টানা ৪৫ মাস পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক অতিক্রম করেছে। রেমিট্যান্স প্রবাহে ধারাবাহিক ঊর্ধ্বগতি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি এবং বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরে আসার ফলে সোমবার দিন শেষে দেশের মোট (গ্রস) বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ০৫ বিলিয়ন ডলারে। এর আগে সর্বশেষ ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে রিজার্ভ ৩৭ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে গিয়েছিল।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের ব্যালেন্স অব পেমেন্টস অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল ইনভেস্টমেন্ট পজিশন ম্যানুয়াল (বিপিএম-৬) পদ্ধতিতে হিসাব করা রিজার্ভ বর্তমানে ৩২ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
চলতি মাসের শুরুতে, ১ জুন দেশের মোট রিজার্ভ ছিল ৩৪ দশমিক ৭৬ বিলিয়ন ডলার এবং বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ছিল ৩০ দশমিক ১০ বিলিয়ন ডলার। সে হিসাবে এক মাসে মোট রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার, আর বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে বেড়েছে প্রায় ২ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার।
তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, মোট রিজার্ভের পুরো অর্থ ব্যবহারযোগ্য নয়। স্বল্পমেয়াদি বৈদেশিক দায় এবং অন্যান্য আর্থিক বাধ্যবাধকতা বাদ দিয়ে যে নিট বা ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ থাকে, সেটিই একটি দেশের প্রকৃত বৈদেশিক সক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ সূচক।
বাংলাদেশ ব্যাংক অভ্যন্তরীণভাবে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভের পৃথক হিসাব সংরক্ষণ করে। এ হিসাবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের বিশেষ ড্রইং অধিকার, ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা ক্লিয়ারিং হিসাব এবং এশিয়ান ক্লিয়ারিং ইউনিয়নের নিষ্পত্তির জন্য সংরক্ষিত অর্থসহ কয়েকটি খাত বাদ দেওয়া হয়। যদিও এ হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয় না।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশের ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলার। প্রতি মাসে গড়ে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার আমদানি ব্যয় বিবেচনায় নিলে এই রিজার্ভ দিয়ে প্রায় ছয় মাসের আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী, অন্তত তিন মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর সক্ষমতাকে নিরাপদ রিজার্ভ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সালের আগস্টে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ইতিহাসের সর্বোচ্চ ৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে অর্থপাচার, বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বাড়তি চাপ এবং অন্যান্য অর্থনৈতিক কারণে রিজার্ভ দ্রুত কমতে শুরু করে। একই সময়ে বৈদেশিক মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা তৈরি হয় এবং প্রতি ডলারের বিনিময় হার ৮৪ টাকা থেকে বেড়ে ১২০ টাকায় পৌঁছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে তখন আমদানির ওপর বিভিন্ন ধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের সময় দেশের মোট রিজার্ভ নেমে আসে ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলারে। তখন বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে রিজার্ভ ছিল ২০ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন ডলার।
পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ডলারের বিনিময় হার ধীরে ধীরে বাজারভিত্তিক করা হয়। পাশাপাশি প্রবাসী আয় বাড়াতে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ এবং আমদানির ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ পর্যায়ক্রমে শিথিল করায় বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় রিজার্ভ পুনরুদ্ধারের গতি জোরদার হয়।
বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের মোট রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৪ বিলিয়ন ডলার, আর বিপিএম-৬ পদ্ধতিতে ছিল প্রায় ৩০ বিলিয়ন ডলার। এরপর রেমিট্যান্স প্রবাহের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় এবং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতার ফলে সাড়ে তিন বছর পর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ আবারও ৩৭ বিলিয়ন ডলারের ঘরে ফিরে এসেছে।
সানা/আপ্র/৩০/৬/২০২৬