্ত ভাড়া চাপানো না হয়, সে বিষয়েও নজরদারি করতে হবে।
ঈদ মানুষের মিলনের উৎসব। এই উৎসবকে ঘিরে যদি সাধারণ মানুষ বাড়তি অর্থ গুনে, ভোগান্তির মধ্যে বা দুর্ঘটনার ঝুঁকিতে পড়ে, তবে তা রাষ্ট্র ও সমাজ উভয়ের জন্যই অস্বস্তিকর। তাই প্রয়োজন কঠোর নজরদারি, কার্যকর ব্যবস্থা এবং যাত্রী ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের সর্বমিলিত সচেতনতা। তবেই ঈদযাত্রা সত্যিকার অর্থে স্বস্তিদায়ক, নিরাপদ এবং আনন্দময় হয়ে উঠবে।
সানা/এসি/১৫/০৩/২০২৬